02/09/2025
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে, বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে, প্রাচীন গৌরব আর নির্মল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে বাগেরহাট জেলায়। খুলনা বিভাগের এই ঐশ্বর্যমণ্ডিত জেলা শুধু ভৌগোলিক বৈচিত্র্যই নয়, তার হৃদয়ে ধারণ করে আছে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নিদর্শনসমূহ, সুফী সাধকের আধ্যাত্মিক স্মৃতিচিহ্ন এবং সবুজে ঘেরা ম্যানগ্রোভ বনের রোমাঞ্চ।
'বাগেরহাট' নামটির উৎপত্তি নিয়ে নানা মত প্রচলিত। কেউ বলেন, সুন্দরবনের নৈকট্যে বাঘের উপদ্রব ছিল বলে 'বাঘেরহাট' নাম থেকে বিবর্তিত হয়েছে আজকের বাগেরহাট। অন্য মতে, সুফী সাধক খান জাহান আলী (রহ.) প্রতিষ্ঠিত 'খলিফাত-ই-আবাদ'-এর বিখ্যাত বাগিচা (বাগ) থেকে 'বাগের আবাদ' হয়ে 'বাগেরহাট' নামের সৃষ্টি। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ধারণা অনুযায়ী, ভৈরব নদের একটি বাঁকের তীরে গড়ে ওঠা 'বাঁকেরহাট' কালক্রমে রূপান্তরিত হয়েছে বাগেরহাটে।
বাগেরহাট জেলার উত্তরে গোপালগঞ্জ ও নড়াইল, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে পিরোজপুর ও বরগুনা এবং পশ্চিমে খুলনা জেলা অবস্থিত। আয়তন ৩,৯৫৯.১১ বর্গকিলোমিটার; যার মধ্যে ১,৮৩৪.৭৪ বর্গকিমি বনাঞ্চল। ১৮৬৩ সালে যশোর জেলার অন্তর্গত মহকুমা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৮২ সালে খুলনা জেলার অংশে পরিণত হয় এবং অবশেষে ১৯৮৪ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা লাভ করে। বর্তমানে ৯টি উপজেলা, ৭৫টি ইউনিয়ন ও ৩টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত একটি 'এ' শ্রেণীর জেলা। জেলা সদর ভৈরব নদের পশ্চিম তীরে অবস্থিত।
এবার জেনে নেওয়া যাক বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে -
১. বিশ্ব ঐতিহ্য ষাট গম্বুজ মসজিদ:
খান জাহান আলী (রহ.)-এর শ্রেষ্ঠ কীর্তি, এই মসজিদটি শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র বিশ্বের ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। ইউনেস্কো ১৯৮৫ সালে পুরো বাগেরহাট শহরকে (খলিফাতাবাদ) বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়, যার কেন্দ্রবিন্দু এই ষাট গম্বুজ মসজিদ। যদিও নির্মাণকাল ও প্রতিষ্ঠাতা নিয়ে শিলালিপির অভাবে কিছুটা অনিশ্চয়তা আছে, স্থাপত্য শৈলী থেকে ধারণা করা হয় ১৫শ শতাব্দীতে খান জাহান আলী (রহ.) এটি নির্মাণ করান। রাজমহল থেকে আনা পাথরে নির্মিত এই বিশাল আয়তনের মসজিদ (বাইরে ১৬০x১০৪ ফুট, ভিতরে ১৪৩x৮৮ ফুট) তার ৬০টি সুদৃশ্য পাথরের স্তম্ভ, ৮১টি গম্বুজ (মিনারের গম্বুজসহ), ১১টি পূর্ব দরজা, কারুকার্যখচিত মিহরাব এবং চার কোণের মিনার দিয়ে স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন হয়ে আছে। মসজিদের সামনের দুটি মিনার রওশন কোঠা ও আন্ধার কোঠা নামে পরিচিত।
২. খান জাহান আলীর মাজার:
খাঞ্জেলী দীঘির উত্তর পাড়ে অবস্থিত এই সমাধিসৌধ বর্গাকারে নির্মিত, যার ছাদে একটি গম্বুজ রয়েছে। স্থাপত্যে ষাটগম্বুজ মসজিদের ছোঁয়া লক্ষণীয়। বেদিতে রাখা পাথরে তার মাজার। প্রতি বছর ২৫ অগ্রহায়ণ ওরশ ও চৈত্রের পূর্ণিমায় বিশাল মেলা বসে, যা হাজারো ভক্তকে আকর্ষণ করে। দীঘিতে ছাড়া কুমির কালাপাহাড়ের মমি এখন ষাটগম্বুজ মসজিদের জাদুঘরে সংরক্ষিত।
৩. বিবি বেগনী মসজিদ:
ষাটগম্বুজ থেকে ৮০০ মিটার পশ্চিমে, ঘোড়া দীঘির পাড়ে অবস্থিত। পঞ্চদশ শতকে খান জাহান আলী (রহ.) বা তার কাছের কেউ এটি নির্মাণ করেন। নামকরণ হয় সম্ভবত বিবি বেগনী নামক এক নারীর নামে। বর্গাকার মসজিদটির চার কোণে চারটি মিনার ও উপরিভাগে একটি বৃহৎ গম্বুজ রয়েছে। সিঙ্গাইর মসজিদের সাথে স্থাপত্য সাদৃশ্য আছে।
৪. চুনাখোলা মসজিদ:
জেলা থেকে ৩৫ কিমি দূরে, ষাটগম্বুজ ইউনিয়নে অবস্থিত। ধারণা করা হয় খান জাহান আলী (রহ.)-এর এক অনুগত কর্মচারী পঞ্চদশ শতাব্দীতে এটি নির্মাণ করেন। চুন উৎপাদনের কেন্দ্র থাকায় নাম চুনাখোলা। পোড়ামাটির অলঙ্করণে ভরপুর এই বর্গাকার মসজিদের চার কোণে ৪টি মিনার ও ৫টি প্রবেশদ্বার আছে। ১৯৭৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব হিসেবে স্বীকৃত এবং ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।
৫. রণবিজয়পুর মসজিদ:
ষাটগম্বুজ থেকে প্রায় ১.৫ কিমি পূর্বে। বাংলাদেশের এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদগুলোর মধ্যে বৃহত্তম। স্থানীয় নাম দরিয়া খাঁর মসজিদ। ধারণা করা হয় ১৪৫৯ সালে খান জাহান আলী (রহ.)-এর সহচর দরিয়া খাঁ নির্মাণ করেন। পুরু দেয়াল, চার কোণের মিনার, তিনটি মিহরাব ও পোড়ামাটির অলংকরণ এর বৈশিষ্ট্য। ১৯৬১ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষিত হয়।
৬. সিঙ্গাইর মসজিদ:
খুলনা-বরিশাল মহাসড়কের সংলগ্ন সুন্দরঘোনা গ্রামে, ষাটগম্বুজ থেকে মাত্র ২৫ মিটার দূরে অবস্থিত। পঞ্চদশ শতকে খান জাহান আলী (রহ.) কর্তৃক নির্মিত এক গম্বুজ বিশিষ্ট বর্গাকার মসজিদ। বক্রাকার কার্নিশ, চার কোণের বুরুজ, পাঁচটি খিলানযুক্ত দরজা ও সুসজ্জিত মিহরাব এর বিশেষত্ব।
৭. নয় গম্বুজ মসজিদ:
ঠাকুর দীঘির পশ্চিম পাড়ে ও খানজাহান আলী (রহ.)-এর সমাধির দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। পঞ্চদশ শতকে নির্মিত বর্গাকার মসজিদ (প্রতিটি দেয়াল ১৫.২৪ মিটার)। ছাদে নয়টি গম্বুজ ও ভিতরে চারটি স্তম্ভ রয়েছে। তিন দিকে প্রবেশপথ ও পশ্চিম দিকে তিনটি সুদৃশ্য মিহরাব পোড়ামাটির ফুল-লতা পাতার নকশায় শোভিত। জিন্দা পীর মসজিদ ও মাজার এর নিকটেই অবস্থিত।
৮. বাগেরহাট জাদুঘর:
ষাট গম্বুজ মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে পুরাতন রূপসা রোডে অবস্থিত। বাগেরহাটের মুসলিম সংস্কৃতি ও খানজাহান আলী (রহ.)-এর স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে ইউনেস্কো ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে ১৯৯৫ সালে নির্মাণ শুরু হয় এবং ২০০১ সালে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ইসলামিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত তিনটি গ্যালারিবিশিষ্ট এই জাদুঘরে বাগেরহাটের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, মসজিদ ও স্থাপত্যের ছবি, খানজাহান আলী (রহ.)-এর বিখ্যাত কুমিরের মমি, স্মৃতিচিহ্ন, মুদ্রা, তৈজসপত্র, মানচিত্র ও লিখিত ইতিহাস সংরক্ষিত আছে।
৯. খাঞ্জেলী দীঘি:
বাগেরহাট শহর থেকে মাত্র ৩ কিমি দূরে, হযরত খান জাহান (রহ.)-এর মাজারের দক্ষিণে প্রায় ২০০ বিঘা জায়গা জুড়ে অবস্থিত এই বিশাল দীঘি। নামকরণ নিয়ে মতভেদ আছে (ঠাকুর দীঘি নামেও পরিচিত)। খানজাহান আলী (রহ.)-এর ছেড়ে দেওয়া কুমির কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়ের গল্প বিখ্যাত। গাছগাছালিতে ঘেরা, প্রশস্ত ঘাটবিশিষ্ট এই দীঘির পাড়ে ছায়াসুনিবিড় পরিবেশে বেড়ানোর জন্য লোকজন আসেন। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী দীঘির পানি পানে রোগমুক্তি ঘটে।
১০. চন্দ্রমহল ইকো পার্ক:
বাগেরহাট সদরের খুলনা-মোংলা মহাসড়কের পাশে রঞ্জিতপুর গ্রামে অবস্থিত। সেলিম হুদা ২০০২ সালে প্রায় ৩০ একর জায়গায় তার স্ত্রী নাসিমা হুদা চন্দ্রার নামে তাজমহলের আদলে চন্দ্রমহল ভবনসহ এই ইকো পার্ক ও পিকনিক স্পট নির্মাণ করেন। পানিবেষ্টিত ভবনে প্রবেশ করতে হয় টানেল দিয়ে। ভবনে দেশী-বিদেশী মুদ্রা, ডাকটিকিট, যুদ্ধাস্ত্র, প্রাচীন ঘড়ি, অলংকার, ধর্মীয় পুরাকীর্তি, বিরল পান্ডুলিপি, মৃৎশিল্প নিদর্শন ইত্যাদি প্রদর্শিত হয়। পার্কে আছে ভাস্কর্য, বাঁশের ঘর, পানসী নৌকা, রাজাকারের প্রতীকী ফাঁসির মঞ্চ, কৃত্রিম রেললাইন, রেস্টুরেন্ট এবং মিনি চিড়িয়াখানা (বানর, হরিণ, ময়ূর, বক, কুমির, নানা পাখি সহ)।
বাগেরহাট কেবল একটি জেলা নয়; এটি ইতিহাসের এক জীবন্ত পাঠশালা, স্থাপত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং প্রকৃতির এক অপরূপ লীলাভূমি। ষাট গম্বুজের পাথরের কারুকাজ থেকে শুরু করে খাঞ্জেলী দীঘির প্রশান্ত জলরাশি, সুফী সাধক খান জাহান আলী (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক সান্নিধ্য থেকে সুন্দরবনের কচিখালীর রোমাঞ্চকর সৌন্দর্য – সব মিলিয়ে বাগেরহাট বাংলার হৃদয়ে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। ইউনেস্কোর স্বীকৃত এই বিশ্ব ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রক্ষণাবেক্ষণের দাবি রাখে, যাতে প্রাচীন এই জনপদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও সংস্কৃতির আলোকবর্তিকা চিরকাল ধরে জ্বলতে থাকে। প্রতিটি ইট-পাথর, প্রতিটি দীঘি-মসজিদ যেন নিঃশব্দে কাহিনি বলে যায় এক মহান সাধক ও তার স্বপ্নের শহর ‘খলিফাতাবাদ’-এর।
বাংলার প্রাঙ্গণ “বাংলার তথ্যপট” উদ্যোগ নিয়ে এক নবদিগন্তের সূচনা করেছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে যাত্রা শুরু হয়েছে এরই একটি নতুন শাখা “৬৪ জেলার ভ্রমণকথন”। এই শাখার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণ স্থানগুলো সবার সামনে নিয়ে আসা। আজ "৬৪ জেলার ভ্রমণকথন" এর ৫৮ তম পর্বে থাকছে - বাগেরহাট জেলা।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, ভ্রমণ গাইড।
#ভ্রমণ #বাগেরহাট #ইতিহাসের_জীবন্ত_পাঠশালা
(অনুমতি ছাড়া রিপোস্ট করবেন না)
েলার_ভ্রমণকথন (বিস্তারিত জানুন কমেন্টে)