30/04/2026
যারা এ বছর হজ্জ্বে আসতেছেন , তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ টিপস!
১. হ্যান্ড লাগেজ: মক্কা মদীনায় পৌঁছে প্রথম দুই তিন দিন চলতে যা যা লাগবে, সেগুলো আপনার হ্যান্ড লাগেজে রাখুন। সবকিছু ক্যারিয়ারে দিয়ে দিবেন না। কেননা, হাজী ক্যাম্প থেকেই আপনার বড় লাগেজটা আপনার কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হবে৷ লাগেজ লাগেজের মতো আপনার তথ্য অনুযায়ী হোটেলে পৌঁছে যাবে৷ কখনো পৌঁছতে একদিন লাগতে পারে৷ কখনো দুই দিন লাগতে পারে। আবার অনেক সময় ভুলে একজনের লাগেজ অন্য হোটেলে চলে যায়। তখন সেই লাগেজ পেতে ৭/১০ দিনও লাগে। আপনার লাগেজ যদি ভুলে অন্য হোটেলে চলে যায় আর সেই হোটেলে দায়িত্ববান মানুষ না থাকে, তাহলে আপনার লাগেজ পেতে পুরো হজ্জ্বের সফরও শেষ হয়ে যেতে পারে। এমন পেরেশানিতে আল্লাহ কাউকে না ফেলেন।
অতএব, বি কেয়ারফুল! আপনার অতি জরুরী জিনিসগুলো হ্যান্ড লাগেজে অবশ্যই নিন। সেটাই বিমানে আপনার সঙ্গে থাকবে।
২. গলায় বা কাঁধে ঝুলানো ছোট্ট ব্যাগ: ছোট্ট একটা ব্যাগ মেইনটেইন করুন। পাসপোর্ট তাতে রাখবেন। সৌদিতে বিমান বন্দর থেকে নেমে হ্যান্ড লাগেজও গাড়ির বক্সে চলে যাবে। কিন্তু পাসপোর্ট সঙ্গে রাখতেই হবে৷
৩. বাংলাদেশ গভঃ প্রদত্ত আইডি কার্ড: নিশ্চিত হোন, বাংলাদেশ গভঃমেন্ট প্রদত্ত আইডি কার্ড পেয়েছেন কি না। হাজি ক্যাম্পে প্রবেশ করতে এটা লাগবে। সৌদি পৌঁছে নুসুক কার্ড পেতেও এটা লাগবে৷।
৪. দেশ থেকেই লিখিত আকারে জেনে নিন, মক্কা ও মদীনায় আপনার হোটেলের নাম কি এবং সেটা কোথায় অবস্থিত৷ কেননা আপনার গ্রুপের সবাই সৌদি অবতরণ করে এক বাসে উঠতে পারবেন না। বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন বাসে তুলে দেওয়া হবে। তখন আপনার প্রদর্শিত হোটেলের নাম অনুযায়ী (ইংলিশে/আরবিতে) আপনাকে আপনার হোটেলে পৌঁছানো হবে।
৫. নুসুক কার্ড: হোটেলে পৌঁছার পর কিংবা পৌঁছার আগেই বাসে সৌদির মূল এজেন্সি আপনাকে একটি নুসুক কার্ড দিবে এবং আপনার পাসপোর্ট জমা নিয়ে নিবে। আতঙ্কিত হবেন না। সফর শেষে তারাই আপনাকে আবার আপনার পাসপোর্ট ফেরত দিবে। নুসুক কার্ডটি যত্ন করে রাখুন। আর এটাও নিশ্চিত হোন যে, আপনি নুসুক কার্ড পেয়েছেন।
অনেক সময় এরা আগে পাসপোর্ট জমা নেয়, তারপর নুসুক কার্ড দেয়। এমন যেন না হয়, তারা আপনার পাসপোর্ট নিয়েছে কিন্তু কার্ড দেয়নি৷ কার্ড না পেলে পাসপোর্ট বুঝে নিন। হতে পারে, আপনি এমন এক গ্রুপের সাথে আছেন, যাদেরকে কার্ড প্রদান করা হচ্ছে কিন্তু আপনার কার্ড সেখানে নেই। অথচ তাদের সাথে আপনিও পাসপোর্ট জমা দিয়ে দিয়েছেন।
৬. বিমান থেকে নামার আগে: যদি ইমার্জেন্সি ওয়াশরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে বিমানেই প্রয়োজন সেরে নিন। কেননা নামার পর এয়ারপোর্টে তারা আপনাকে ইস্তিকবাল করবে, সালাম দিবে, ফুলও দিতে পারে। কিন্তু এক মিনিট কোথাও দাঁড়াতে দিবে না।
৭. বিমান থেকে নামার সময়: বিমান থেকে নামার পর এয়ারপোর্টের প্রবেশপথ পর্যন্ত তারা আপনাকে বাসে পৌঁছে দিবে। নামার সময় গ্রুপের সবাই এক সাথে থাকুন, এক সাথে নামুন এবং একই বাসে একসাথে ওঠা৷ যদি বিমান থেকে বিচ্ছিন্নভাবে নামেন, তাহলে আর হোটেলে পৌঁছার আগ পর্যন্ত একসাথে হতে পারবেন না। যে আগে থাকবে, তাকে আগের বাসে তুলে দেওয়া হবে। যে পরে থাকবে তাকে পরবর্তি বাসে তুলে দেওয়া হবে।
৮. এয়ারপোর্টে পৌঁছে: বাস থেকে নামার পর সবাইকে এক কিউ/লাইনে দাঁড় করানো হয়। অতঃপর সিরিয়াল অনুযায়ী পঞ্চাশ জন করে একেকটা বাসে তুলে দেওয়া হয়। অতএব সিরিয়ালে এক সাথে থাকুন, যেন এক বাসে উঠতে পারেন। এক বাসে একাধিক বাসের যাত্রী থাকে। বাস সর্বপ্রথম সেই হোটেলে যাবে, যেই হোটেলের যাত্রী বেশী।
৯. পরিবার ও মাহরাম: কোনো অবস্থাতেই বিমানবন্দরের কিউতে বা লাইনে মাহরাম বা পরিবারের সদস্যরা আলাদা হবেন না। যদি আপনার পর লাইন বন্ধ হয়ে যায় আর আপনার পরিবারের সদস্যরা আপনার সাথে একই বাসে উঠতে না পারে, তবে জোর করে হলেও আপনি ফিরে আসুন। বলুন, আমার ফ্যামিলি পিছনে আছে, আমরা একই বাসে উঠব।
১০. বাসে ওঠার সময়/পরে: হ্যান্ড লাগেজ বাসের বক্সে দিন আর পাসপোর্ট সাথে রাখুন। জায়গায় জায়গায় পাসপোর্ট চেক করা হবে, যতক্ষণ না নুসুক কার্ড পাচ্ছেন। নুসুক কার্ড দিয়ে তারা পাসপোর্ট জমা নিয়ে নিবে। হারামে নামাজের জন্য প্রবেশ করতে হলেও কিন্তু নুসুক কার্ড দেখাতে হয়! নুসুক কার্ড যদি হারিয়ে যায়, দেখবেন পেরেশানি কাকে বলে! আল্লাহ না করুন৷ (নুসুক কার্ডের একটা সফট কপি নুসুক এপ ইন্সটল করে পাসপোর্ট দিয়ে লগ-ইন করে ডাউনলোড করে রাখুন। বিশেষ কোনো মূহুর্তে কাজে লাগলে লাগতেও পারে!)
১১. হোটেলের নাম ও গুগল লোকেশন: অবশ্যই ইংলিশে কোনো একটি কার্ডে বা কাগজে হোটেলের নাম লিখে রাখুন। সবচেয়ে ভালো হয় যদি প্রয়োজনে আপনি মোবাইলে গুগল লোকেশন শো করতে পারেন।
১২. সিম রৌমিং: দেশ থেকে সিম রোমিং করে গেলে ভালো হয়। তাহলে হোয়াটসআপেও দেশে কথা বলতে পারবেন (সৌদি সিম দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলা যায় না); আর এয়ারপোর্টের পর রাস্তায় কোনো সমস্যা হলে আপনার এজন্সির লোকদের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল পর্যন্ত এজেন্সির লোক আপনার বাসে উঠতে পারবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
১৩. দেশ থেকে ছোট্ট ব্যাগে তায়াম্মুমের মাটি নিতে ভুলবেন না। বিমানে তায়াম্মুম করতে হবে।
১৪. বিমানে নামাজ/সালাত: ওয়াক্ত তো আছেই। বিমানবন্দর নেমে নামাজ পড়ব৷ ভুলেও এমন চিন্তা করবেন না। বিমান থেকে নেমে মক্কা পর্যন্ত কোথাও নামাজের সুযোগ পাবেন না৷
১৫. প্রাণ বর্জন: শাহ জালাল এয়ারপোর্টে একাধিক কম্পানি আপনাকে হালকা নাস্তা দিতে পারে৷ অবশ্যই প্রাণের গিফট বর্জন করুন। নবিজির শহরে যাচ্ছেন, নবিজির শত্রুদের সাথে আপোষ করবেন না।
১৬. এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল পৌঁছার সময়: সাধারণ সময়ে এয়ারপোর্ট থেকে মক্কা পৌঁছতে সময় লাগে সর্বোচ্চ দুই ঘন্টা। এখন সাত ঘন্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। পথে পথে তাফতীশ (চেক) হবে। মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকুন।
কয়েকটি বাস্তব দৃষ্টান্ত:
১. আমাদের বাসে উঠেছিল এক দম্পতি। বেচারারা জানে না, তাদের হোটেল কোথায়। তাদের এজেন্সির মালিককে ফোনে ফেলাম না। তাদের গাইড অন্য বাসে৷ তাকেও রিচ করতে পারলাম না। কারণ সে রৌমিং করে আসেনি। সঙ্গে থাকা ব্যাগের গায়ে তাদের এজেন্সির সৌদি এক প্রতিনিধির নাম্বার পেলাম। সেখানে যোগাযোগ করে কোনো রকম হোটেলের নাম উদ্ধার করলাম৷ ততক্ষণে তাদের চোখ মুখ লাল হয়ে শেষ। তারা আমাকে বারবার অনুরোধ করছিল, আমি যেন তাদেরকে তাদের হোটেল পর্যন্ত পৌঁছে দিই। কিন্তু তাদেরকে বাসের ড্রাইভারের কাছে হাওলা করা ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না। যদি সৌদি প্রতিনিধির নাম্বারও না পেতাম, তাহলে ড্রাইভার তাকে কোথায় নামায় দিত বলেন!
২. আমাদের একজন আন্টির লাগেজ তিন দিনেও আসেনি। আবার আমার রুমের সামনে অন্য হোটেলের এক লোকের একটা লাগেজ এসে পড়ে আছে। ওই লাগেজের মালিকের মূল এজেন্সি ও আমাদের এজেন্সি পর্যন্ত আলাদা। ওই ব্যক্তি কবে সে লাগেজ পাবে আর কবে আমাদের আন্টি লাগেজ ফিরে পাবেন, আল্লাহ ভালো জানেন।
৩. বাসে সৌদির মূল এজন্সির একজন প্রতিনিধি আমাদের সবার পাসপোর্ট নিয়ে নিল। উদ্দেশ্য নুসুক কার্ড দেওয়া। আমাদের সাথে এক ব্যমতি ছিল। বেচারা কোনোভাবেই তার পাসপোর্ট জমা দিবে না৷ কারণ তার একটাই চিন্তা! পাসপোর্ট নিয়ে নিলে সে দেশে ফিরবে কীভাবে! মূল সমস্যা হচ্ছে তার এজেন্সি দেশে থাকতে তাকে এ ব্যাপারে তথ্য দেয়নি কিংবা সে গ্রহণ করেনি।
হজ্জ্বের সফর কষ্ট ও অনিশ্চিত যাত্রার নাম। অত্যন্ত সবর প্রয়োজন। ভাষা সংযত রাখা প্রয়োজন। এজেন্সি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এজেন্সির লোক আন্তরিক, যোগ্য ও সৎ না হলে জীবন ত্যানা ত্যানা! এখানে অনেকের সাফারিং দেখছি তো! অথচ আল্লাহ আমাদেরকে কত ভালো রেখেছেন! আলহামদুলিল্লাহ।
আল্লাহ আমাদের হজ্জকে মাবরুর, সাঈকে মাশকুর, যাম্বকে মাগফুর করুন। আল্লাহুম্মা আমীন।
কষ্ট করে আমার লিখতে হয় নাই।
Hafiz Al Munadi copy