13/01/2026
যেই রাস্তা ধরে মসজিদে নববীতে যাই, তার নাম সালাম রোড। নামের মতো রাস্তাটাও শান্তির। এদিক সেদিক বাঁক পেরিয়ে যখন একদম কাছাকাছি পৌঁছায় আমাদের যান্ত্রিক বাহন, তখন দূর থেকে এভাবে গম্বুজটা দেখা যায়।সবুজ গম্বুজ। উপমহাদেশের একজন কবি বলেছিলেন,
যখন সবুজ গম্বুজ প্রথম নজরে আসবে, তিনি দুনিয়াদারি সব ভুলে যাবেন।
নববীর চারপাশ এখন ভীষণ আলিশান। এই আভিজাত্য আমায় ভীষণ কষ্ট দেয়। মদিনাকে কেন এমন আলিশান হতে হবে! গত জুমাবার উমরাহ শেষে যখন মদিনায় ঢুকলাম, ট্যাক্সি নামিয়ে দিলো মসজিদে নববীর পেছনের দিকটাতে। কিবলার ঠিক অপজিট দিকে। মদিনায় নেমে যে মন-মনন প্রফুল্ল হওয়ার কথা, নিমিষেই কেমন যেন তা মিইয়ে গেল। আশেপাশে মেলার মতো নানান দোকানের আয়োজন। আলো ঝলমলে দোকানে ভরপুর। খাবারের দোকানগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। ম্যাকডোনাল্ড, স্টারবার্গের মতো প্রতিষ্ঠানরাও এখানে পসরা সাজিয়ে বসেছে।
এমন সাজানো অভিজাত মদিনা দেখে কেমনে যেন কষ্ট লাগে। উর্দু সাহিত্যের বিখ্যাত নাত, 'হাম মাদিনে মে তানহা নিকাল যায়ে গে' শুনতে শুনতে মদিনার অলিগলিতে হারিয়ে যাবার যে স্বপ্ন দেখতাম, সেই স্বপ্ন যেন ক্রমেই ম্লান লাগে। এই তো, মাত্র কটা বছর আগেও এতো অভিজাত ছিল না আশপাশ।
আভিজাত্যের বিরোধিতা করছি না। তবে আমার মন কেবল পুরোনো মদিনাকে খুঁজে ফিরে বেড়ায়। পাথুরে পাহাড় আর মরুভূমির শহর খুঁজি। খুঁজি খেজুরবীথির ছায়াঢাকা সবুজ মসজিদকে।
মনে ভাসে সেই দৃশ্য,
হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর কাছে গিয়ে করে দেখলেন,
নবী ﷺ একটি খেজুরপাতার চাটাইয়ের উপর শুয়ে আছেন, আর সেই চাটাইয়ের দাগ তাঁর পবিত্র পার্শ্বে স্পষ্ট হয়ে আছে। এই দৃশ্য দেখে উমর রা. অঝোরে কেঁদে ফেললেন।
তিনি বললেন—
“ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিসরা ও কায়সার (পারস্য ও রোমের সম্রাটরা) বিলাসে থাকে, আর আপনি,আল্লাহর প্রিয় রাসূল, এই রুক্ষ চাটাইয়ে?”
তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ শান্ত হাসি নিয়ে বললেন,
“হে উমর! তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তাদের জন্য দুনিয়া আর আমাদের জন্য আখিরাত?”
রাসূল ﷺ চাইলে দুনিয়ার সব আরাম পেতে পারতেন,
কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন যুহদ (সরলতা)। দুনিয়া পেলেই যে আখিরাত হারাতে হবে ব্যাপারটা এমন নয়। আবার দুনিয়াবি অর্জনকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে বিষয়টা এমনও নয়।কিন্তু আমাকে অন্তত মদিনায় নববীর ধারে এমন উপচে পড়া দুনিয়াদারী ভীষণ পীড়া দেয়।
চারিপাশে আকাশচুম্বী আলিশান সরাইখানার দালানে ভরপুর। উপরে তাকালে আকাশটাও দেখা যায়না কখনো কখনো। কিবলার অপজিট সাইডের দিকটাতে দোকানভর্তি ভিড় আর উদযাপন! মনেই হয় না আধ্যাত্মিক কোনো জায়গা এটা।
আমার মন কেবল পুরোনো মদিনাকে খুঁজে ফিরে বেড়ায়। পাথুরে পাহাড়ে ঘেরা মরুভূমির সেই শহরটাকে খুঁজি। খুঁজি খেজুরবীথির ছায়াঢাকা সবুজ মসজিদকে।
অভিজাত সরাইখানায় ভর্তি অলিগলির চাইতে আমার কেন ভালো লাগে নববীর ভেতরের সেই ছোট্ট সমতটটা। যান্ত্রিক ছাতার নিচে সেখানে বসে একসাথে আকাশ আর সবুজ গম্বুজ দেখা যায়। যেখানে বেরিকেডের ফাঁকা দিয়ে দেখা যায় রিয়াদুল জান্নাহ, একটু দূরে রওজাতুর রাসুল।
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম!
আবেগে আমি বারেবারে আপ্লুত হই। আর ব্যথিত হই বিরহের বিষাদে। চোখে জমে আনন্দ আর বেদনার অদ্ভুত মিশ্র জল। এ যেন তিব্বত ধুয়ে নেমে আসা সিন্ধু, যে নদী হৃদয়ের কাশ্মীর ছুঁয়ে আরব সাগরে তুমুল স্রোতে আছড়ে পড়ে।
আমি ভাবি,মসজিদে নববীর ভেতরে আছি, কিন্তু রাসুলুল্লাহ ﷺ নেই। তিনি নেই এখন নববীর মিহরাবের ধারে। তিনি বসে নেই রিয়াজুল জান্নাহর খেজুর গাছের খুটির কাছে!
এখন মন চাইলেই একটু তাঁর কাছে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরার আকুতি করার সুযোগ নেই আমার । মন বিষাদের গল্পগুলো বলে হৃদয়ের বিষাদের হিমালয় গলিয়ে দেয়ার সুযোগ নেই আর। সুযোগ নেই একটু জিজ্ঞেস করার, হে রাসুলুল্লাহ! কিভাবে এই ভীষণ পাপিষ্ঠ যাপিত জীবন থেকে বের হয়ে একটা সবুজ জীবন পাবো! তিনি নেই! তিনি নেই! তিনি নেই! যদিও হৃদয়ে আছেন।
আলী ইবনে আবী তালিব রা. রাসুলের ভালোবাসায় ছন্দমালা লিখেছিলেন, আমি সেটার বাঙলায়নের চেষ্টা করি।
"তুমি নেই নবি এ কথা যখন আমার মননে জাগে,
ঝরে পড়ে যায় বেদনায় ফুল হৃদয়ের গুলবাগে।"
আসলেই তো! রাসুলুল্লাহর ﷺ অনুপস্থিতে হৃদয়ের গুলবাগে কি করে ফুল ফুটতে পারে!
রাসুলুল্লাহ ﷺ- কে নিয়ে নিজের লেখা বা অনুবাদ করা কবিতাগুলো কখনোই প্রসেডির মানদন্ডে উত্তীর্ণ মনেহয়নি নিজের কাছে। তবুও হারামের সবুজ কার্পেটে বসে মাঝেমাঝে বির বির করে সেই কবিতা পাঠ করি আমি। আবৃত্তিতে বুক কাঁপে, কন্ঠস্বর কাঁপে। কখনো কখনো কণ্ঠ আটকে যায় কণ্ঠনালীতে। প্রসেডির বিচারে উত্তীর্ণ না হতে পারি, আবেগটুকু তো খাঁটি!
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই আবৃত্তি, এই দরুদ, এই সালাম ফেরেশতা মারফত রাসুলের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। একজন অপরিচিত আজনবি বাঙাল তরুণের আবেগের তরজমা পৌঁছে যাচ্ছে রাসুলের কাছে! এর চেয়ে সৌভাগ্যের কিইবা হতে পারে আর!
জোবায়ের বিন বায়েজীদ
১৩-০১-২৬