21/09/2018
আমি অকৃতি অধম বলেও তো কিছু
কম করে মোরে দাওনি
যা দিয়েছ, তারি অযোগ্য ভাবিয়া
কেড়েও তো কিছু নাওনি।।
তব আশীষ কুসুম ধরি নাই শিরে
পায়ে দলে গেছি , চাহি নাই ফিরে
তবু দয়া করে কেবলি দিয়েছ,
প্রতিদান কিছু চাওনি
...... আমার অসম্ভব প্রিয় এই প্রার্থনা সঙ্গীতকে আমি এতদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভেবে ভুল করে আসছিলাম। রজনীকান্ত সেনকে নিয়ে সামান্য কিছু পড়াশোনা করতে গিয়ে আশ্চর্য হলাম। এটা যে উনারই লেখা। দুই বাংলার সার্বজনীন পরিচিত পঞ্চকবির একজন রজনীকান্ত সেন। তাঁর জন্ম সিরাজগঞ্জে। সিরাজগঞ্জের বেলকুঁচি এলাকার সেনভাঙ্গা গ্রামে। উনার জন্মভিটার নাম-সাকিন যিনি আমাকে দিলেন তিনি ভাঙ্গা বাড়ির পাশের বাড়ির লোক। আমার সিনিয়র সহকর্মী। কলেজ জীবনে বহুবার ভাঙ্গাবাড়ির পুরনো দালানকোঠা ঘুরে বেড়িয়েছেন। এখনো নানান গল্প করেন, যেন এইতো সেদিন। আসলে এই তো সেদিন মানে প্রায় ১৮/২০ বছর।
গত মাসে আমাদের একসাথেই সিরাজগঞ্জ বেড়ানোর প্রোগ্রাম হয়ে গেল অফিস থেকেই। বায়না রাখতেই তিনি নিয়ে গেলেন কান্তকবি রজনীকান্ত সেনের জন্মভিটায়। আমি এসব দেখে দেখে অভ্যস্ত বলে চমকে উঠিনি কিন্তু তিনি থমকে গেলেন। বিল্ডিং তো দূরের কথা, কোন বসত বাড়িও অবশিষ্ট নেই। একটা জীর্ণ দেয়াল ছাড়া কবির স্মৃতি চিহ্নটুকুও যেন নেই আর।
সিরাজগঞ্জের বেলকুচি বাজার ষ্ট্যান্ড থেকে অটো বা রিকশায় বললেই ৫০/৬০ টাকা ভাড়ায় নামিয়ে দিবে সেনভাঙ্গা বাজার। আবার কড্ডা বেলকুচি সড়কের রজনীকান্ত রোড বাসষ্টান্ড থেকে একইভাবে ৩০/৪০ টাকায় যাওয়া যাবে। কবির নামেই নামকরণ এই ছোট্ট্ বাজারের। বাজারের পাশেই স্কুল মাঠের পাশেই একটা তোরণ, এখানে একটা ক্লাব ছিল, টিনের দোচালা। রজনী সংসদ ও পাঠাগার। উন্নয়নের লক্ষ্যে সেই পাঠাগার ভেঙ্গে তিনতলা ভবনের ফাউন্ডেশন এর কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ৩ বছরেরও বেশী। এরপর ওভাবেই পড়ে আছে।
সেনভাঙ্গা বাজারে পরিচিত একজনকে সঙ্গী করে আমরা ছোট্ট একটা খাল ব্রীজ পার হয়ে মিনিট পাঁচেক হেঁটে যাওয়ার পরই পঞ্চকবির অন্যতম এক কবি রজনীকান্ত সেন এর জন্মভিটার। ছেলেবেলায় ভাব সম্প্রসারণ মানেই কিন্তু রজনীকান্ত আবশ্যিক ছিল। কয়েক লাইন বললেই মনে পড়ে যাবে নিশ্চয়ই:
বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই- কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই; আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে, তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে। বাবুই হাসিয়া কহে- সন্দেহ কি তায়? কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়; পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা, নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা। অথবা, নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল, তরুগণ নাহি খায় নিজ নিজ ফল, গাভী কভু নাহি করে নিজ দুগ্ধ পান, কাষ্ঠ- দগ্ধ হয়ে, করে পরে অন্নদান, স্বর্ণ করে নিজরূপে অপরে শোভিত, বংশী করে নিজস্বরে অপরে মোহিত, শস্য জন্মাইয়া, নাহি খায় জলধরে, সাধুর ঐশ্বর্য শুধু পরহিত-তরে।
কিংবা আমরা নেহাৎ গরীব আমরা নেহাৎ ছোট ; তবু আজি সাত কোটি ভাই জেগে ওঠো। জুড়ে দে ঘরের তাঁত সাজা দোকান ; বিদেশে না যায় ভাই গোলারি ধান ; আমরা মোটা খাব, ভাই রে প'রবো মোটা ; মাখবো না ল্যাভেন্ডার, চাই নে 'অটো'। নিয়ে যায় মায়ের দুধ পরে দুয়ে' আমরা, রব কি উপোসী ঘরে শুয়ে ? হারাস্ নে ভাই রে, আর এমন সুদিন, মায়ের পায়ের কাছে এসে জোটো।
ভাঙ্গা বাড়ির গুরুপ্রসাদ ও মনোমোহন দেবীর সন্তান রজনীকান্ত। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, গীতিকার ও সঙ্গীতশিল্পী। ১৮৬৫ সালে ২৬ জুলাই তাঁর জন্ম। মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকেই কালীসঙ্গীত লিখে ও গেয়ে প্রতিভার প্রকাশ করেন। কান্তকবি নামে তার খ্যাতি ছিল সেসময়। ভক্তি ও দেশপ্রেম ছিল তার কবিতা ও গানের বিষয়বস্তু। স্বদেশী আন্দোলনে তিনি বিখ্যাত হলেন এই গানটি লিখে - মায়ের দেয়া মোটা কাপড়, মাথায় তুলে নে রে ভাই, দীন দুখিনী মা যে তোদের, তার বেশী আর সাধ্য নাই। ঐ মোটা সুতোর সঙ্গে মায়ের, অপার স্নেহ দেখতে পাই, আমরা এমনি পাষাণ, তাই ফেলে ঐ, পরের দোরে ভিক্ষে চাই। ঐ দু:খী মায়ের ঘরে তোদের, সবার প্রচুর অন্ন নাই, তবু তাই বেচে কাঁচ, সাবান, মোজা কিনে করলি ঘর বোঝাই। আয়রে আমরা মায়ের নামে এই প্রতিজ্ঞা করব ভাই, পরের জিনিস কিনব না, যদি-মায়ের ঘরের জিনিস পাই।
তাঁর রয়েছে অসাধারণ সব প্রার্থণা গীতি : আমি তো তোমারে চাহিনি জীবনে তুমি অভাগারে চেয়েছ; আমি না ডাকিতে, হৃদয় মাঝারে নিজে এসে দেখা দিয়েছ। চির-আদরের বিনিময়ে সখা! চির অবহেলা পেয়েছ, আমি দূরে ছুটে যেতে দুহাত পসারি ধরে টেনে কোলে নিয়েছ। ও পথে যেও না ফিরে এস বলে কানে কানে কত কয়েছ, আমি তবু চলে গেছি ফিরায়ে আনিতে পাছে পাছে ছুটে গিয়েছ। এই চির অপরাধী পাতকীয় বোঝা হাসি মুখে তুমি বয়েছ, আমার নিজ হাতে গড়া বিপদের মাঝে বুকে করে নিয়ে রয়েছ।
আবার লিখেছেন : আমায় সকল রকমে কাঙাল করেছে, গর্ব করিতে চুর ; যশঃ ও অর্থ, মান ও সাস্থ্য, সকলি করেছে দূর। ঐগুলো সব মায়াময় রূপে, ফেলেছিল মোরে অহমিকা-কূপে, তাই সব বাধা সরায়ে দয়াল, করেছে দীন আতুর ; আমায় সকল রকমে কাঙাল করিয়া, গর্ব করিছে চুর। আরেক কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের উৎসাহে প্রচুর হাস্যরসের গান লিখেন, একাধারে আবার লিখেন প্রীতিমূলক গান। ১৯১০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর রজনীকান্তসেন অসুস্থ্য অবস্থায় দেহত্যাগ করেন।
যা হোক, ফিরে যাই সেন ভাঙ্গা বাড়িতে। পুরো বাড়িটি দখলে চলে গিয়েছে। বাড়ির পশ্চিমে দুটো পুকুর। সেন ভাঙ্গা বাড়িতে পুরনো আর কোন বাড়ির চিহ্ন পর্যন্ত নেই। অনেক খুঁজে ফিরে কেবল একটা দেয়ালের ভগ্নাবশেষ পাওয়া গেল। তাও একেবাওে যাচ্ছেতাই অবস্থায়। তার খানিক পাশেই দুই পুকুরের মাঝামাঝিতে একটা ছোট স্থাপনা, সম্ভবত টয়লেট বা গোসলখানা ছিল হয়তো। ক্রমশ: ভঙ্গুর, কিছু অংশ ভেঙ্গে পানিতে পড়ে আছে। পঞ্চকবির অন্যতম একজন এই কবির স্মৃতি চিহ্ন বলতে এই। কবির জন্মভিটার কো-অরডিনেট – 24.310821, 89.678637
কিভাবে যাওয়া যায় লিখতে গিয়ে সংকোচ লাগছে, আমার মন বলছে লিখে দেই। হয়তো আমার মতো আরও কিছু বোকা মানুষ থাকতেও পারে যারা সেন ভাঙ্গা বাড়িতে যাবে এইটুকু স্মৃতি নিজের ঝুলিতে নেয়ার জন্য। ষ্টারলিট, দিনা বা এসআই পরিবহন ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ (বেলকুচি) পথে নিয়মিত সারাদিন সন্ধ্যা অব্দি চলাচল করে। মহাখালি থেকে আবদুল্লাপুর চন্দ্রা এবং কল্যাণপুর থেকে সাভার হয়ে যমুনা বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে এই গাড়িগুলোর নিয়মিত যাতায়াত।