04/08/2014
বিশ্ব ঐতিহ্য আমাদের সুন্দরবন
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য্যরে উজ্জ্বল নির্দশন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট সুন্দরবন। এখানে বিশ্ববিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর চিত্রল হরিণের অবাধ বিচরণ। বন আর সমুদ্রের এ মহামিলন পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না।
বনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী। আর এ সুন্দরী বৃক্ষের নামানুসারেই এ বনের নামকরণ বলে অধিকাংশ লোকের বিশ্বাস। আবার অনেকের মতে এটা সমুদ্রবন শব্দের অপভ্রংশ। কেউ কেউ বলে বাখরগঞ্জ জেলার সুন্ধানদী হতে সুন্দরবন নামের উৎপত্তি।
পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট সুন্দরবনে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছোট বড় অনেক খাল ও নদী। এগুলোর নামও খুব সুন্দর। যেমন-হংসরাজ, রায়মঙ্গল, কটকা, ডুমুরিয়া, মরাবগী, ধানসাগর, সূর্যমুখী, পদ্মাবতী, আন্ধারমানিক, ঝনঝনিয়া, জয়মনি বলেশ্বর, পশুর, কলাগাছি, মালঞ্চ, নীলকমল ইত্যাদি। মোট কথা ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬৮৫ হেক্টর এলাকা নিয়ে প্রায় সাড়ে চারশ’ ছোট বড় নদী সুন্দরবনের প্রায় ৩০ ভাগ এলাকা দখল করে আছে।
বিচিত্র সব বৈশিষ্ট্যের সমাহার ঘটেছে বনের উদ্ভিদরাজিতে। গঙ্গার পলিমাটি ও মিষ্টি পানির সাথে সমুদ্রের লবণাক্ত পানির সংযোগে কিছু বিশেস বিশেষ বৃক্ষগুল্মের জন্ম হয়েছে। এটাই সুন্দরবনের বিশেষত্ব। সুন্দরী, পশুর, ধুন্দুল, গরান, বাইন, কাকড়া, আমুড়, সিংড়া, খলসী, হেতাল, কেওড়া, গোলপাতাসহ অসংখ্য অর্কিড ও লতাগুল্ম পাওয়া যায় এ বনাঞ্চলে। দৈনিক দু’বার জোয়ারে প্লাবিত হয় বলে বাংলাদেশের অন্যান্য বনের বৃক্ষের সাথে কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না এই বনে। জোয়ার ভাটা ও লবণাক্ত পানির হাত থেকে বাঁচার জন্য অধিকাংশ গাছ শ্বাসমূলের সাহায্যে শ্বাস কার্য চালায়। এছাড়া কোন কোন গাছে ঠেসমূল ও বায়বীয় মূল দেখা যায়। এ থেকেই যে অংকুরোদগম হয়, তাই ম্যানগ্রোভ প্রজাতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় সংযোজন। গাছে ফল থাকা অবস্থায় বীজ অংকুরিত হয়। পরে নীচে পড়ে পানিতে ভেসে ভেসে দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং গড়ে তোলে নতুন বনভূমি। এ জাতীয় গাছের মধ্যে গরান, কাঁকড়া, গর্জন, ভাতকাঠি, গৈরা ও খলসি উল্লেখযোগ্য।
গাছের মজুদ ও ঘনত্ব বিবেচনায় সুন্দরবনকে ৩টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়:
বিচিত্র সব বন্যপ্রাণী সমৃদ্ধ সুন্দরবন আমাদের অহংকার। বিশ্ববিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল হরিণ, বনের কুমির, গুইসাপ, উদবিড়াল, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সাপ এই বনের বাসিন্দা। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা প্রায় ২৭০-৩৫০, হরিণ ৮০,০০০-১,০০,০০০, কুমির ২০০, উদবিড়াল ২০০০০ এবং বানর ৫০০০০। একদা এই বনে বুনো মহিষ, ব্রহ্মদেশীয় গন্ডার ও বারোশিংহা হরিণ দেখা যেতো। এখন নেই।
পাখি এ বনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এখানে এমন কিছু পাখি প্রজাতি আছে যা বাংলাদেশের অন্য কোথাও দেখা যায় না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাখি মদনটাক বা হাড়গিলা এই বনেরই বাসিন্দা। প্রায় নয় প্রজাতির মাছরাঙা পাখির দেখা মেলে এই বনে। শীতকালে সুন্দরবন ও এর কাছাকাছি চর ও দ্বীপাঞ্চলে হিমালয় ও সাইবেরীয়া থেকে আগত অতিথি পাখির মিলন মেলা বসে। এই সমস্ত পাখির অধিকাংশই হাঁস প্রজাতির।
সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর প্রজাতি ভিত্তিক সংখ্যা
অর্থনৈতিক দিক থেকেও সুন্দরবন আমাদের জাতীয় জীবনে বিশেষ অবদান রাখছে। এই বনের কাঠ জ্বালানী, আসবাবপত্র, কাগজ, হার্ডবোর্ড, দিয়াশলাই ও ঘরবাড়ী তৈরিতে ব্যাপক ব্যবহৃত হয়। সুন্দরবন থেকে প্রতি বছর গড়ে ২০০ টন মধু ও ৫০ টন মোম আহরিত হয়। মৌয়ালরা মধু সংগ্রহের কাজ করে থাকে। এছাড়া বনের নদ-নদী, খাল-বিল ও সমুদ্র উপকূল হতে প্রচুর মাছ ধরা হয়। এক হিসেবে জানা গেছে, প্রতি বছর বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে সুন্দরবনে চিংড়ি পোনা ও সাদা মাছ সংগ্রহের জন্য প্রবেশ করে ১ লাখ ২০ হাজার নৌকা।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প বিকাশে সুন্দরবনের জুড়ি নেই। প্রতি বছর হাজার হাজার দেশী ও বিদেশী পর্যটক বন ও বনসংলগ্ন দ্বীপাঞ্চল ভ্রমণ করে থাকে। দিন দিন পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্যাপক প্রচার, যাতায়াত ও থাকার সুবন্দোবস্ত করতে পারলে ভবিষ্যতে এই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
সুন্দরবন আজ শুধু বাংলাদেশের একার নয়, আজ তা বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনেসকো ১৯৯৭ সালের ৬ই ডিসেম্বর ২১তম অধিবেশনে সুন্দরবনকে ৫২২তম বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং এ বনের জীব বৈচিত্র্য (ঊপড়-ফরাবৎংরঃু) রক্ষায় বিভিন্নভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ অধিবাসীর জন্য সুন্দরবন যেন এক মহা রক্ষাকবচ। ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস থেকেও এই বন আশেপাশের জনপদ ও লোকালয়কে সুরক্ষা করে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। সাগর তটভূমির ষাট মাইল লম্বা একটানা ম্যানগ্রোভ প্রাচীর না থাকলে দক্ষিণ উপকূলীয় জনপদ এতদিনে বিরান হয়ে যেত।
কিন্তু দু:খের বিষয়, বিশ্ব ঐতিহ্যের ধারক সুন্দরবন আজ আর তার স্বমহিমায় উদ্ভাসিত নেই। এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী, চোরাকারবারী ও বন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অবহেলায় সুন্দরবন ও তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য হারিয়ে ধ্বংসের মুখোমুখি। এছাড়া ফারাক্কা বাঁধের অশুভ প্রভাবে বনমধ্যে প্রবাহিত নদনদী ও খাল বিলের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ায় পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে গেছে। ফলে সুন্দরী গাছের ‘আগামরা রোগ’ সহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিয়ে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল গাছশূন্য ও বিরান হয়ে গেছে। এ সমস্যা রোধকল্পে অনতিবিলম্বে যথাযথ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ও গবেষনা প্রয়োজন। সুন্দরবনের স্বাভাবিক জীববৈচিত্র সংরক্ষণে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ হয়েছে সামান্যই। সুন্দরবনের গাছ গাছালি ও বন্য প্রাণীসমূহের অবাধ বিচরণের নিরাপত্তার জন্য তিনটি অভয়ারণ্য থাকলেও প্রতিদিনই ধ্বংস হচ্ছে এর স্বাভাবিক অবস্থা। জীব বৈচিত্র সংরক্ষণের জন্য গঠিত এই অভয়ারণ্য তিনটি হলো- সুন্দরবন পশ্চিম, সুন্দরবদক্ষিণ ও সুন্দরবণ পূর্ব।
পরিবেশের উপর মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপে পরিবেশ শৃঙ্খল ভেঙ্গে গেছে। ভূ-মন্ডলের জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবনের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে আগামী ৫০ বছরে এই বনের উল্লেখযোগ্য অংশ সমুদ্র গর্ভে হারিয়ে যেতে পারে।
সুন্দরবন আমাদের অহংকার। আমাদের জাতীয় জীবনে বেঁচে থাকার প্রশ্নে, অস্তিত্বের প্রশ্নে এই বনের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই শুধু কাগজে কলমে নয় বাস্তবে এ বনের রক্ষণাবেক্ষণ করে এর উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এই বন কেবল এই দেশের সম্পদ নয়, এটা বিশ্বেরও সম্পদ। আমরা নিজেরা নষ্ট না করলে এই বন শত হাজার বছরেও নষ্ট হবে না। এখনই সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে পারলে এই বন যুগ যুগ ধরে উদার হস্তে তার সুধা ও মহিমা বিলাতে থাকবে।
Collected from http://travelnewsbd.com/