28/10/2020
#পাহাড়ি_নদী_আর_সবুজে_ভরা_লেঙ্গুরা
নেত্রকোণা বরাবরের মতই আমার কাছে প্রাকৃতিকভাবে সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ একটি জেলা হিসেবে পরিচিত। প্রথমবার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো ২০১২ সালে। তখন ইন্টারনেট ঘাটলেও তেমন কোন তথ্য পাওয়া যেত না এমনকি ইন্টারনেটের সহজলভ্যতাও তেমন ছিলো না। আমাদের কাছে তখন তথ্য পাওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম ছিলো প্রথমে আলো, কালের কন্ঠ, বাংলাবাজার পত্রিকা, কিংবা আরো দু-একটা পত্রিকার সাপ্তাহিক ফিচারগুলো। সেবার সারাদিন ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্যে আমরা তিন বন্ধু ঘুরে ছিলাম প্রিয় নেত্রকোনার দুর্গাপুরে।
এবারও আবার নেত্রকোনায় যাওয়ার ইচ্ছে হলো। সঙ্গী হলো বন্ধু ইয়াসিন। ওর এবার প্রথমবার নেত্রকোনা ভ্রমন। ট্যুর প্ল্যান সেট করার সময় দুর্গাপুরের জন্য একদিন এবং ট্রাভেলারদের কাছে অপ্রচলিত আরেকটি জায়গা কলমাকান্দার লেঙ্গুরার জন্য একদিন রাখলাম। আমাদের হাতে যথেষ্ট দিন ছিলো বলেই জায়গা দুটি দুইদিন রেখেছি। কিন্তু একদিনেও ঘোরা সম্ভব।
দুর্গাপুজার বন্ধের আগের দিনে অফিস থেকে ছুটি বাগিয়ে নিয়ে মোট ছুটি বানালাম ৪ দিন। বৃহস্পতিবার রাতের বাসে আমরা যাবো দুর্গাপুর। আগে থেকে টিকেট কেটে রাখিনি কেননা এদিকে বাস মোটামুটি কম বেশ থাকেই। আর তেমন ভাল কোন ট্রান্সপোর্ট কোম্পানী না থাকায় সিদ্ধান্ত নিলাম বাস স্ট্যান্ড থেকেই তাৎক্ষনিক টিকেটে কেটে উঠে পড়বো। ট্রেনের সিদ্ধান্ত নেইনি, কেননা হাওর এক্সপ্রেস সময় বদল করে এখন রাত সোয়া দশটায় ঢাকা ছাড়ে এবং রাত ২-৩ টায় নামিয়ে দেয় নেত্রকোনার শ্যামগঞ্জ। সেখান থেকে আবার অত রাতে সিএনজি নিয়ে দুর্গাপুর যাওয়াটা ভাল মনে হলো না। সেদিন খানিক ঘনঘন বিরতি দিয়েই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হতে শুরু করলো ঢাকায়। দুই বন্ধু মহাখালী পৌছে গেলাম সময়মত। কিন্তু বিধিবাম! দুর্গাপুরের বাস আছে দুইটা এবং দুইটাতেই সব সিটের টিকেট বিক্রি শেষ। এখন উপায় একটি বাসে ইঞ্জিন বনাটের উপর চড়ে সারারাত জার্নি করা। উপায় না পেয়ে তাই করলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে দেখলাম সেই বনাটে ৫ জনের জন্য টিকেট বিক্রি করা হয়েছে! রাত তখন ১২টার অধিক। আমরা কোন রকম সিদ্ধান্তহীনতায় না ভুগে টিকেট ফেরত দিলাম। বাসস্ট্যান্ডে আরো একজনকে পেলাম দুর্গাপুরের কাছাকাছি যাওয়ার যাত্রী। কিন্তু কোন বাসই নেই। ভাবলাম এখন শ্যামগঞ্জ পর্যন্ত যেতে পারলেও দরকার হলে ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাল সংবাদ শুনলাম আমরা। নেত্রকোনাগামী একটি স্পেশাল সার্ভিস প্রস্তুত!
আমাদের গন্তব্য এখন শ্যামগঞ্জ। সেখান থেকে সিএনজিযোগে দুর্গাপুর। রাত ১টায় আমাদের বাস ছাড়লো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি উপেক্ষা করে। সারারাস্তা এভাবেই চলতে থাকলো আর আমার মনে পড়লো ২০১২ এর কথা। ৮ বছর আগে ঠিক এমনই একটা সময় ছিলো আমাদের তবে রাত নয়, দিন। ভোর ৪.৩০টায় আমরা শ্যামগঞ্জ এসে নামলাম। কিন্তু অন্য কোন যাত্রী না থাকায় ৩০-৩৫ কি.মি রাস্তা সিএনজি ভাড়া ৬০০ টাকা চাইলো। অবশেষে একঘন্টা অপেক্ষা করে আমরা ৪০০ টাকায় দুর্গাপুর ঠিক করলাম। ২০১২ সালে এই রাস্তার অভিজ্ঞতা ভয়ংকর খারাপ ছিলো। বৃষ্টিতে ভগ্নদশা রাস্তা, নির্মানাধীন ব্রিজ এবং সবমিলিয়ে রাস্তার অভিজ্ঞতা ছিলো বাজে। তবে এবার পুরোপুরি ভিন্ন। পিচঢালা রাস্তা, সুন্দর ব্রিজ- এককথায় দারুণ!
আমরা বিরিশিরি বাজারে বিচিত্রা গেস্ট হাউজে উঠলাম। প্রথম দিন দুর্গাপুরের চিনামাটির পাহাড়, রানীখং মিশন, সোমেশ্বরীর রূপ, কমলা বাগান খ্যাত উচু টিলা( কোন কমলা বাগান নাই), বিজয়পুর আর্মি ক্যাম্প(ভেতরে প্রবেশ নিষেধ) ঘুরে পরেরদিন আমরা বেলা ১১টায় রওয়ানা হলাম লেঙ্গুরার উদ্দেশ্যে।
লেঙ্গুরা মূলত নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার একটি সীমান্তবর্তী জনপদ। পাহাড়ী নদী গণেশ্বরীর পাড়ে এ স্থানটি অবস্থিত। লেঙ্গুরায় মূলত কি আছে? আসলে লেঙ্গুরায় বান্দরবানের মত কিংবা রাঙ্গামাটির মত পাহাড় নেই। পাহাড় যা আছে তা ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়- যা আমরা গণেশ্বরী নদীর পাশে বসে দেখার সুযোগ পাই। যাদের কাছে গ্রামীন জনপদ, নদী, ধানক্ষেত মানেই সৌন্দর্যের পরিপূর্ণতা-তাদের কাছে এটি একটি অসাধারণ স্পট।
বিরিশিরি বাজার থেকে দুর্গাপুরের নাজিরপুর রোড মোড়ে যেতে চোখে পড়ে অনেকগুলো রেইনট্রি গাছ। বয়স ষাটোর্দ্ধ তা অনেকটা নিশ্চিত। যেমন করে আকাশ ছুঁতে চেয়েছে ওরা কিংবা যেমন করে দুদিকে নিজের শরীরখানাকে বাড়িয়েছে- তাতে বোঝাই যায় ও আমাদের স্বাধীনতার নির্বাক স্বাক্ষী! দুর্গাপুর থেকে বাইক এবং অটো এই দুটি পরিবহন লেঙ্গুরা যায়। আমাদের হাতে যেহেতু সময় অনেক, তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম অটোতেই সব দেখতে দেখতে যাবো। তবে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে রাস্তা ভয়ংকর খারাপ। বলা যায় এ যুগে এসে বিশালাকার কোন বড় পায়ের পাতাওয়ালা দৈত্য যদি আমাদের এই রাস্তাগুলোয় জোরে জোরে পা ফেলে তাহলে যেমন গর্ত হবে-ঠিক তেমনই গর্ত এখানে। দুএকটা জায়গায় একটু ভাল হলেও পুরো রাস্তাটাই এমন। আমরা এগিয়ে চলেছি লেঙ্গুরার দিকে। অটো নাজিরপুর হয়ে লেঙ্গুরা বাজারে গিয়ে নামাবে আমাদের। রাস্তার দুপাশে গাছের সারি, বৃষ্টিতে ভিজে আরো সবুজাভ রঙ ধারণ করেছে। নিচু জমিতে ধানক্ষেত, কোথাও কিছুটা জমে থাকা পানি, কিংবা কোথাও সরু খাল বয়ে গেছে। ঠিক তারপরে আবারও ধানক্ষেত, সবুজ রঙের ক্ষেত। এরপর কোথাও দু-একটা গাছ একলা দাঁড়িয়ে। অসহায়ের মত চারিদিকে তাকিয়ে আছে। কোথাও দু-চারটে বক উড়ে গেল আবার কোথাও ঘুঘু পাখির শব্দ।
আমাদের অটো এসে পৌছুলো লেঙ্গুরা বাজারে। সেখান থেকে অটোওয়ালা আমাদেরকে আরেকটু এগিয়ে দিলেন। কেননা এখান থেকে আমাদের আবার অটো নিয়ে সীমানার দিকে যেতে হবে। বৃষ্টি কখনও ঝিরিঝিরি আবার কখনও জোরেশোরে! যেন সে একচ্ছত্র আধিপত্য বিরাজ করছে আমাদের উপরে। দূরের পাহাড় আর ধানক্ষেত দেখতে দেখতে চায়ের চুমুক দিলাম। চায়ের সাথে কিছুটা দারুচিনি, এলাচ এবং শুকনো বেলের ঘ্রাণ। বৃষ্টি কমে এলে পরে আমরা আবার অটো নিয়ে সাত শহীদের কবরের দিকে রওয়ানা দিলাম। এটিই বাংলাদেশের শেষ সীমানা। ১৯৭১ সালে শহীদ হওয়া সাত শহীদের কবর এইখান। তবে সীমানায় যাওয়ার কিছুটা আগেই হাতের ডানে বড় কয়েকটা টিলা রয়েছে, এগুলো বাংলাদেশের। চাইলে সেখানে ওঠা যায়। যেখান থেকে ভারতীয় পাহাড়গুলোর সৌন্দর্য্য দেখা যায় আরো কিছুটা।
গণেশ্বরী নদীর পাড়ে আমাদের অটো এসে থামলো। এ এক বিচিত্র জনপদ। নৈসর্গিক সৌন্দর্য, নানা রঙের, বর্ণের, কিংবা নানা জাতের মানুষ এখানে। চলতে চলতে আমাদের দেখা হয় হাজং, গারো, হদি বিভিন্ন আদিবাসী মানুষের সঙ্গে। ঘন সবুজ অরণ্য আর নানা রঙের মানুষের মিলনস্থল এই লেঙ্গুরা আর তার গণেশ্বরী পাড়ের মানুষের জীবনধারা। শীতে পানি অনেকাংশ স্বচ্ছ থাকলেও বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি ঢলে পানির রঙ ঘোলাটে রূপ ধারণ করেছে এখানে। নদীর পাড়ে বসেই দেখা যায় ভারতীয় পাহাড়গুলোর উচ্চতা। অন্ধকারে কিছুটা কালচে সবুজ রঙ নিয়েছে পাহাড়গুলো। নানারকমের পাখির ডাক, নদীর বয়ে চলা, মাছ ধরার দৃশ্য, আরেকপাশে পাহাড় লাগোয় ধানক্ষেতের সবুজ রঙ দেখতে দেখতে এবং সীমানাহীন শীতল বাতাসের স্পর্শে দিনের আলো অনেকটা কমে আসে লেঙ্গুরার এই শান্ত, সুনিবিড় আর অপরূপ জনপদে।
আমরা ফেরার রাস্তা ধরি। অনেকটা পথ হেঁটে চলার প্রয়াস নিয়ে চলা শুরু করলেও সবটা আর পারা যায়নি। এই ভঙ্গুর রাস্তার কথা ভেবে আমাদের সওয়ার হতে হয় যন্ত্রদানবের উপরে।
কিভাবে যাবেনঃ লেঙ্গুরা যাওয়ার জন্য ঢাকার মহাখালী থেকে সরাসরি বাস আছে। মা-জননী পরিবহন, সুরমা এবং রাফিন রাহা। কিন্তু এখানে থাকার কোন জায়গা নেই। তাই ভাল হয় দুর্গাপুর কিংবা বিরিশিরির সকাল বেলা এসে নেমে তারপর হোটেল নিয়ে সারাদিন ঘুরে আবার এখানেই ফেরত আসা। ঢাকা থেকে দুর্গপুর যাওয়ার জন্য রয়েছে মা মনি পরিবহন, নিশিতিা এবং আরো দুএকটা বাস। রাত ১২.৩০টার মধ্যেই সর্বশেষ ট্রিপ হিসেবে ছেড়ে যায়। কোন কারনে কেউ দুর্গাপুরের বাস না পেলে নেত্রকোনা গামি কোন বাসে উঠে শ্যামগঞ্জ নেমে সেখান থেকে সিএনজিতে যেতে পারেন। সিএনজি ভাড়া জনপ্রতি ১২০ অথবা রিজার্ভ।
দুর্গাপুরের সরাসরি ট্রেন নেই। তাই যেতে হলে সকাল মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস এবং রাত ১০.১০এ হাওড় এক্সপ্রেস। দুটো ট্রেনই শ্যামগঞ্জ নামিয়ে দেবে। এছাড়া একটা কমিউটার ট্রেন আছে যেটা ঢাকা থেকে আনুমানিক ভোর ৪টায় ছাড়ে, যেটা আপনাকে দুর্গাপুরের কাছাকাছি জারিয়া নামিয়ে দেবে।
কোথায় থাকবেনঃ মোটামুটি ভাল আবাসিক হোটেল রয়েছে বিরিশিরি বাজারে। আমরা বিচিত্রা গেস্ট হাউজে ছিলাম। দুইজন ৫০০টাকা। এছাড়াও নদীবাংলা, স্বর্ণা গেস্ট হাউজ, মৌসুমী গেস্ট হাউজ রয়েছে। এরচেয়ে বেশি ভালমানের একটি হোটেল সোমেশ্বরী লাক্সারিয়াস রয়েছে দুর্গাপুর বাজারে।
কোথায় খাবেনঃ বিরিশিরি বাজারে তেমন ভাল হোটেল নেই খাবার। তবে দুর্গাপুর বাজারে মোটামুটি দামের মধ্যেই খাওয়া যায়।
প্রকৃতি এক অনন্য উপহার। আমরা সবাই মিলেই পারি প্রকৃতিকে সুন্দর রাখতে। যেখানেই যাই আমরা যেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণপ্রিয় বন্ধুটির কথা ভেবে কিংবা আমাদের অনাগত মানুষগুলোর কথা ভেবেও যেখানে সেখানে কোন অপচনশীল ময়লা-আবর্জনা ফেলে না যাই।