13/06/2025
ইতিহাসের সবচেয়ে মুর্খতাপূর্ণ বিমান দুর্ঘটনার গল্প শোনাবে আজ।
১৯৭৮ সালের ১৯ মে, অ্যারোফ্লোটের একটি Tu-154B বিমান বাকু থেকে লেনিনগ্রাদগামী নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনা করছিল। বিমানে ১৩৪ জন যাত্রী ও ক্রু ছিলেন। ককপিটে ছিলেন এক নতুন ক্যাপ্টেন (প্রথমবার ক্যাপ্টেনের আসনে), ফার্স্ট অফিসার, ন্যাভিগেটর, ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন প্রশিক্ষক ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার।
বিমানটি যখন ৯,৬০০ মিটার উচ্চতায় ক্যালিনিন অঞ্চলের উপর দিয়ে উড়ছিল, সেই সময় প্রশিক্ষক ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার ও ফার্স্ট অফিসার বিমানের কন্ট্রোল সিস্টেম নিয়ে আলোচনা করছিলেন। এতো গভীর আলোচনায় তারা খেয়ালই করেননি যে ইঞ্জিনের RPM কমে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনটি ইঞ্জিনই বন্ধ হয়ে যায়, এবং জেনারেটরগুলোও কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিমানটির ফ্লাইট কন্ট্রোল সিস্টেমে আংশিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়।
ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ককপিট ক্রু বুঝতে পারেন যখন বিমানটি হঠাৎ উপরের দিকে উঠে গিয়ে ডানে কাত হতে শুরু করে এবং গতি হ্রাস পেতে থাকে। প্রায় এক মিনিট পরে, ক্রু বুঝতে পারেন আসল সমস্যা — সব ইঞ্জিনই বন্ধ হয়ে গেছে।
বিমানকে গতি ধরে রাখতে ৫০০ কিমি/ঘণ্টা গতিতে জরুরি অবতরণ শুরু করা হয় এবং ক্রু বারবার ইঞ্জিন চালু করার চেষ্টা করেন — মোট পাঁচবার — কিন্তু কোনোবারই সফল হননি। ৫,০০০ মিটার উচ্চতায় তারা APU (অক্সিলিয়ারি পাওয়ার ইউনিট) চালু করার চেষ্টা করেন, কিন্তু সেটিও ব্যর্থ হয় কারণ এটি কেবল ৩,০০০ মিটার নিচে কাজ করে।
নিকটবর্তী বিমানবন্দর ছিল বেজেৎস্ক শহরে, ৬৫ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানো অসম্ভব মনে হওয়ায় ক্যাপ্টেন সিদ্ধান্ত নেন কাছাকাছি কোনো খোলা মাঠে অবতরণ করার। আবহাওয়া পরিষ্কার ছিল, এবং নিচে বার্লি ও আলুর ক্ষেত দেখতে পেয়ে সেখানে জরুরি অবতরণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। যাত্রীদের জানিয়ে দেওয়া হয় এবং তারা সিট বেল্ট বেঁধে প্রস্তুত হন।
অবতরণের সময় ডানদিকের পাখা একটি গাছে আঘাত পায় এবং বিমানটি ১৫০ মিটার ঘষে যায়, এরপর আবার আকাশে উঠে প্রায় ৬৫০ মিটার উড়ে গিয়ে একটি গাছের সারির মধ্যে পড়ে। বিমানটি বিভিন্ন গাছ ভেঙে দিয়ে এগিয়ে যায় এবং দ্বিতীয়বার ভূমিতে আছড়ে পড়ে। এতে ডান ল্যান্ডিং গিয়ার ধ্বংস হয়ে যায়, ডানদিকের পাখা ও একটি ইঞ্জিন ছিঁড়ে যায়। এরপর একটি কাঁচা রাস্তা ও খালে আছড়ে পড়ার পর নাক ও বামদিকের ল্যান্ডিং গিয়ার ভেঙে যায় এবং বিমানটি তিন ভাগে ভেঙে পড়ে, সঙ্গে আগুন ধরে যায়।
ক্রুদের দ্রুত পদক্ষেপে প্রায় সবাইকে বিমানের বাইরে নিয়ে আসা সম্ভব হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এক ৭ বছরের মেয়ের পা ভাঙা আসনে আটকে যায়, এবং আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তার মা তাকে ছেড়ে যেতে অস্বীকার করেন এবং দু’জনই আগুনে পুড়ে মারা যান। আরও দুই যাত্রী নিহত হন। মোট ২৭ জন আহত হন, বাকিরা অক্ষত ছিলেন।
তদন্তে উঠে আসে এক অবিশ্বাস্য কারণ। প্রশিক্ষক ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার “নিয়মিত ইঞ্জিনিয়ার কতটা সতর্ক” তা পরীক্ষা করতে গিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেন, এবং এরপর সেটা নিজেও ভুলে যান। এদিকে নিয়মিত ইঞ্জিনিয়ার সেটি লক্ষ্য করেননি, আর জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেওয়ার মতো সতর্ক সংকেতও কাজ করেনি।
এই বিমানের একটি বড় নকশাগত ত্রুটি ছিল — তিনটি ইঞ্জিনই একই সার্ভিস ট্যাঙ্ক থেকে জ্বালানি পেত। ওই ট্যাঙ্ক ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় একসাথে সব ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়।
এই অবহেলার জন্য আদালত প্রশিক্ষক ইঞ্জিনিয়ারকে ৩ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন (তবে পরে সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পান)। বিমানের ক্যাপ্টেনকে অ্যারোফ্লোট থেকে বরখাস্ত করা হয়।
এটি ইতিহাসে বিমান দুর্ঘটনার অন্যতম মূর্খতাপূর্ণ ও প্রতিরোধযোগ্য একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।
-MKIR