14/04/2018
এজিদের চক্রান্তে মোহাম্মদী ইসলামঃ
[পর্বঃ ১]
এজিদের পূর্ববর্তী চার পুরুষ যথাক্রমে-
১. উমাইয়া,
২. হারব,
৩. আবু সুফিয়ান,
এবং ৪. মাবিয়া।
উমাইয়া সেই ব্যক্তি, যে ক্রীতদাস হযরত বেলাল (রাঃ) কে পশুর মত নির্যাতন করেছিল। কারণ তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
আমির মাবিয়ার পরিচয় দিতে গিয়ে 'খিলাফতের ইতিহাস' গ্রন্থের লেখক মুহম্মদ আহসান উল্লাহ্ বলেন, "আমীর মাবিয়া রাসূল (সঃ) এর সাহাবী ছিলেন অবশ্যই কিন্তু এ কথাও অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, তাহার খান্দান রাসূল (সঃ)এর বড় দুশমন ছিলেন এবং অবশেষে নিরুপায় হইয়া মক্কা বিজয়ের পর মুসলমান হইয়াছিলেন। রাসূল (সঃ) এর প্রবলতম শত্রু কুরাইশ দলপতি আবু সুফিয়ান তাহার পিতা ছিলেন। তাহার মাতা হেন্দা, যিনি রাসূল (সঃ) এর চাচা হামজার কলিজা চিবিয়া খাইয়াছিলেন। প্রথম দিকে মাবিয়া একজন সামান্য সৈনিক, পরে একজন ক্ষুদ্র সেনানায়ক ছিলেন, তারপর বিদ্রোহী হইয়াছিলেন, তারপর শিফ্ফিনের লড়াইয়ের পর কৌশল ও প্রতারণা দ্বারা আমীর মাবিয়া ক্ষমতাবান হইয়াছিলেন।"
মাবিয়ার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আলোচনা করলে দেখা যায় যে, মাবিয়াও পিতা মাতার সাথে আজীবণ ইসলামের দুশমনি করে শেষ পর্যন্ত ৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের পর (পিতা মাতার সাথে) ইসলাম গ্রহণ করে।
মাবিয়া সম্পর্কে কোন কোন ঐতিহাসিক মন্তব্য করেন যে, "মাবিয়া ইসলাম গ্রহণের পর রাসূল (সঃ)-এর সোহবতে কিছুদিন থাকলেও তা তার ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের তুলনায় অনেক কম সময় ছিল। ফলে এলমে তাসাউফের দীক্ষা সে তেমন লাভ করতে পারে নি। যার ফলে পিতার মত কূটকৌশল অবলম্বন করে সে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল।"
আমীর মাবিয়াই মূলত উমাইয়া খিলাফতের প্রতিষ্ঠাকারী এবং সে'ই প্রথম রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে।
ঐতিহাসিক ইয়াকুবীর মতে- মাবিয়া একবার বলেছিল, "আরবীয় রাজাদের মধ্যে আমিই প্রথম রাজা।"
কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, "উমাইয়া ও তার পৌত্র আবু সুফিয়ান ইসলামের বিরোধিতা করে যে ক্ষতি সাধন করেছে, মাবিয়া ও তার পুত্র এজিদের দ্বারা ইসলাম ধর্মের তার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতি সাধিত হয়েছে, যা কোন দিনই পূরণ হবার নয়। কেননা মাবিয়ার সময় থেকেই ইসলামে নানা ফেরকার সূচনা হয় এবং এজিদের সময়ে তা পরিপূর্ণতা লাভ করে।"
ইমাম হাসান (রাঃ)-এর শাহাদাৎঃ
মুসলিম জাহানের ৪র্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ)-এর শাহাদাৎ বরণের পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইমাম হাসান (রাঃ) খলিফা নির্বাচিত হন। রাজনীতি এবং কূটনীতি সম্পর্কে তাঁর তেমন অভিজ্ঞতা ছিল না। সিরিয়া ও মিশরের উচ্চাভিলাষী শাসক মাবিয়া খিলাফতের এই দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করলো।
ইরাক ও মদিনা ইমাম হাসান (রাঃ) এর দখলে। মাবিয়াকে এই দুই স্থানেরও ক্ষমতার লোভ পেয়ে বসলো।
ইমাম হাসান (রাঃ) তখন মদিনায়। এজিদের চক্রান্তে স্বীয় স্ত্রী কর্তৃক বিষ প্রয়োগে তিঁনি মর্মান্তিকভাবে শাহাদাৎ বরণ করেন।
ইমাম হুসাইন (রাঃ)-এর শাহাদাৎঃ
মাবিয়ার মৃত্যুর পর অযোগ্য এজিদ খলিফা হলে কুফাবাসীগণ তাকে খলিফা হিসেবে মেনে নিতে রাজি হলেন না। তারা হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)-কে সর্বসম্মতিক্রমে তাদের নেতা মনোনীত করে তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণ করার কথা ব্যক্ত করেন। সাথে সাথে এজিদ প্রায় দেঁড়শত পত্র ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর নিকট প্রেরণ করে! বিপুল সংখ্যক পত্র দেখে ইমাম কুফা যেতে মনস্থ করেন। কিন্তু বিপদের আশঙ্কা আছে জন্যে তাঁর আত্মীয়-স্বজন তাঁকে কুফা যেতে নিষেধ করেন। অনেক ভেবে ইমাম হুসাইন (রাঃ) মুসলেম বিন আকীলকে কুফায় পাঁঠান পরিস্থিতি বিবেচনার জন্য। মুসলেম বিন আকীলের সাথে তাঁর মা-হারা ছোট ছোট দুই পুত্রও রওয়ানা হন। কুফায় পৌঁছানোর পর ইমামের পক্ষের লোক শুনে প্রায় ৪০ হাজার লোক তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। পরিস্থিতি অনুকূলে জানিয়ে মুসলেম বিন আকীল ইমামকে চিঠি লেখেন এবং বলেন চিঠি হাতে পাওয়া মাত্র তিঁনি যেন কুফা অভিমুখে রওয়ানা দেন।
এদিকে কুফার নবনিযুক্ত গভর্নর ইবনে যিয়াদ সুকৌশলে নানা প্রলোভন দেখিয়ে মুসলেমের পক্ষ সমর্থনকারী লোকদের এজিদের প্রতি আনুগত্য স্বীকারের মাধ্যমে মুসলেমের সঙ্গ ত্যাগ করালো। এমনকি তাঁকে ও তাঁর দুই ছেলেকে হত্যা করা হলো।
হযরত মোসলেম (রাঃ) এর পত্র পাওয়ার পর ইমাম তাঁর পরিবার-পরিজন ও সঙ্গীদের নিয়ে হিজরী ৬০ সনের ৩রা জিলহজ্ব কূফা অভিমুখে রওয়ানা করেন। পথিমধ্যে বকর বিন সাদী ইমামের দেখা পান এবং কুফার সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন। তারপর সবাই ফিরে আসতে চাইলো। কিন্তু ইমামের দলে হযরত মোসলেম (রাঃ) এর তিন ভাই ছিলেন, তাঁরা কুফা গিয়ে ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে দৃঢ়প্রতিঙ্গ রইলেন। ইমাম অনেক ভেবে শেষমেষ কুফা যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নেন এবং সকলকে নিয়ে রওয়ানা করেন।
কারবালায় পৌঁছতে সন্ধ্যা নামলো। ইমাম সেখানে তাবু খাটালেন। নারী শিশুসহ ইমামের সঙ্গী মোট ৮২ জন। অপরদিকে এজিদের সেনাপতি ইবনে যিয়াদের ২২ হাজার সৈন্য অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাঁর বীপরীতে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হলো। ইতিপূর্বেই যিয়াদের নির্দেশে ইবনে সাদ একদল সৈন্য নিয়ে ফোরাত নদী অবরোধ করে রেখেছে। যাতে ইমামের সাথীরা ফোরাত নদী থেকে পানি সংগ্রহ করতে না পারে। একসময় ইমাম শিবিরে পানি ফুরিয়ে গেল। কিন্তু এজিদ সৈন্যরা তাঁদের ফোরাতের পানি দিতে নারজ। ইবনে যিয়াদ ইমামের কাছে বার বার খবর পাঁঠাচ্ছিল, "এজিদের আনুগত্য স্বীকার করতে হবে, নচেৎ প্রান দিতে হবে।"
দোজাহানের বাদশাহ্ এবং শের-এ-খোদার রক্ত যার দেহে প্রবাহিত তিঁনি কি করে এজিদের মত এক নালায়েকের বশ্যতা স্বীকার করেন! ইমাম বুঝতে পারেন তাদের মূল লক্ষ্য তাঁকে হত্যা করা। তাই তিঁনি তাবুতে ফিরে সঙ্গী ও পরিবারবর্গকে লক্ষ্য করে বলেন, "শত্রুদের একমাত্র উদ্দেশ্য আমাকে হত্যা করা। আপনারা অযথা আমার জন্য প্রাণ দিবেন কেন? আপনারা এখান থেকে চলে যান। কেউ আপনাদেরকে বাঁধা দিবে না।"
এ কথা শুনে ইমাম শিবিরে কান্নার রোল পড়ে গেল। ইমামকে ছেড়ে কেউই চলে যেতে রাজি হলেন না। বরং সকলেই ইমামের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিলেন এবং সাথে সাথেই সকল বয়স্ক পুরুষ যুদ্ধের জন্য তৈরী হয়ে গেলেন।
ইমাম বাহিনীর সাথে এজিদ বাহিনীর যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। একে তো ক্ষুধা, তৃষ্ণা তার উপর তাঁদের সংখ্যা এজিদ বাহিনীর তুলনায় মুষ্টিমেয়। তাঁদের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। একে একে তাঁরা শহীদ হয়ে যান। ইমাম শিবিরে অসুস্থ জয়নাল আবেদীন আর ইমাম হুসাইন ছাড়া আর কোন পুরুষ অবশিষ্ট নেই। ইমাম শিবিরে কান্নার রোল পড়ে যায়। তাঁদের স্বান্তনা দেয়ার মতো কেউ নেই।
বীরপুরুষ ইমাম হুসাইন (রাঃ) যুদ্ধক্ষেত্রে গেলে তাঁর ভাবমূর্তি দেখে শত্রুদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। ওরা কেউ ইমামের সামনে আসার সাহস করলো না। তিঁনি ঘোড়া ছুটিয়ে ফোরাতের তীরে গেলেন। ঘোড়া থেকে নেমে দু'হাত ভরে পানি তুল্লেন পান করার জন্য। কিন্তু পূর্বের স্মৃতি তাঁর স্মরণে এলো। তাঁর কোলে বসেই শিশুপুত্র আলী আসগর পানির অভাবে শহীদ হয়েছেন। তাঁর অন্যান্য সঙ্গীগণ এই পানির জন্যই যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছেন। তিঁনি হাত থেকে পানি ফেলে দিলেন এবং পুনরায় ঘোড়ায় আরোহণ করলেন। একদিকে আত্মীয়-স্বজনের বিয়োগ ব্যাথায় ভারাক্রান্ত, অপরদিকে ক্ষুধা ও পানির পিপাসায় কাতর হয়ে তিঁনি যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে রওয়ানা হলেন। তাঁর করুণ অবস্থা দেখে এজিদ সৈণ্যরা পাগলা কুকুরের মতো একযোগে তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একটি বিষাক্ত তীরের আঘাতে তিঁনি ধরাশায়ী হয়ে পড়েন। পাষণ্ড সীমার এসে তখন তাঁর মাথা মোবারক কেটে নিয়ে যায়।
হিজরী ৬১ সন, ১০ই মহররম, রোজ শুক্রবার ৫৬ বছর ৫ মাস ৫ দিন বয়সে জান্নাতী পুরুষদের সর্দার কারবালার ময়দানে শহীদ হন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। কারবালার যুদ্ধে ইমাম পরিবারের ১৭ জন এবং সঙ্গীদের ৫৫ জনসহ মোট ৭২ জন শাহাদাৎ বরন করেন।
ক্ষমতায় আসে এজিদ।
এজিদ এবং পরবর্তী নামধারী মুসলিম শাসকবৃন্দের শাসনামলঃ
উমাইয়া খিলাফতঃ(এজিদের বংশধর)
৬৬১ খ্রীষ্টাব্দ - ৭৫০ খ্রীষ্টাব্দ,
মোট ৮৯ বছর।
এই শাসনামলে ইমাম আবু হানিফা (রঃ)-কে খাবারে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়।
উল্লেখ্য যে, উমাইয়া (এজিদের বংশধর) শাসকগণের মধ্যে একমাত্র ওমর বিন আব্দুল আজিজ (৩ বছর শাসনামল) ব্যতীত সকলেই এজিদের তাসাউফ বিবর্জিত নীতি অনুসরণ করেন।
আব্বাসীয় খিলাফতঃ
৭৫০ খ্রীষ্টাব্দ - ১২৫৮ খ্রীষ্টাব্দ,
মোট ৫০৮ বছর।
আব্বাসীয়রা উমাইয়াদের তীব্র ঘৃণা করলেও তারাও তাসাউফবিরোধী ছিল। তারা শাসনক্ষেত্রে যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দিলেও ইসলামের মহান সাধক ও ইমামগণের প্রতি নির্মমভাবে অত্যাচার করেছে।
এই শাসনামলে,
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) মাথায় লাঠির আঘাতের মাধ্যমে ইন্তেকাল করেন।
হযরত মনসুর হিল্লাজ (রঃ) শূলদণ্ডে মৃত্যুবরণ করেন।
হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ)-কে ৯০০ শরীয়তী মোল্লা কর্তৃক কাফের ফতোয়া দেয়া হয়।
উল্লেখ্য যে, আব্বাসীয় শাসনামলে খলিফা আল-মাহদী (১০ বছর শাসনামল) এবং খলিফা হারুন-অর-রশিদ (২৩ বছর শাসনামল) অনেকটা ইসলামী ভাবধারায় রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন। বাকি সবাই ছিল ইসলাম বিবর্জিত স্বভাবের!
তাহলে আমরা কি করে কল্পনা করতে পারি টানা (৮৯+৫০৮) - (৩+১০+২৩) = ৫৬১ বছর ইসলাম বিরোধীরা শাসন করে পৃথিবীর বুকে আমাদের জন্য খাঁটি ইসলামটা রেখে গেছে??