08/06/2026
বিশ্বমাচাদো ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্মাচাদো সরকারের একজন মাচাদো আজ লিখেছেন— ‘মুক্তিযুদ্ধের সময়ে থাকলে আমি মানুষের পক্ষে থাকতাম। জুলাইয়েও আমি মানুষের পক্ষেই ছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ্।’
মুক্তিযুদ্ধ নিশ্চয়ই ‘মানুষ বনাম পিঁপড়ে’, ‘মানুষ বনাম জিরাফ’ কিংবা ‘মানুষ বনাম ডাইনোসর’ যুদ্ধ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ ‘মানুষ বনাম মানুষ’ যুদ্ধই ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ছিল মাত্র দুটো— বাংলাদেশপক্ষ এবং পাকিস্তানপক্ষ। তখন সুযোগ ছিল হয় বাংলাদেশের পক্ষ নেওয়ার অথবা পাকিস্তান ও রাজাকারদের পক্ষ নেওয়ার। অনেকে অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে বুঝে উঠতে পারেননি কোন পক্ষ নেওয়া উচিত। অল্প কিছুদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তারাও সুনির্দিষ্ট পক্ষ অবলম্বন করেছেন অথবা নীরব থেকেছেন। মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে পঞ্চান্ন বছর আগে। যুদ্ধের পঞ্চান্ন বছর পর— পক্ষাবলম্বনের ব্যাপারে— নিশ্চয়ই আর অস্পষ্টতার অবকাশ নেই।
‘মুক্তিযুদ্ধের সময়ে থাকলে আমি মানুষের পক্ষে থাকতাম’— বলার অপেক্ষা রাখে না এটা একটা প্রতারণাপূর্ণ বাক্য। এ এমন এক বাক্য; যা দেখে বাক্যের রচয়িতাকে বাংলাদেশপক্ষও নিজেদের লোক বলে মনে করবে, পাকিস্তানপক্ষও নিজেদের লোক বলে মনে করবে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে কারও পক্ষেই বলা সম্ভব না— ‘মুক্তিযুদ্ধের সময়ে থাকলে আমি পাকিস্তানের পক্ষে থাকতাম’। এমনকি জামায়াতে ইসলামিও এককভাবে ক্ষমতায় থাকলে কেউ প্রকাশ্যে এ-রকম উক্তি করবে না। আবার, অন্তর্মাচাদো সরকার ছিল মেটিকিউলাস মোনাফেকদের আখড়া। ঐ সরকারের উপদেষ্টাদের প্রায় সবাই ভেতরে-ভেতরে পিন্ডিপন্থি হলেও বাইরে-বাইরে মুক্তিযুদ্ধপ্রেমী। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ছিল অন্তর্মাচাদো সরকারের পৃষ্ঠপোষক। ফলে, ঐ সরকারের কারও পক্ষে এটাও সরাসরি বলা সম্ভব না— ‘মুক্তিযুদ্ধের সময়ে থাকলে আমি রাজাকারদের পক্ষে না-থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকতাম’। এমনটা বলামাত্র বৃহত্তর জামায়াতের বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে ঐ উপদেষ্টার দুর্নীতির খতিয়ান প্রকাশিত হতে থাকবে। এজন্য ঐ উপদেষ্টা বলেছেন— ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় থাকলে আমি মানুষের পক্ষে থাকতাম’। এমনটা বলা নিরাপদ, যেকোনো মাপকাঠিতেই নিরাপদ, যেকোনো সরকারের আমলেই নিরাপদ।
মুক্তিযুদ্ধকালে কিছু লোক কোনো পক্ষই অবলম্বন করেননি, চুপচাপ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন কোন পক্ষ জেতে। ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে বাংলাদেশের বিজয় নিশ্চিত হওয়ামাত্র তারা বিজয়মিছিলে ভিড়ে গিয়েছেন, হাতে বন্দুক নিয়ে ছবি তুলেছেন, নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে পরবর্তীকালে সনদ নিয়ে নানান রকমের সরকারি সুযোগ-সুবিধা বাগিয়েছেন। পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করা অনেকেও একই কাজ করেছেন— ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে পক্ষ ত্যাগ করে বিজয়ীপক্ষে মিশে গিয়েছেন। ১৬ তারিখে বাংলাদেশপক্ষ সাজার কারণে বিদ্রুপ করে এদেরকে বলা হয় ‘ষোড়শ পদাতিক বাহিনী’।
যে-উপদেষ্টাকে নিয়ে কথা হচ্ছে— বলাই বাহুল্য— মুক্তিযুদ্ধকালে প্রাপ্তবয়স্ক থাকলে তিনি ষোড়শ পদাতিক বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হতেন, শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান থেকে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীদেরকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র বানাতেন; ফেরার পর শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বানাতেন একাধিক বায়োপিক, রক্ষীবাহিনী ও বাকশালের গুণগান গেয়ে তৈরি করতেন ধারাবাহিক নাটক, সাজতেন ‘শেখ কামালের বন্ধু’। ১৫ আগস্টের পর এই উপদেষ্টা কলাম লিখতেন শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের প্রশংসা করে, বায়োপিক বানানো শুরু করতেন খন্দকার মোশতাক আহমেদেরও, বায়োপিকের নাম— ‘দ্য লাস্ট ডিফেন্ডার অব ডেমোক্রেসি’। মোশতাকের চরিত্রে অভিনয় করতেন তিনি নিজেই। এই উপদেষ্টার চেহারা ও চরিত্র অনেকটা মোশতাকের মতোই। বায়োপিক শেষ হওয়ার আগেই মোশতাকের পতন নিশ্চিত হয়ে যেত। তখন এই উপদেষ্টা পত্রিকায় কলাম লিখতেন ‘আবু সাদাত সায়েম : দায় ও দরদ কায়েম’ শিরোনামে। আলোচ্য উপদেষ্টা এই মুহূর্তে জিয়াউর রহমানের প্রশংসা করে উপর্যুপরি লেখা লিখেই যাচ্ছেন, যা তিনি আওয়ামি লিগের আমলে লেখেননি। ফলে, বলাই বাহুল্য, জিয়ার আমলে প্রাপ্তবয়স্ক থাকলে এই উপদেষ্টা জিয়ার বায়োপিকও বানাতেন, তাতে বেগম জিয়ার চরিত্রে অভিনয় করতেন উপদেষ্টার স্ত্রী, বায়োপিকের নাম— ‘রাইফেল রোটি তাওরাত’। আলোচ্য উপদেষ্টার সাথে সবচেয়ে জমজমাট সম্পর্ক থাকত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের। কারণ, এই উপদেষ্টার নির্মিত বেশিরভাগ নাটক-সিনেমার চরিত্রগুলো বিকৃত যৌনরুচিসম্পন্ন, এরশাদও ছিলেন তা-ই। এরশাদ গল্প লিখতেন, আর এই উপদেষ্টা সেইসব গল্প নিয়ে সিনেমা বানাতেন— দ্য লাস্ট ডেট, শিপ্রাবিদ্যা, হার্ডপার্সন প্লুরাল নাম্বার, মেইড ইন কুচবিহার, লেডিস অ্যান্ড লেফটেন্যান্ট।
অন্তর্মাচাদো সরকারে গিরগিটি ছিলেন প্রধানত দুইজন। এঁদের একজন আইন মাচাদো অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম। ‘মুক্তিযুদ্ধের সময়ে থাকলে আমি মানুষের পক্ষে থাকতাম’— এই উক্তিটা অবশ্য ড. নজরুলের না। উক্তিটা কার, তাও নিশ্চয়ই আর উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। এই উক্তি সেই টাউটের, নিজে পৌনে দুই বছর সংস্কৃতি উপদেষ্টা থাকা সত্ত্বেও এবং পৌনে দুই বছরে অন্তত পঁয়ষট্টিটা শনিবার পেয়েও নিজের বানানো ‘শনিবার বিকেল’ মুক্তি দেয়নি যে-টাউট। নাখালপাড়ার এই টাউট নিজের নির্মিত ‘ফোর টোয়েন্টি’ নাটকের মন্টু-কিছলুর মতোই ফোর টোয়েন্টি, ‘এইট ফোরটি’ নাটকের ডাবলুর মতোই এইট ফোরটি। শান্তিতে নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুস একঝাঁক টাউটকে পৌনে দুই বছরের জন্য একই ছাতার নিচে নিয়ে এসেছিলেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশ এত টাউট একসঙ্গে আগে কখনও দেখেনি।
লিখেছেনঃ আক্তারুজ্জামান আজাদ