17/06/2026
।। "বীর" গাঁথা ।।
না এটা কোন মনুষ্য বীরকে নিয়ে লেখা নয়। আরবি বীর শব্দের অর্থ কুয়া বা কুপ। ইসলামের ইতিহাসে তিনটি ঐতিহাসিক রীর বা কুয়ার গল্প কথা আজকে বলবো।
• বীরে শিফাঃ প্রথম হক বাতিলের যুদ্ধ বদরে বিজয়ের পরে মুসলিম বাহিনী যখন মদীনায় ফিরছিল তখন বদরের অদূরে এবং মদীনা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে একটি স্থানে যাত্রা বিরতি হয়। এখানে একটি পানির কুয়া ছিল, কিন্তু লবণাক্ততা এবং গন্ধের জন্য যার পানি খাওয়ার অযোগ্য অবস্থায় ছিল। এদিকে সাহাবীদের বাহিনীর জন্য পানির প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কূপের কাছে যেয়ে বসে নিজের মুখের থুতু মোবারক কূপের ভিতর নিক্ষেপ করেন। আল্লাহর অশেষ রহমতে সাথে সাথেই কূপের পানির লবণাক্ততা দূর হয়ে যায় এবং পানি সুমিষ্ট এবং সুপেয় হয়ে ওঠে। তারপরে পুরো বাহিনী সেখান থেকে তৃপ্তি সহকারে পানি পান করে। 'শিফা' অর্থ আরোগ্য। কূপ থেকে পানি পান করার পরে অনেক সাহাবীর ক্লান্তি এবং অসুস্থতা দূর হয়ে গিয়েছিল এবং সেজন্য এটার নামকরণ করা হয় "বীরে শিফা।" বর্তমানে কূপটি কংক্রিটের গাঁথুনি দিয়ে ঢেকে রাখা এবং মটর দিয়ে পানি তোলার ব্যবস্থা আছে। জনসাধারণের জন্য এটি এখনো উন্মুক্ত আছে এবং দর্শনার্থীরা চাইলেই পাশের জলধার থেকে কূপের পানি সংগ্রহ করতে পারেন।
• বীরে গারসঃ মসজিদে নববী থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দক্ষিনে এই কূপের অবস্থান। হিজরতের পরের প্রথম দিকের কূপ এটা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই কূপের পানি পান করতেন, এই কূপের পানি দিয়ে অজু করতেন এবং অজুর পরে অবশিষ্ট পানি আবার কূপের মধ্যে ঢেলে দিতেন। আলহামদুলিল্লাহ, কূপের পানি আজও সুমিষ্ট এবং সুপেয় আছে। নবীজির ইচ্ছা এবং ওসিয়াত অনুযায়ী হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পরে এই কূপের পানি দিয়েই তাঁর গোসল দিয়েছিলেন। সৌদি সরকার হেরিটেজ সাইট হিসেবে এটাকে চিহ্নিত করায় কূপের কাছে যাওয়ার জন্য দর্শনার্থীদের কে এখন প্রবেশ ফি দিতে হয়। কূপের কাছে যাওয়ার পরে অবশ্য ইচ্ছামত পানি খাওয়ার এবং বোতলে করে পানি নেওয়ার সুযোগ আছে।
• বীরে রূমা/বীরে উসমান (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু)ঃ এটার সাথে জড়িয়ে আছে হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর একটি সদাকার কাহিনী। মরুভূমিতে পানির কষ্ট সবসময়ই থাকে, মদিনায় মুহাজির সাহাবীদের হিজরতের পরে পানির চাহিদা স্বাভাবিক ভাবেই বেশ বেড়ে গিয়েছিল। পাশেই রুমা নামক এলাকায় এক ইহুদীর একটা কূপ ছিল, যার পানি তারা খাওয়ার জন্য ব্যবহার করতো। উসমান রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু সেই ইহুদীর কাছ থেকে কূপটা কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। সে বিক্রি করতে চায় না। কিন্তু অনেক দেন দরবারের পরে লোভে পড়ে ইহুদী এই শর্তে বিক্রি করে যে একদিন উসমান রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু পানি নিবেন আর একদিন সে পানি নিবে। তার ধারণা ছিল প্রকারান্তে মালিকানা তার কাছেই থাকছে মাঝখান থেকে সে কিছু অর্থ আদায় করে নিচ্ছে। কিন্তু উসমান রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু, উনার পানি নেওয়ার দিন মদীনার মুসলমানদেরকে বললেন তার সাথে পানি নিতে। স্বাভাবিকভাবেই ঐদিন ইহুদীর ধারণার থেকে অনেক বেশি পানি উত্তোলিত হয় এবং পরের দিন ইহুদীর পানি পেতে কষ্ট হয়। এরকম কয়েক দিন হওয়ার পরে ইহুদী তখন পুরো কূপটাই উসমান রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর কাছে বিক্রি করে দেয়। উসমান রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু সাথে সাথেই সম্পূর্ণ কূপটা মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করে দেন যা তাদের পানির সমস্যা সমাধানে বড় ভূমিকা রাখে। তখন থেকেই এই কুয়াটা বীরে উসমান নামে পরিচিত। ওয়াকফের নীতি অনুযায়ী এখনো পর্যন্ত কূপের এবং তার আশেপাশে উসমান রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর কেনা জায়গাটুকু থেকে যা সম্পদ আসে তা আল্লাহর রাস্তায় সদাকাহ করা হয়। জায়গাটি অসাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত নয়, সীমানার বাইরে থেকেই দেখতে হয় যতটুকু দেখার।