26/05/2026
بسم الله الرحمن الرحيم
যিলহজ্ব মাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল হলো তাকবীরে তাশরীক। ফিকহের কিতাবসমূহে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে।
এটি কখন পড়তে হয়?
আইয়ামে তাশরীকের সময়ে পড়তে হয়। যিলহজ্ব মাসের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখকে ফিকহী পরিভাষায় ‘আইয়ামে তাশরীক’ বলা হয়। এই দিনগুলোর অন্যতম প্রধান আমল হলো আল্লাহর যিকির ও তাকবীর পাঠ।
৯ই যিলহজ্ব ফজরের নামায থেকে শুরু করে ১৩ই যিলহজ্ব আসরের নামায পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্তের ফরজ নামাযের পর একবার করে এই তাকবীর বলা ওয়াজিব।
কারা পড়বে?
ফরয নামায আদায়কারী প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব; চাই সে জামাতে নামায আদায় করুক (মুক্তাদী বা মাসবুক) কিংবা একাকী, মুকিম হোক বা মুসাফির, নারী হোক বা পুরুষ, গ্রামবাসী হোক কিংবা শহরবাসী।
এমনকি এই দিনগুলোতে কোনো নামায কাজা হয়ে গেলে এবং তা এই সময়ের মধ্যেই (৯ই যিলহজ্ব ফজরের নামায থেকে শুরু করে ১৩ই যিলহজ্ব আসর পর্যন্ত) আদায় করা হলে, সেই নামাযের পরও তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব।
নোট: পুরুষদের জন্য তাকবীর উচ্চ স্বরে বলা ওয়াজিব। নারীদের জন্য উচ্চ স্বরে বলা ওয়াজিব নয়। তাই তারা নিম্ন স্বরেই বলবে।
তাকবীরে তাশরীক:
اللّٰهُ أَكْبَرُ اللّٰهُ أَكْبَرُ، لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ، وَاللّٰهُ أَكْبَرُ اللّٰهُ أَكْبَرُ، وَلِلّٰهِ الْحَمْدُ
"আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হাম্দ।"
নোট: এই তাকবীরের প্রতিটি শব্দে আল্লাহর তাওহীদ, বড়ত্ব ও প্রশংসা নিহিত রয়েছে।
কয়বার পড়বে?
তাকবীরে তাশরীক একবার বলা ওয়াজিব।
সাহাবায়ে কেরামের পক্ষ থেকে কোথাও একাধিকবার তাকবীর বলার কথা উল্লেখ নেই।
মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস: ৫৬৯৮, ৫৬৯৯, আল আওসাত, হাদীস: ২১৯৮, ২২০০
অনেকে তিনবার পড়াকে মুস্তাহাব বলে থাকেন। ও সমাজে কিছু মানুষ এনিয়ে খুব বাড়াবাড়িও করে থাকেন। তিনবার পড়া মুস্তাহাব-একথা বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী সঠিক নয়। অবশ্য এ নিয়ে ফিকহবিদগণের মাঝে মতানৈক্য আছে। তাই এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়।
হাদীস ও সাহাবায়ে কেরামের আমল:
তাবেঈ ইব্রাহীম নাখাঈ রাহ. বলেন: সাহাবায়ে কেরাম আরাফার দিন নামাযের পর তাকবীর বলতেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস: ৫৬৯৬)
কিন্তু পূর্ণ তাকবীরে তাশরীক তিনবার পড়ার ব্যাপারে কোন সহীহ ও প্রসিদ্ধ বর্ণনা পাওয়া যায় না। অধিকাংশ ফিকহবিদগণও তিনবার বলার প্রতি গুরুত্ব দেন না।
অবশ্য কেউ যদি সুন্নত মনে না করে এমনিতেই তিনবার বলে তবে সেটাকে বিদআত বলাও উচিত নয়।
কিছু সাহাবী থেকে তাকবীরে তাশরীকের সাথে অন্য কিছু যুক্ত করে পড়ার বর্ণনাও পাওয়া যায়। যেমন, হযরত ইবনে উমর রা. তাকবীরে তাশরীকের আগে তিনবার "আল্লাহু আকবার" বলতেন (আল আওসাত, হাদীস: ২২০১)।
আল আওসাত, হাদীস : ২১৯৮, মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৫৬৯৮, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৫২, ১/১৫৩
আদ্দুররুল মুখতার: ২/১৭৭, আল বাহরুর রায়েক: ২/১৬৫, রদ্দুল মুহতার: ২/১৭৮, মাজমাউল আনহুর: ১/২৬০, তাহতাবী আলাল মারাকী: পৃষ্ঠা ২৯৪, ইমদাদুল ফাতাওয়া: ১/৪৮৪
তাকবীরে তাশরীক সংক্রান্ত মাসায়েল
১. মাসবুকের জন্য বাকি নামায আদায়ের পর তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। (মাজমাউল আনহুর ১/২৬০)
২. ফরয নামায আদায় করার পর তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। নামাযের পর তাকবীরে তাশরীক না বললে
(ক) মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলে
(খ) অথবা নামায ফাসেদকারী কোনো কথা বা কাজ করলে
(গ) অথবা অযু নষ্ট হয়ে যায় এমন কোনো কাজ করলে তাকবীরে তাশরীক আদায়ের সময় বাকি থাকে না। তাই এক্ষেত্রে ওয়াজিব ছেড়ে দেওয়ার জন্য তওবা-ইস্তিগফার করতে হবে। আর নামাযের পর উপরোল্লিখিত কোনো কাজ না করলে বিলম্বে হলেও তাকবীরে তাশরীক পড়ে নিতে পারবে এবং এর দ্বারা ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। (আলমাবসূত, সারাখসী ২/৪৫ ফাতহুল কাদীর ২/৫০)
৩. তাকবীরে তাশরীক নির্ধারিত সময়ের আমল। তাই তাশরীকের দিনগুলোর কাযা নামায এই সময়ের পরে আদায় করলে তাকবীরে তাশরীক পড়তে হবে না। তবে এ সময়ের ছুটে যাওয়া নামায যদি এ দিনগুলোতেই কাযা করা হয় তাহলে সেক্ষেত্রে তাকবীরে তাশরীক পড়তে হবে। আর অন্য কোনো দিনের কাযা নামায তাশরীকের দিনগুলোতে আদায় করলে তাকবীরে তাশরীক পড়তে হবে না। (রদ্দুল মুহতার ২/১৭৯,ফাতহুল কাদীর ২/৫৮)
নোট: উল্লেখ্য, উক্ত ৫দিন কোন নারী যদি এ সময় হায়েয বা নেফাস অবস্থায় থাকে, তাহলে তার ওপর তাকবীরে তাশরীক পড়া ওয়াজিব নয়। যেহেতু সে এ সময় নামায আদায় করা থেকে বিরত থাকে। আর তাকবীরে তাশরীকটা মূলত নামাযের সাথে সম্পৃক্ত।
সুতরাং নামায যেহেতু আবশ্যক থাকে না, তাই নামায পরবর্তী তাকবীরে তাশরীক পড়াও তার ওপর আবশ্যক হবে না। আলবাহরুর রায়েক ২/১৬৫; হাশিয়াতুত তহতাবী আলাল মারাকী ২৯৪
তবে হায়েয বা নেফাস অবস্থায় নিজের প্রতিরক্ষার জন্য দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সময় এবং ঘুমানোর পূর্বে সুরাতুল ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক, সূরা নাস আমল হিসেবে পড়া যায়। তিলাওয়াত হিসেবে নয়। এছাড়া হাদীস শরীফে শেখানো দুআ, যিকির-আযকার করতে কোন অসুবিধা নেই। তাই এ সময়ও নারীরা তাকবীরে তাশরীক পাঠ করতে পারবেন।
৪- ঈদের জামাতের পর তাকবীরে তাশরীক পড়া জায়েয। ওয়াজিব নয়। (ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ২/১০৪)
৫- দুই ঈদের খুতবার শুরুতে বেশি বেশি তাকবীর পড়ার কথা বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। যেমন উবায়দুল্লাহ বিন আবদুল্লাহ রাহ. বলেন-ঈদের দিন মিম্বরে (ইমামের) তাকবীর পাঠ করা সুন্নত। প্রথম খুতবার শুরুতে নয় বার ও দ্বিতীয় খুতবার শুরুতে সাত বার তাকবীর বলবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ৫৬৭৪, ৫৬৭২, ৫৬৭৩)
৬- খুতবার মধ্যে ইমাম সাহেব তাকবীরে তাশরীক পাঠ করলে বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম উচ্চারণ করলে মুখে উচ্চারণ করে তাকবীর ও দরূদ শরীফ পড়া যাবে না। তবে মনে মনে পড়তে পারবে। উল্লেখ্য যে, জুমার খুতবার ন্যায় ঈদের খুতবাও চুপ থেকে মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করা ওয়াজিব। (ফাতহুল কাদীর ২/৩৮; মাজমাউল আনহুর ১/২৫৩; রদ্দুল মুহতার ২/১৫৯)
৭- সুন্নত, নফল, বিতর নামাযের পর তাকবীর ওয়াজিব নয়। (বাদায়েউস সানায়ে ১/৪৬২; মাবসূত সারাখসী ২/৪৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৫২)