30/05/2020
বাংলা অঞ্চলের প্রশাসনিক বিভাগ
বর্তমান বাংলাদেশে ৬৪টি জেলা ও ৮টি প্রশাসনিক বিভাগ রয়েছে। আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে ২৩টি জেলা ও ৩টি বিভাগ। কিন্তু বাঙালি অধ্যুষিত এই দুই স্টেটের বর্তমান জনগণ একে অপর অঞ্চলটির কোন পরিচ্ছন জ্ঞান রাখি না। আসুন, দেখা যাক এই দুই অঞ্চলের প্রশানিক ভূগোল।
বাংলা সুলতানাত (১৩৩৮-১৫৭৮ খ্রি.) যুগে বাংলা নামে প্রথম একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকাঠামোর উদ্ভব ঘটে। আর ১৯১২ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের মাধ্যমে প্রথম কেবল বাংলাভাষীদের একটা স্টেট গঠিত হয় (পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যতিক্রমসহ)। এসময় বাংলা স্টেটে ২৭টি জেলা ছিল, বিভাগ ছিল ৫টি। এগুলো হচ্ছে--
প্রেসিডেন্সি বিভাগ: মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, যশোর, কলকাতা, ২৪ পরগণা ও খুলনা জেলা।
বর্ধমান বিভাগ: বীরভূম, বর্ধমান, বাঁকুড়া, হুগলি, হাওড়া ও মেদিনীপুর জেলা।
রাজশাহী বিভাগ: রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, মালদহ, দিনাজপুর, রংপুর ও জলপাইগুড়ি জেলা।
ঢাকা বিভাগ: ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলা।
চট্টগ্রাম বিভাগ: চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, তিপেরা (কুমিল্লা), বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) ও ফরিদপুর জেলা।
এক সময় দার্জিলিং জেলাকে বিহার প্রদেশ থেকে উত্তরবঙ্গে দেয়া হয়। বাংলা ভাষাভাষী গোয়ালপাড়া জেলা এবং ছিলটী ভাষাভাষী বরাক উপত্যকা (সিলেট ও কাছাড় জেলা) ছিল আসাম প্রদেশের অংশ।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ বাংলা দ্বিতীয় বার বিভক্ত হলে রাজশাহী ও প্রেসিডেন্সি বিভাগও বিভক্ত হয়। বর্ধমান বিভাগ পশ্চিম বাংলায় আর ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ পূর্ব পাকিস্তানে যায়। কয়েকটি জেলাও বিভক্ত হয়। মালদহ, মুর্শিদাবাদ, ও নদীয়া জেলা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও পশ্চিম বাংলায় দেয়া হয়। আর খুলনা জেলা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলায় দেয়া হয়। সিলেট জেলা গণভোটের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে যোগ দেয়, তবে সিলেটের করিমগঞ্জ মহকুমা কেটে রেখে কাছাড় জেলায় [আসাম প্রদেশে] যুক্ত করা হয়। সিলেট জেলাকে চট্টগ্রাম বিভাগে যুক্ত করা হয়।
নদীয়া ও দিনাজপুর জেলা খাড়াখাড়ি ভাগ হয়। নদীয়া জেলার পূর্বাংশ (কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা মহকুমা) পাকিস্তানে এসে কুষ্টিয়া জেলা গঠিত হয়। দিনাজপুর জেলার পশ্চিমাংশ ভারতে কেটে রেখে নতুন জেলা গঠিত হয়। জলপাইগুড়ি থেকে পঞ্চগড় মহকুমা কেটে পাকিস্তানে দেয়া হয় যা দিনাজপুর জেলায় যুক্ত হয়। মালদহ জেলা ভারতে দেয়া হয়, তবে এর চাঁপাই নবাবগঞ্জ মহকুমা কেটে রেখে রাজশাহী জেলায় যুক্ত করা হয়। যশোর জেলা থেকে বনগাঁও মহকুমা কেটে পশ্চিম বাংলায় দেয়া হয়।
মালদহ, পশ্চিম দিনাজপুর, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে জলপাইগুড়ি বিভাগ গঠিত হয়। পরে দেশীয় (নন-ব্রিটিশ) রাজ্য কোচবিহার এতে জেলা হিসেবে যোগ দেয়। মুর্শিদাবাদ, (পশ্চিম) নদীয়া, কলকাতা ও ২৪ পরগণা প্রেসিডেন্সি বিভাগ হিসাবে থাকে। পরে বিহারের মানভূম জেলা থেকে বাংলাভাষী অঞ্চল আলাদা করে পুরুলিয়া জেলা হিসাবে বর্ধমান বিভাগে যুক্ত করা হয়।
রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, রংপুর ও (পূর্ব) দিনাজপুর জেলা রাজশাহী বিভাগে থেকে যায়। খুলনা ও যশোর ও নবগঠিত কুষ্টিয়া জেলাকে প্রথমে রাজশাহী বিভাগে দেয়া হলেও ১৯৬০ সালে এদের সাথে বরিশাল জেলাকেও যুক্ত করে নতুন খুলনা বিভাগ গঠন করা হয়। ফরিদপুর জেলাকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা বিভাগে দেয়া হয়।
১৯৮৪ সালে বাংলাদেশে সকল মহকুমাকে জেলা ঘোষণা করলে রাতারাতি ৬৪টি জেলা তৈরি হয় যা এখন বিদ্যমান। এরপর থেকে পুরনো জেলাসীমানাকে বাংলাদেশে বৃহত্তর জেলা বলা শুরু হয়। ১৯৯৩ সালে বৃহত্তর বরিশাল এবং ১৯৯৫ সালে বৃহত্তর সিলেটকে আলাদা বিভাগ করা হয়। বৃহত্তর দিনাজপুর ও রংপুর নিয়ে ২০১০ সালে রংপুর বিভাগ গঠিত হয়। ২০১৫ সালে ময়মনসিংহ বিভাগ গঠিত হলেও এর দুইটি সাবেক মহকুমা টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ ঢাকা বিভাগেই রয়ে যায়। বর্তমানে কুমিল্লা ও ফরিদপুর দুইটি নতুন বিভাগ প্রস্তাবিত রয়েছে।
অন্য দিকে পশ্চিম বাংলায় কয়েকটি বড় জেলা ভেঙে নতুন জেলা তৈরি হয়েছে। পশ্চিম দিনাজপুর ভেঙ্গে উত্তর দিনাজপুর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা হয়েছে। চব্বিশ পরগণা জেলাও উত্তর-দক্ষিণে আলাদা জেলায় ভাগ হয়েছে। মেদিনীপুর জেলা ভেঙ্গে পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম জেলা হয়েছে। জলপাইগুড়ি জেলা কেটে নতুন আলিপুর দুয়ার জেলা হয়েছে। বর্ধমান জেলা কেটে পশ্চিম বর্ধমান জেলা আলাদা হয়েছে যার সদর হচ্ছে আসানসোল। আমরা এতদিন জানতাম জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম বর্ধমান জেলায়, এখন থেকে বলতে হবে পশ্চিম বর্ধমান জেলায়।
প্রথম ছবিতে বাংলা ও সন্নিহিত অঞ্চলের বৃহত্তর জেলাসমূহ এবং দ্বিতীয় ছবিতে বাংলার উপভাষা অঞ্চল দেখা যাচ্ছে।
মূল পোস্টের লিংকঃ-
https://m.facebook.com/groups/640273622660749?view=permalink&id=3229105317110887