09/08/2026
চট্টগ্রামের খুব কাছেই এক টুকরো স্বর্গ: খাগড়াছড়ির ভাইরাল 'জুমঘর'! ☘️
চট্টগ্রাম শহরের ইট-পাথরের ধূসর জগত ছেড়ে মাত্র দুই ঘণ্টার দূরত্বে পা বাড়ালেই দেখা মিলবে এক সবুজ স্বর্গের। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির দিনে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা মেঘ আর মাটির সোঁদা গন্ধে ম ম করা এক আদিম পরিবেশ—বলছি খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার সেই 'জুমঘর'-এর কথা, যা বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো ভাইরাল। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ঝেড়ে যারা প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় অবগাহন করতে চান, তাদের জন্য জুমঘর এখন এক পরম গন্তব্য।
কেবল ছবি তোলার স্পট নয়, এটি জীবনসংগ্রামের প্রতীক:
অনেকেই হয়তো জুমঘরকে কেবল ছবি তোলার রঙিন মাচা মনে করেন, কিন্তু এর পেছনে মিশে আছে পাহাড়ের মানুষের জীবন-সংগ্রামের ঘাম ও ঘ্রাণ। এখানকার দিগন্তজোড়া পাহাড়ে স্থানীয়রা চাষ করেন বিশেষ জাতের 'ছুরি ধান'। এই ধান বন্য পশুপাখি আর শুকরের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই মূলত নির্মিত হয় অস্থায়ী ঘর বা 'জুমঘর'। বর্তমানে পর্যটকদের চাপে ফসলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মালিকরা জুমঘরের চারপাশে খুঁটি ও বেড়া দিয়েছেন। পাহাড়ের এক চাষীর কণ্ঠে ফুটে উঠল সেই চিরচেনা সংগ্রামের গল্প:
"সাধারণত এই জায়গাগুলো তৈরি হয় এই ধানগুলো পাহারা দেওয়ার জন্য... এটা হচ্ছে ওদের থাকার জায়গা। এখানে বসে ওরা ধান ক্ষেত দেখাশোন করে।"
দুই পথের অ্যাডভেঞ্চার:
এখানে যাওয়ার দুটি পথ রয়েছে—জুমঘরে পৌঁছানোর জন্য আপনি দুটি ভিন্ন রাস্তার স্বাদ নিতে পারেন। আপনি যদি সহজ ও সমতল পথে প্রকৃতির শান্ত রূপ দেখতে চান, তবে বেছে নিন 'শান্তিপূর্ণ' পথটি। এই পথে যেতে আপনার চোখে পড়বে স্নিগ্ধ এক 'শাপলা বিল'। আর আপনি যদি দুর্গম পাহাড় আর টিলার রোমাঞ্চ ভালোবাসেন, তবে অন্য পথটি আপনার জন্য। তবে সাবধান, বৃষ্টির দিনে পাহাড়ের এই কাদাটে মাটি অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়ে ওঠে। যাত্রাপথে একটি বিশাল 'বটগাছ' আপনার জন্য ল্যান্ডমার্ক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকবে, যা পার হয়েই আপনাকে আসল গন্তব্যের পথে এগোতে হবে।
নামমাত্র ফি যা জুমের নস্ট হওয়া ফসলের ক্ষতি পুরণ:
জুমঘরে প্রবেশের জন্য পর্যটকদের কাছ থেকে মাত্র ৩০ টাকার মতো একটি নামমাত্র ফি নেওয়া হয়। এটি কেবল ব্যবসার জন্য নয়, বরং পর্যটকদের অনিচ্ছাকৃত ভুলে যে জুমের ফসল নষ্ট হয়, তার ক্ষতিপূরণ বা 'রিকভারি'র জন্য ব্যয় করা হয়। অনেকে ছবি তোলার নেশায় ফসলের ভেতরে ঢুকে পড়েন, যা কৃষকের অপূরণীয় ক্ষতি করে। দায়িত্বশীল পর্যটন হিসেবে এই অর্থ প্রদান করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। স্থানীয়দের ভাষায়:
"এখানকার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ওরা কিছু টাকা রাখে যেটা এখানকার যে জুমগুলা নষ্ট হয় এটা রিকভারির জন্য।"
খুদে ঘোড়া ও ‘ডেড হ্যান্ড’ পয়েন্ট:
মাত্র ৫০ টাকায় চড়ে বসতে পারেন এখানকার বিখ্যাত ক্ষুদে ঘোড়ার পিঠে! আর ছবি তোলার জন্য আছে দারুণ 'ডেড হ্যান্ড' পয়েন্ট—যেখান থেকে পুরো পাহাড়ের সেরা ভিউ পাবেন।
পাহাড়ি রসনা ও আপ্যায়ন:
ফেরার পথে স্থানীয় বাজার থেকে টাটকা পাহাড়ি কলা দিয়ে মুখ মিষ্টি করতে একদম ভুলবেন না! এক ছড়া পাহাড়ি কলা পাবেন মাত্র ৫০ টাকায়।
কীভাবে যাবেন?
জুমঘরে ভ্রমণের জন্য একটি নিখুঁত রোড ম্যাপ নিচে দেওয়া হলো:
চট্টগ্রাম (অক্সিজেন মোড়) থেকে মানিকছড়ি: লোকাল বাস ভাড়া জনপ্রতি ৩০০ টাকা।
মানিকছড়ি থেকে লক্ষ্মীছড়ি বাজার: সিএনজিতে ভাড়া পড়বে ৫০-৬০ টাকা। পুরো রিজার্ভ নিলে ৩০০-৪০০ টাকা।
লক্ষ্মীছড়ি বাজার থেকে পার্কিং জোন: এখান থেকে মোটরবাইকে বা হেঁটে যেতে হবে। বাইক ভাড়া আবহাওয়াভেদে ১০০-২০০ টাকা। মনে রাখবেন, বাইক আপনাকে কেবল পার্কিং এলাকা পর্যন্তই নিয়ে যাবে, এরপরের কর্দমাক্ত পথটুকু আপনাকে হেঁটেই পাড়ি দিতে হবে।
কিছু সতর্কতা:
• স্পটটি সন্ধ্যা ৬টার পর বন্ধ হয়ে যায়, তাই দিনের আলো থাকতেই ফিরুন।
• অতিরিক্ত ভিড় এড়াতে শুক্রবার বাদে অন্যদিন যাওয়ার চেষ্টা করুন।
• পাহাড়ে প্লাস্টিক ফেলবেন না এবং ছবি তোলার সময় কৃষকের জুমের ধান মাড়ানো থেকে বিরত থাকুন।
পাহাড়ের এই রূপ যেমন স্নিগ্ধ, তেমনি স্পর্শকাতর। আমরা যখন জুমঘরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই, তখন যেন ভুলে না যাই যে এটি কারও বেঁচে থাকার অবলম্বন। জুমের ফসল মাড়িয়ে বা প্লাস্টিক ফেলে আমরা যেন এই স্বর্গকে নরক না বানাই।
শহরের ঘিঞ্জি আর কৃত্রিম কোলাহল ছেড়ে মাত্র ২ ঘণ্টার এই সবুজ স্বর্গে হারিয়ে যেতে আপনি কি প্রস্তুত, নাকি আগামী সপ্তাহান্তটাও ঘরে বসেই কাটাবেন?
কমেন্টে ট্যাগ করুন আপনার ট্রাভেল পার্টনারদের আর প্ল্যান করে ফেলুন এখনই!