29/09/2024
Collected :
আমরা দুজন-ই চিকিৎসক। খুব ব্যস্ততায় সময় কাটে। আমার এক বড় পরীক্ষা এলো। আলহামদুলিল্লাহ ভালো ফলাফল করলাম। স্বামী খুবই খুশি হয়ে বললেন আমাকে ৭ দিন এর জন্য কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাবেন। প্ল্যান হলো দার্জিলিং যাবো। পাহাড় ঘেঁষে সময় কাটাবো। আমার উপর দায়িত্ব পড়লো হোটেল পছন্দ করার। আমি তো মহা খুশি। ২/৩ দিন শুধু এগুলোই করছি। প্লেন এর টিকেট ঠিক করছি তারিখ মিলিয়ে।
এর মাঝেই একদিন যোহর এর নামাযে যখন দাঁড়িয়েছি সুন্নাত শেষ করে ফরজ এর কিরাত বেঁধেছি। ভিতর থেকে কে জেনো বলে উঠলো, "কি করছো তুমি? এই সুযোগ এভাবে নষ্ট করবা ? যদি এমন সুযোগ আর না আসে?"
নামাযেই একটু অমনোযোগী হয়ে গেলাম। কিন্তু আমি ইশারা বুঝে ফেলেছিলাম। নামায শেষ করে আব্বুকে ফোন দিলাম। "আব্বু উমরাহ কবে করতে হয়? এখন কি যাওয়া যাবে ?"
আব্বুরা যে আঙ্কেল এর সাথে হজ্জ এ গিয়েছেন তার নাম্বার দিলো আমাকে। জানতে পারলাম এই মাসেই এক কাফেলা যাচ্ছে। ১৫ দিনের জন্য। একটু চিন্তায় পড়লাম। ১৫ দিন সে তো সম্ভব না!
রাতে স্বামী বাসায় ফিরলে তাকে সব বললাম। ১৫ দিন ছুটি কখনোই সম্ভব না সাফ জানিয়ে দিলো। বললো এটা খুবই ভালো প্ল্যান কিন্তু এতো অল্প সময়ে এটা বাস্তবায়ন সম্ভব না। এবার দার্জিলিং এ ঘুরে আসি চলো।
সারারাত ঘুমাতে পারলাম না। কি এক অস্থিরতা! দার্জিলিং এর প্রতি কোন আকর্ষন নেই তখন আর।
সকালে এজেন্সির আঙ্কেল ফোন দিলেন জানতে আমরা যাবো নাকি। আমি বললাম আঙ্কেল হচ্ছে না। সময় মিলবে না। বলতে গিয়ে গলা ভারী হয়ে উঠলো। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। নামায এ দাড়ালেই কান্না আসে।
পরদিন ঐ আঙ্কেল আবার ফোন দিলেন। উনি আমাদের ২ জন এর জন্য ৭ দিনের প্যাকেজ এর ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন। আবার শুরু হলো আমার অস্থিরতা। স্বামীকে বললাম। প্রায় ২ লক্ষাধিক টাকা এবং অনেক প্রস্তুতির ব্যাপার।
২ জন-ই মাত্র পাশ করা ডাক্তার। জমানো টাকা কেচে কুচে ১ লক্ষ ৪০ হাজারের এর মতো হয়। একটু চিন্তায় পড়লাম। আব্বু এগিয়ে আসলো। আমার বিয়ের গিফটের কিছু টাকা নাকি তার কাছে ছিলো, রেখে দিয়েছিল লাগলে দিবে। সেটা দিয়ে দিলো। আমরা এজেন্সি তে টাকা দিয়ে আসলাম। বুধবার ফ্লাইট আমাদের। মক্কায় জুম্মা পাবো ইন শা আল্লাহ।
সব প্রস্তুতিতে আব্বু এতো সাহায্য করলো যে সব খুব সহজ হয়ে গেলো আমাদের জন্য। আলহামদুলিল্লাহ।
দিন ঘনিয়ে আসছে। আমরা আল্লাহ আল্লাহ করছি। কিন্তু মনে একটা চিন্তা। হাতে অতিরিক্ত কোন টাকা পয়সা নেই। যদিও এজেন্সির আঙ্কেল বলেছেন অতিরিক্ত কিছুই লাগবে না।
ইহরাম বেঁধে বাসা থেকে বের হলাম। শ্বশুর এয়ারপোর্টে দিয়ে আসলেন। আসার আগে একটা প্যাকেট দিয়ে বললেন, "এটা দিয়ে তোমরা খেঁজুর খেয়ো।" দেখলাম প্যাকেটে সৌদি রিয়েল। আল্লাহ কিভাবে ব্যবস্থা করেন তা আসলে আমরা বুঝতে পারি না। আলহামদুলিল্লাহ।
চেক ইন করে বসে ছিলাম। দেখলাম প্লেন এসেছে। সৌদি এয়ার লাইন্স এর বিশাল প্লেন। হয়তো এখনই ডাকবে। কিন্তু কেন জানো ডাকছে না। ১/২/৩ ঘণ্টা পার হয়ে গেলো। রাত ২:৪৫ এ প্লেন ছাড়ার কথা সেখানে ভোর হয়ে গেলো। ঘোষণা এলো প্লেন এর চাকায় সমস্যা। প্লেন ঠিক করতে সৌদি আরব থেকে লোক আসবে। আমাদেরকে উত্তরায় এক হোটেলে যেতে বললো। হোটেলে গেলাম।
আমার তো বুক ফেটে কান্না আসছে। মাত্র ৭ দিন এর জন্য যাচ্ছি, আমার সময় কতটা দামি আমিই জানি। অপেক্ষা করছি হোটেল। দুপুরে জানালো সন্ধায় প্লেন ঠিক হতে পারে। সন্ধায় বললো রাতে। রাতে বললো আজকে নাও হতে পারো। আমি আর ঠিক থাকতে পারলাম না। আমি তো মক্কাতে জুম্মাহ পাবো না। আমার তো মাত্র ৭ দিন সময়। আমি অস্থির হয়ে উঠলাম। এখানে সেখানে ফোন দিচ্ছি। সবার একটাই কথা, অপেক্ষা করো।
আমি কাঁদতে থাকলাম। সৌদি এয়ার লাইন্স এ ফোন দিলাম। জানালো উনাদের কিছু করার নেই। খুব কাকুতি মিনতি করলাম যে যদি আপনাদের পরবর্তী ফ্লাইট এ দুটো সিট যদি থাকে আমাদের নিয়ে যাবেন দয়া করে। তখন বৃহস্পতিবার রাত ১১ টা। বাইতুল্লাহতে জুম্মা পাবো না এই কষ্টে আল্লাহ কে ডাকতে লাগলাম। দুই জনই ইহরাম বাঁধা অবস্থায় ছিলাম। আল্লাহকে ডাকতে থাকলাম।
হঠাৎ রাত ২ টায় এক অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসলো। জানতে চাইলো আমরা কোন হোটেলে আছি। আমরা কি এখনি এয়ারপোর্টে আসতে পারবো নাকি? এই ফ্লাইটে ২ টা সিট খালি আছে। আমরা তো শুনে দৌড়। হোটেলের নিচে নেমে যা বুঝলাম অন্য কাউকে জানানো হয় নি। খুব গোপনে আমাদেরকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেয়া হলো। আমরা ইমিগ্ৰেশন এর অফিসারকে ধন্যবাদ দিয়ে প্লেনে উঠলাম।
প্লেন যখন আকাশে উঠলো মনে হলো আমি আল্লাহর নিকটে চলে যাচ্ছি। শুকরিয়া জানানোর কোন ভাষা ছিলো না। জেদ্দা পৌঁছালাম সকাল ১০:৩০টায়। জুম্মাহ ১২:১০ এ। তাই আর বাস এর অপেক্ষা করলাম না। ট্যাক্সি ড্রাইভার বললেন জুম্মাহ পাবেন না। বাসে যেতে ২ ঘণ্টা লাগবে। ট্যাক্সিতে আরেকটু কম।
আমি তখন আর আশাও করছি না। এই দেশে এসে পৌঁছাতে পেরেই আমি খুশি। কিন্তু তাও বললাম যে বাসে যাবো না। ট্যাক্সিতেই যাব। চারিদিক মুগ্ধের মতো দেখছি। জেদ্দা থেকে মক্কার পথে গাড়ি ছুটে চলছে। এ আমার নবী রাসূলদের পবিত্র ভূমি। ১১:৩৫ এ ড্রাইভার বললো আর ৫ মিনিট লাগবে। আমি এবার একটু নড়ে চড়ে বসলাম। যখন গাড়ি থেকে নেমে হোটেলে ঢুকলাম তখন ১১:৫০ বাজে। কোন মতে ব্যাগ গুলো রেখে ওযু করে আমরা হারাম এর দিকে দৌড় দিলাম।
৫ মিনিটে পৌঁছে গেলাম। জুম্মার খুতবা চলছিলো। নামায শুরু হলো। এখনো ভাবলে বিশ্বাস হয়না কিভাবে আমরা পৌঁছালাম ঐ সময়ে। আলহামদুলিল্লাহ। নামায শেষে মসজিদের ভিতর ঢুকার পালা। আল্লাহর ঘর দেখার জন্য, উমরাহ এর জন্য পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। অনেক ভিড় ঠেলে আস্তে আস্তে যাচ্ছি, কি আনন্দ, উত্তেজনা! যখন বুঝলাম প্রায় চলে এসেছি তখন ধীরে ধীরে চোখ উপরে তুললাম।
আমি যা দেখেছি আমার চোখ এর থেকে সুন্দর, শান্তিময় ও পবিত্র কিছু আর কখনো অবলোকন করতে পারবে না। অঝোরে পানি পড়তে লাগলো আমাদের চোখ বেয়ে। আমরা যে আল্লাহর এবং তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তন-ই অন্তরের শান্তি আনে সেটা উপলব্ধি করতে পারলাম।
পৃথিবীর আর কিছু দেখার সাধ নাই আমাদের। এই ঘরটাই বার বার , বার বার দেখতে চাই। আল্লাহ কবুল করুক।
❝হে আমার রব! আপনাকে ডেকে তো আমি কখনো নিরাশ হই নি।❞
সংগৃহীত