11/01/2025
ছিংহাই-তিব্বত ট্রেন, ছিংহাই-তিব্বত রেলপথ', তিব্বত রেলপথ বা কিংজাং রেলপথ নামে পরিচিত, এই রুটটি ১,৯৫৬ কিমি দীর্ঘ এবং এটি কিংহাই প্রদেশের শিনিং থেকে গোলমুদ হয়ে তিব্বতের লাসা পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি বিশ্বের উচ্চতম রেলপথ যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫,০০০ মিটারেরও (১৬,০০০ ফুট) বেশি উচ্চতায় অবস্থিত, এই রেলপথটি প্রকৌশল বিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন। নির্মাণের সময় এই রেল্পপথকে একদিকে যেমন স্বাগত জানানো হয়েছিল, তেমনি এর বিরোধিতাও হয়েছিল; সমালোচকদের মতে, এটি অর্থনৈতিক নয় বরং রাজনৈতিক ও সামরিক কারণেই নির্মিত হয়েছিল। একদিকে, এই রেলপথ তিব্বতে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে, কারণ এটি পণ্য পরিবহনকে পুরনো মহাসড়কের তুলনায় দ্রুত, সস্তা এবং নিরাপদ করে তোলে। অন্যদিকে, এই রেলপথ হান চীনা জনগণের তিব্বতে যাতায়াত সুগম করে তোলে, যা অনেক তিব্বতীই বিরোধিতা করেন। এটি তিব্বতের উপর কেন্দ্র সরকারের আরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সক্ষম করে, যেমন উনবিংশ শতাব্দীতে রেলপথ ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার জাতি ও সাম্রাজ্যগুলিকে একত্রিত করেছিল।
ইতিহাস
সম্পাদনা
তিব্বত এবং হান চীনের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে রেলপথটির ধারণা নতুন নয়। ১৯১৯ সালে চীনের প্রথম রাষ্ট্রপতি সান ইয়াত-সেন প্রথমবার লাসা থেকে লানঝৌ পর্যন্ত একটি রেলপথ প্রস্তাব করেন। তবে ১৯১২ সালে তিব্বত একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করার কারণে চীন প্রজাতন্ত্রের তিব্বতের উপর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ না থাকায়, এই রেলপথ নির্মাণ রাজনৈতিকভাবে সম্ভব ছিল না।
১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন ঘোষণার পর এবং ১৯৫১ সালে তিব্বত চীনের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসার সাথে সাথেই তিব্বতে একটি রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। শিনিং থেকে গোলমুদ অতিক্রম করে নানশানকৌ পর্যন্ত প্রথম ৮১৪ কিমি (৫০৬ মাইল) অংশটি ১৯৮৪ সালে সম্পন্ন হয়, তবে উচ্চ মালভূমির উপর দিয়ে বাকি রেলপথ নির্মাণে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বেশ কয়েকটি প্রকৌশলগত সমস্যা তৈরি হয়। সেই সময়ের প্রযুক্তি দিয়ে এই সমস্যাগুলির সমাধান করা সম্ভব ছিল না, ফলে ২০০১ সাল পর্যন্ত নির্মাণ কাজ স্থগিত রাখা হয়।
রেলপথের পাশে স্থায়ীভাবে জমাটবদ্ধ মাটির মধ্যে ভূ-তাপীয় ক্ষেত্র।
রেলপথের দ্বিতীয় বিভাগের প্রায় ৯০% অংশ ৪,০০০ মিটার (১৩,০০০ ফুট) বেশি উচ্চতার ভূভাগের মধ্য দিয়ে যায়। এই উচ্চতায় বায়ু চাপ কম তাই অক্সিজেনও কম, এই জন্য শ্রমিকদের কাজ করা এবং যন্ত্রপাতি পরিচালনা করা সমস্যাজনক হয়। যেহেতু ডিজেল ইঞ্জিনগুলি কাজ করতে অক্সিজেনের প্রয়োজন, এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় এখানে অক্সিজেনের পরিমাণ কম, তাই এই রেলপথে যাতায়াত করে এমন ট্রেনগুলিকে তিনটি ইঞ্জিন দ্বারা টেনে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রায় ৫৫০ কিমি জুড়ে রেলপথটি স্থায়ীভাবে জমাটবদ্ধ মাটির (পারমাফ্রস্ট) উপর দিয়ে চলে, এবং যদি ট্রেনের তাপ থেকে মাটি গলতে শুরু করে, তাহলে রেলপথটি স্থানচ্যুত হয়ে যাবে। যেখানে রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে সেখানকার মাটি জমাটবদ্ধ রাখতে, সেখানে হাজার হাজার তাপ বিনিময়কারী যন্ত্র মাটিতে পোঁতা হয়েছে। রেলপথের অন্যান্য অংশ খুঁটির উপর নির্মিত হয়েছে, যাতে রেলপথ এবং পারমাফ্রস্টের মধ্যে একটি দূরত্ব বজায় থাকে এবং ভূপৃষ্ঠে শীতল হাওয়া প্রবাহিত হতে পারে।
উচ্চ মালভূমি অঞ্চলে বসবাসকারী চামরী গাই এবং হরিণ প্রতি বছর বড় বড় ঝাঁক বেঁধে রেলপথের উপর দিয়ে ঘোরাফেরা করে। এজন্য বেশ কয়েকটি বন্যপ্রাণী পারাপার হওয়ার পথের ব্যবস্থা করতে হয়েছে, এবং দীর্ঘ অংশে রেলপথটি দীর্ঘ সেতুর উপর দিয়ে চলে, যা অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে ট্রেনের তাপে মাটি গরম হওয়া রোধ করে।
চূড়ান্ত বড় সমস্যা ছিল উচ্চভূমিতে চলমান বালুর ঢিবি। রেলপথকে বালির নিচে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য, রেলপথের পাশে বড় পাথরের প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছিল।
নির্মাণ কাজ ২০০১ সালে পুনরায় শুরু হয়, রেলপথটি ২০০৫ সালে সম্পন্ন হয় এবং এক বছর পর নিয়মিত ট্রেন চলাচল শুরু হয়। তখন থেকে এই রেলপথে যাত্রীরা বিশ্বের সর্বোচ্চ উঁচু রেলপথ (তাংগুলা গিরিপথ, ৫,০৭২ মিটার বা ১৬,৬৪০ ফুট), উচ্চতম রেলওয়ে স্টেশন (তাংগুলা স্টেশন, ৫,০৬৮ মিটার), এবং সর্বোচ্চ রেল সুড়ঙ্গ (ফেংহু-শান সুড়ঙ্গ, ৪,৯০৫ মিটার) দেখতে পান।