13/08/2025
#ভ্রমণে_সতর্কতা
আমরা রীতিমিত হাপাচ্ছি। কারণ বেশ অনেকগুলো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয়েছে। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া ক্ষুধাও পেয়েছে খুব। লাঞ্চ করে একটু রেস্ট নিয়ে যেতে হবে আরেকটি স্পট দেখতে। কিন্ত সবাই ফিরলেও গ্রুপের ২ জন ফেরেননি।
বলছিলাম আমার মেঘালয় ট্রিপের একটি ঘটনা। ২০১৯ সালে একটি স্বনামধন্য গ্রুপের সাথে মেঘালয় যাই। সকালের নাস্তার পর আমাদেরকে গাড়ি করে লিভিং রুট ব্রিজের পার্কিং এ নেয়া হলো। ব্রীফ করা হলো কতক্ষণ পর আবার এখানে জড়ো হবো এসব। বীফিং শেষে সবাই হাটা দিলাম। জায়গাটা এমন, পার্কিং থেকেই পাহাড়ি গাছপালার ভেতরে ঢুকে হেটে বেশ অনেকটা নিচে গেলে পাহাড়ি ঝিরির উপরে এই ব্রিজ। অনেক পর্যটক আসা যাওয়া করতে করতে গাছপালার ফাঁকে রাস্তা এম্নিতেই তৈরি হয়ে গেছে আর ঢালু জায়গা থেকে নিচের দিকে পাহাড়ের গা বেয়ে পাথরের সিঁড়ি করা এবং খাদের দিকে রেলিং দেয়া আবার বাঁশের তৈরি কিছু দোকানও আছে ফল, পানি, চিপ্স এসবের। বেশ অনেকটা নামার পর সিঁড়ির পাশে একটা জায়গা থেকে টিকিট নিতে হয়। এই জায়গাটা একটু ভীড় থাকে। যাই হোক, আমরা সবাই নিচে গিয়ে ছড়িয়ে গেলাম। যার যার মত ছবি তোলা, ঝিরি পার হয়ে ওপাশে গিয়ে দেখা, ভিডিও করা এসব চলছে।
আমার একটা অভ্যাস আছে। সেটা নিজের নিরাপত্তা বা সতর্কতা যাইই বলুন না কেন, আমি কোথাও একা গেলে বাকি ট্যুরমেটদের দিকে একটু পর পরই নজর রাখি। অর্থাৎ ওরা আছে কি নেই। আবার বাসে একা কোথাও গেলেও রেস্টুরেন্ট ব্রেকে (রাতে বা দিনে) বাসের নম্বর প্লেটের ছবি তুলে রাখি এবং কিছু যাত্রিকে চিনে রাখি, আর খেয়াল রাখি এরা কখন বের হচ্ছে বা আমি তাদের দেখতে পারছি কি না। তো, নির্দিষ্ট সময় শেষ হবার আগেই আমরা একে অপরকে তাগাদা দিয়ে উপরের দিকে রওনা হলাম। আমি রওনা হবার পরও কিছু আপু নিচে ছিলেন, হয়তো পেছনে আসবেন। ফেরার সময় একটা জায়গায় এসে দেখলাম পথটা দু'ভাগ হয়ে একটা সোজা উপরে চলে গিয়েছে এবং আরেকটা ডানে গিয়েছে। দুই পথে লোক চলাচল করছে কিন্ত উপরের পথটা আসার পথে আমার চোখে পড়েনি পেছনে থাকার কারণে।
আমার আরেকটা অভ্যাস রাস্তায় হাটলে কিছু জিনিস বা চিহ্ন চিনে রাখা। কোন দিকে মোড় নিয়েছিলাম, সোজা উপর থেকে এসেছিলাম কি না এসব মিলিয়ে ডানের পথে এসে পার্কিং পেয়ে গেলাম। আমার পেছনে অন্য আপুরাও ছিলেন। ট্যুর অপারেটর আপুরাও তখন পার্কিং এ। আমি বসে রেস্ট নিচ্ছি আর সবার ফেরার অপেক্ষায়। কিন্ত কিচ্ছুক্ষণের মিধ্যে সবাই ফিরলেও ২ জন আপু মিসিং। অনেক্ষণ অপেক্ষা করেও ওনারা না ফেরাতে গ্রুপের গাইড আপু এবং একজন ছেলে গাইডও ছিলেন উনি পুরো পথ নিচ পর্যন্ত অন্তত ৩/৪ বার চষে ফেললেন যা খুবই কষ্টসাধ্য ছিলো কিন্ত ওই দুইজন গায়েব। সবাই এবার টেনশনে। ওদের কাছে ফোনও নেই, কারণ সিম একমাত্র ট্যুর গাইডের কাছে। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, ক্ষুধায় টেনশনে সবাই শেষ। কেউ কেউ রাগ হয়ে যাচ্ছে ওদের এমন অবিবেচক কাজ-কারবার দেখে। আবার দুশ্চিন্তাও হচ্ছে। খাবার পর আরেক স্পট দেখার কথা। সে নাহয় বাদ গেলো কিন্ত ওদের দুইজনের খবর বের না করেতো এখান থেকে যাওয়া যাবে না। খোজাখুজি চলছে। প্রায় দেড় ২ ঘন্টা পর এরা পার্কিং এ আসলো ঠিক বিপরীত দিক দিয়ে। ওদের অবস্থাও কাহিল দেখেই বুঝা যাচ্ছে।
কিন্ত এসে এরা দু:খপ্রকাশ তো দূরে থাক এমন ঝগড়া শুরু করলো গাইডের সাথে যে বলার বাইরে। সে এক হুলুস্থুল অবস্থা। গাইড কেন তাদের খুঁজে আনলো না। এদিকে বাকিরাও উত্তেজিত! জানা গেলো তারা ওই উপরের রাস্তায় চলে গিয়েছিলো পাহাড়ের উপরে। সেদিক দিয়ে অন্য পর্যটকদের সাথে জেনে জেনে তারপর এখানে আসতে পেরেছে।
উপরের এত বিশাল ঘটনা বলার অর্থ এখানে একটুখানি ভুলের জন্য পুরো টীমকে সাফার করতে হলো। স্পট দেখা বাদ গেলো এবং টেনশনে অবস্থা খারাপ হলো।
এর থেকে শিক্ষা হলো, আপনি যদি ট্যুরিস্ট হন তবে অবশ্যই আপনার ট্যুরমেটদের খেয়াল করে আসা যাওয়া করতে হবে। আর যদি ট্যুর গাইড হন, তবে সবার পেছনে বা সবার সামনে আপনার প্রতিনিধি রাখতে হবে এবং কিছুদুর আসার পর পর খেয়াল রাখতে হবে যে সবাই আসলো কি না বা যাচ্ছে কি না। যদিও সবাই প্রাপ্তবয়স্ক কিন্ত ট্যুরে গেলে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তবে আপনি ট্যুরিস্ট হোন কিংবা গাইড, সমান সতর্ক দুই পক্ষকেই থাকতে হবে। দোয়া করি কোনো ট্যুর গাইড বা পর্যটক যেন ট্যুরে গিয়ে কোনো সমস্যায় না পড়েন। একটি সুন্দর ভ্রমণ যেনো সবার সারাজীবনের ভালো একটি স্মৃতি হয়ে থাকে।
ছবি: লিভিং রুট ব্রিজের সামনে
মেঘালয়, ভারত