04/06/2026
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার সন্তান -
বীর মুক্তিযোদ্ধা সওগাতুল আলম সগীরকে
মনে পরে?
ঘাতকের গুলি স্তব্ধ করল যে মহান নেতার বুক,
মঠবাড়িয়া আজও ভোলেনি তার সেই চিরভাস্বর মুখ।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সওগাতুল আলম সগীর ১৯৭০-এর পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক।
১৯৭৩ সালের ৩ জানুয়ারি নিজ এলাকায় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের জেরে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে তিনি নির্মমভাবে শহীদ হন।
মঠবাড়িয়ার সন্তান -
সওগাতুল আলম সগীরের জন্ম আনুমানিক ১৯৪৭ সালে গুলিশাখালী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তিনি গ্রামীণ আবহে বেড়ে উঠেছিলেন।
তিনি পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার গুলিশাখালী গ্রামের রত্তন মিয়ার সন্তান।
সগীরের রাজনৈতিক জীবন সূচনা -
তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগে যুক্ত হয়ে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন।
১৯৭০-এর নির্বাচন: ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে তিনি মঠবাড়িয়া-বামনা-পাথরঘাটা (পিরোজপুর-৩) আসন থেকে পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধে সগীরের অবদান -
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে পাড়ি জমান এবং পশ্চিমবঙ্গে 'আমলানী যুব প্রশিক্ষণ ক্যাম্প' প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মঠবাড়িয়া উপজেলা 'স্বাধীনতা সংগ্রাম কমিটি'র আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং স্থানীয় মুক্তিসেনাদের সংগঠিত করে অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ করেছিলেন।
স্বাধীনতার পর -
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকার পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু ১৯৭৩ সালের ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মঠবাড়িয়া থানা থেকে বের হয়ে বাজারে আসার পথে হাইস্কুল সড়কে ওৎ পেতে থাকা একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্তের গুলিতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন আলোচনা সভা ও স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। যা এখন আর হয় না!
শহীদ সওগাতুল আলম সগীরকে
নিয়ে কাব্যিক ভাষায় কিছু কথা -
গুলিশাখালীর মেঠো পথ ধরে যে বালক হেঁটে যেত,
মঠবাড়িয়ার পলিমাটি বুকে যে বীর স্বপ্ন বুনেত।
বলেশ্বর নদের কলতানে যার কেটেছে শৈশব বেলা,
সে তো জানত না আসবে একদিন বারুদের মরণখেলা।
সবুজ গাঁয়ের মায়ায় বেড়ে ওঠা সেই তেজোদীপ্ত প্রাণ,
কণ্ঠে তুলেছিল মুক্তিকামী শোষিত মানুষের গান।
সত্তরের সেই ঐতিহাসিক রায়ে সেজেছিল জয়ের সাজে,
একাত্তরের রণাঙ্গনে ছুটেছিল মুক্তিসেনার মাঝে।
কিন্তু হায়! হায়েনার বুলেট কেড়ে নিল সেই আলো,
স্বাধীনতার সোনালী ভোরে চারদিক হয়ে গেল কালো।
ঘাতকের গুলি স্তব্ধ করল যে মহান নেতার বুক,
মঠবাড়িয়া আজও ভোলেনি তার সেই চিরভাস্বর মুখ।
শহীদ সওগাতুল আলম সগীরকে
নিয়ে কত যে কথা -
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার গুলিশাখালী গ্রামের এক নিভৃত ও শান্ত পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন সওগাতুল আলম সগীর । পল্লী মায়ের কোলে তার শৈশব কেটেছে আর পাঁচটা সাধারণ গ্রামীণ তরুণের মতোই, তবে তার চোখজুড়ে ছিল অধিকার আদায়ের এক অদম্য স্বপ্ন। শৈশব পেরিয়ে যখন তিনি কৈশোর ও যৌবনে পদার্পণ করেন, তখন পড়াশোনার পাশাপাশি জড়িয়ে পড়েন তৎকালীন ছাত্র রাজনীতিতে। মেধা, সততা ও বাগ্মিতার কারণে তিনি দ্রুতই স্থানীয় মানুষের প্রিয়পাত্র এবং আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতা হয়ে ওঠেন।
তিনি কেবল একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিই ছিলেন না, বরং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজের এলাকাকে শত্রুমুক্ত করার মূল কারিগর ও সংগঠক ছিলেন। সদ্য স্বাধীন দেশে যখন তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত মঠবাড়িয়া পুনর্গঠনের কাজে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ১৯৭৩ সালের ৩ জানুয়ারি এক গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হন এই দেশপ্রেমিক। একদল সশস্ত্র স্বাধীনতাবিরোধী কুচক্রীর বুলেটের আঘাতে অকালেই নিভে যায় তাঁর জীবনপ্রদীপ। মৃত্যুতে তার নশ্বর দেহ হারিয়ে গেলেও মঠবাড়িয়ার মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বেঁচে আছেন।
তাঁর স্ত্রী মাহমুদা সওগাত পরবর্তীকালে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
শহীদ সওগাতুল আলম সগীরের পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং তার স্মৃতি রক্ষার্থে মঠবাড়িয়ায় শহীদ সগীর স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ দীর্ঘ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে।
তবে মঠবাড়িয়া বা জাতীয় পর্যায়ে তার নামে এখনো বড় কোনো সরকারি দৃশ্যমান স্থায়ী স্মারক বা স্থাপত্য গড়ে ওঠেনি।
পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য
স্ত্রী মাহমুদা সওগাত -
সওগাতুল আলম সগীরের শাহাদাতের পর তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রাখেন তার সহধর্মিণী মাহমুদা সওগাত। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন প্রথম সারির নারী নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন এবং সপ্তম জাতীয় সংসদে (১৯৯৬–২০০১) দলটির মনোনীত সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রতিকৃতি ও আলোচনা সভা -
প্রতি বছর ৩ জানুয়ারি মঠবাড়িয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এবং শহীদ সগীর স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ যৌথ উদ্যোগে মঠবাড়িয়া উপজেলা সদরে অবস্থিত তার প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা ছাড়াও স্মরণ সভার আয়োজন করে থাকে।
পারিবারিক স্মারক -
তার নিজ জন্মভূমি গুলিশাখালী গ্রামের পারিবারিক বাসভবনে মিলাদ মাহফিল এবং তার সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে তাকে স্মরণ করা হয়।
লিখেছেন-
লিয়াকত হোসেন খোকন
#পিরোজপুর #মঠবাড়িয়া