17/07/2026
এ জার্নি এভাউট নর্থ বেঙল!
আসসালামুয়ালাইকুম বন্ধুরা,
ছোটবেলায় সব সময় ভাবতাম,ইস! যদি এমন এক ভ্রমণ দিতে পারতাম,যে ভ্রমণে রাস্তাই শেষ হবে না।
আসলেই আমি এমন এক ভ্রমণ দিয়েছি যাতে রাস্তা তো শেষ হয়নি কিন্তু আমার ইচ্ছা অনেকাংশে পূরণ হয়েছে।আমি বলছি আমাদের উত্তরবঙ ট্যুরের কথা।
যাইহোক কোনভাবে অফিসের ছুটি ম্যানেজ করে বের হয়ে গেলাম শুক্রবার নামাযের পর পর।সাথে ছিল বন্ধু নাকিব।যথারিথী অনেকে যাওয়ার কথা ছিল,কিন্তু দিনশেষে যা হয় তাই হয়েছে।বিভিন্ন সমস্যার কারণে অনেকে যেতে পারে নি।রাফিজ অবশ্য আমাদের সাথে ঢাকা তে জয়েন করেছিল।কিন্তু রাজশাহী যাওয়ার পর সে জানতে পারে তার বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে।এমন অবস্থায় তাকেও ফিরতে হলো!
শুরুটা হয় চটগ্রাম থেকে,বৃষ্টি উপেক্ষা করে আমরা ঢাকা-চিটাগাং হাইওয়েতে উঠি।মাঝখানে কুমিল্লার নুরজাহানে যাত্রা বিরতি।সন্ধ্যার দিকেই আমরা নারায়ণগঞ্জ পৌছে যায়,তারপর ই শুরু হয় জ্যাম কাকে বলে!ধাক্কাতে ধাক্কাতে মিরপুর পোছায় রাত ১০.৩০ এর দিকে।এত টায়ার্রড ছিলাম শুধু জ্যাম এর কারণে।গিয়ে উঠি কাজিনের বাসায়।খাওয়া দাওয়া শেষে ঘুম।সকাল ৭ টায় বের হয়ে গেলাম।যাওয়ার পথে বাঁধল বিপত্তি! মাজার-গাবতলি রোড়ে খেয়ে গেলাম মামলা!ঢাকা সিটি তে যেহেতু রাইডিংয়ের অভিজ্ঞতা ছিল না।ঘুরে গিয়ে রাস্তা পার না হয়ে মোড় দিয়েই পার হয়ে যাওয়ায় সার্জেন্ট ছাড়ল না।অনেক রিকোয়েস্ট করার পর ২ জনকে ১ হাজার করে মামলা দিয়ে দিল।যাই হোক জীবনে প্রথম নিজের বোকামির আক্কেল সেলামি পেলাম!
রাফিজ ও চলে আসল!শুরু হলো আমাদের রাজশাহীর উদ্দেশ্যে যাত্রা।টাঙাইলের জমিদার বাড়ি,সিরাজগঞ্জের নবরত্ন মন্দির,নাটোরের উত্তরা গণভবন,জমিদার বাড়ি দেখলাম।পথিমধ্যে মুষলধারে বৃষ্টি ছিল কিছু দূর পর পর।সাথে রেইনকোট ও অন্যন্য ট্রাভেল গিয়ার থাকায় বৃষ্টি হওয়াটা উপভোগ করা হচ্ছিল!নাটোরের আগে খেয়াল করলাম আমার সামনের সাসপেনশন থেকে অয়েল লিক কিরছে।মানে অয়েল সিল চলে গেছে।সাথে যোগ হলো ক্লাস কেবল কেটে যাওয়া।যাইহোক, ট্যুরে এসব থাকবে,সলভ করে রাজশাহী পৌছালাম রাত ১১ টায়।হোটেল বুক করে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম ডিনার এণ্ড সিটি ট্যুরের উদ্দেশ্যে!
রাজশাহী: অসম্ভব গোছানো একটা শহর।বিশেষ করে স্ট্রিট লাইট গুলো রাতে এত সুন্দর দেখায় বলার বাইরে!রাজশাহীর কালাই রুটি, আম,সিল্কের শাড়ি এক কথায় অন্যান্য।
পরের দিন সকালে উঠে চলে গেলায় সপুরা সিল্ক ফ্যাক্টরিতে,ঘুরলাম,কেনাকাটা করে সিল্ক তৈরি করার মেশিন ও কাজ দেখলাম।এক কথায় অসাধারণ। রেশম।পোকার গুন বইয়ে পড়েছিলাম।স্বচক্ষে দেখার অনুভূতি অন্যরকম।
এরপর আমাদের চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা।পথি মধ্যে সারি সারি আম বাগান!গ্রামীন প্রকৃতি অসম্ভব সুন্দর!বিকালের দিকে আমরা সোনা মসজিদ পৌছায়।মসজিদের আঙিনায় আমাদের বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কে সমাহিত করা হয়েছে।সোনা মসজিদ আসলেই সোনার মতই মূল্যবান ও অপূর্ব!আমাদের ইতিহাস যে কত রিচ তা এসব না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়!
পাশেই লাঞ্চ সেরে বের হলাম জয়পুরহাটের উদ্দেশ্যে! জয়পুরহাট পৌছে রুম বুক করে ফ্রেশ হয়ে সিটি ট্যুর!
পরের দিন সকালে চলে গেলাম পাহাড়পুরে।এই স্থপতিটি যে দেখবে তার ই অবাক লাগবে।অসম্ভব সুন্দর এই প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়টি আমাদের ইতিহাসের অন্যতম ধারক ও বাহক।বিশাল একটা জায়গা জুড়ে এর অবস্থান!প্রতিটি ইট ও এর নকশা আপনাকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।
এরপর আমরা নওগাঁ হয়ে বগুড়া শহরে পৌছি।বগুডার মহাস্থানগড় ঘুরে আমাদের গন্তব্য এবার দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে। দিনাজপুর পৌছে আমরা প্রথমেই হিরো সার্ভিস সেন্টারে ঢুকি।কারণ রাজশাহীতে রাতে লোকাল দোকানে যে অয়েল সিল লাগিয়েছিলাম তা একোরেট লাগানো হয়নি।সাস্পেনশন লাফাচ্ছিল ও হ্যান্ডেল ভাইব্রেট করছিল ভাঙা রাস্তায়! আমি সচরাচর টুকটাক কাজ ছাড়া ক্রিটিকাল কাজ লোকাল শপে করাই না।রাত হয়ে যাওয়ায় আর উপায় ছিল না।যাইহোক
আমরা প্রায় শেষ মুহুর্তে সার্ভিস সেন্টারে ঢুকি। যখন তারা আমাদের বিষয়ে জানতে পারে সম্পূর্ণ টিম দ্রুত রেস্পন্স করে মিনিটের মধ্যেই সাস্পেনশ খুলে অয়েল নিয়ে এসে কাজ শুরু।অয়েল সিলের অয়েল চেঞ্জ,এয়ার ফিল্টার,বল রেসার এন্ড ইঞ্জিন অয়েল চেঞ্জ করে অন্যান্য গুলো চেক এন্ড ক্লিন করে দেই।এত দ্রুত সার্ভিস ও আপ্যায়নের জন্য Mr. Bijoy এবং তার টিমকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
পরবর্তীতে আমারা শুরু করি ঠাকুরগাঁও হয়ে পঞ্চগড়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা! দিনাজপুর পার হয়ে আমরা লাঞ্চ করি প্রায় সন্ধ্যার দিকে।
এর কিছুক্ষণ পর শুরু হয় আমার ফুড পয়সনিং!সাথে ডিসেন্ট্রি!অটোমেটিক বমি এন্ড বমি!পেট্রল পাম্পে বেঞ্চের উপর শুয়ে পড়ি।আর কোন উপায় না পেয়ে নাকিব দৌড়ে স্যালাইন এন্ড ঔষধ নিয়ে আসে।সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে,যে যায়গায় এমঅন হলো ওখানে মিনারেল ওয়াটার পাওয়ায় টাফ।এরাউন্ড ১ ঘন্টা পর আমার শরীর একটু এনার্জি পাই।দেন মুভ করি।ঠাঁকুরগাওঁ হয়ে পঞ্চগড়ে স্টে করি।কলা /বন এন্ড স্যালাইন খেয়ে ওই রাতে পার করি।
পরদিন সকাল বেলা ভোরে ফ্রেশ হয়ে চলে যাই তেতুলিয়া হয়ে বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে।ওখানকার বিজিবি সদস্যরা খুবই আন্তঅরিক ছিলেন।অনেকক্ষণ আড্ডা ঘুরাঘুরি পর আমরা আবার পঞ্চগড় ব্যাক করি।
দিনাজপুর: আমার কাছে অনেকটা উন্নত মনে হয়েছে।লোকজন খুবই আন্তরিক ও কৌতুহলী!
পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও : পঞ্চগড় চা ও পাথরের জন্য বিখ্যাত।ঠাকুরগাঁও মোটামুটি জেলা শহরের মতই।কিছুটা কম উন্নত।
এরপর আমরা নীল্ফামারি,সয়েদপুর হয়ে রংপুরে আসি।এরপর চলে যাই তিস্তা ব্যারেজ হয়ে বিখ্যাত তিন বিঘা করিডোরে! ঘুরাফিরা ও বিজিবির সাথে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আড্ডা।পরে আমরা লালমনিরহাট স্টে করি।বখশিবাড়ি রেস্ট হাউস টা খুবই ভালো ছিল।
নীলফামারী,সয়েদপুর,রংপুর,লালমনিরহাট:সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চল বললে ভুল হবে না।কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলে এসব অঞ্চল সোনার খনিতে পরিণত হবে!সরকারে উচিত পুরো উত্তরবঙ নিয়ে কাজ করা, বিশেষ করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য।এখানে খাদ্যশস্যের অভাব নেই,কিন্তু পরিকল্পনা ও ম্যানেজম্যান্ট ও শিল্পকারখানার প্রয়োজন!
এরপর আমরা কুড়িগ্রাম হয়ে গাইবান্ধা আসি এবং ঘুরে আবার বিখ্যাত চিলমারি নদী বন্দরে যাই।ট্রলারে রৌমারি যাই।রৌমারি থেকে শেরপুর,জামালপুর ঘুরে আমরা ময়মনসিংহে পৌছায় রাত ১০.৩০টায়।
কিছুক্ষণ ঘুরে আমরা নেত্রকোনা ঢুকি ১১.২০ এর দিকে!গিয়ে জানতে পারি সুনামগঞ্জের রোড় অফ! প্লান চেঞ্জ।
নেত্রকোনা থেকে কিশোরগঞ্জ আসি প্রায় রাত ১.২০ মিনিটে। হোটেলে ফ্রেশ হয়ে আর্জেটিনা বনাম ইংল্যান্ডের ম্যাচ দেখে ঘুম।এরপরের দিন ঘুম ভাঙে সকাল ১১.৩০ এ।ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে চলে যায় মিঠামইন ও অষ্ট্রগ্রামেত উদ্দেশ্যে! ট্রলারে করে মিঠামইন নামি।ঘুরাফিরা শেষে আবার ব্যাক করি কিশোরগঞ্জ শহরে। পাগলা মসজিদে নামাজ,গুরুদয়াল কলেজ দেখে রাতে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা।পথি মধ্যে ভৈরব ও কুমিল্লায় যাত্রা বিরতি দিয়ে চট্টগ্রাম পৌছি ভোর ৬.২০ এ।বৃষ্টি ছিল হাইওয়ে তে।ঢাকা -চিটাগাং হাইওয়ের তে বৃষ্টি ভিজা সকাল হওয়াটা স্মৃতিতে অনেকদিন চাঙা থাকবে।
এই আটদিন আমাদের কীভাবে যে চলে গেল,আমরা টেরই পাইনি।নিজেদেরকে কিছু সময়ের জন্য সেলিব্রিটি মনে হলো।প্রায় সব জায়গায় মানুষ কৌতুহল নিয়ে আমাদের সাথে কথা বলতে এসেছে।ছবি তুলেছে।এই সহজ সরল মানুষ গুলো ভালো থাকুক সবসময়।সৃষ্টিরকর্তার কাছে এটাই প্রার্থনা!
ধন্যবাদ!