09/01/2014
দেশের বাহিরে কিন্তু আমাদের অনেক কাছাকাছি ভারতের একটি শহর কলকাতা। ইচ্ছে করলেই আপনারা কয়েকটা দিন ঘুড়ে আসতে পারেন কলকাতা শহরটিতে।
কলকাতা দেখতে কিছুটা আমাদের ঢাকার মতই। কলকাতার সবার সাথে আমাদের মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলতে পারবেন। আমার মতে এর থেকে আনন্দের ভ্রমন আর কি হতে পারে।
অবসরে আপনি আপনার কয়েকজন বন্ধু মিলে প্রোগ্রাম করতে পারেন কলকাতা ঘুরে আসতে। যেই ভাবা সেই কাজ, ভারতের ভিসা করে রওনা দিন কলকাতার উদ্দেশ্যে।
ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী বলে কথিত শহর কলকাতা বাঙালির কৃষ্টি ও সভ্যতার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। এই শহরে একদা জন্মগ্রহণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায়, স্বামী বিবেকানন্দ, জ্যোতি বসু প্রমুখ জগদ্বিখ্যাত বাঙালিরা। আজ এই শহরের বাসিন্দা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, মৃণাল সেন, মহাশ্বেতা দেবী, প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মতো কৃতী ব্যক্তিত্ব। ঐতিহাসিক কালবিচারের নিরিখে এই শহর খুব একটা প্রাচীন নয়। তবে নানা জাতি নানা ভাষার মিলনভূমি আজকের কলকাতা শহর শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের রাজধানীই নয়, একটি যথার্থ বিশ্বনগরী এবং বিশ্বভাতৃত্ববোধের প্রতীক।
কলকাতা বা কোলকাতা, (পূর্বনাম: কলিকাতা), ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী, প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র এবং বৃহত্তম শহর। হুগলী নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত এই শহরের পৌরএলাকার জনসংখ্যা ৫০ লক্ষের কিছু বেশি। তবে কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলির অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত বৃহত্তর কলকাতার জনসংখ্যা ১ কোটি ৪০ লক্ষের কাছাকাছি। এই জনসংখ্যার বিচারে কলকাতা ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম শহর ও দ্বিতীয় বৃহত্তম মেট্রোপলিটান বা মহানগরীয় অঞ্চল এবং বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম মহানগর অঞ্চল। কলকাতা পৌরএলাকার উত্তর দিকে উত্তর চব্বিশ পরগনা, পূর্বে উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা এবং দক্ষিণ দিকে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা অবস্থিত। পশ্চিম দিকে হুগলি নদী এই শহরকে হাওড়া জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।
১৭৭২ সালে মুর্শিদাবাদ শহর থেকে বাংলার রাজধানী কলকাতায় স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯১১ সাল পর্যন্ত কলকাতা শুধুমাত্র বাংলারই নয়, বরং সমগ্র ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল। ১৯২৩ সালে ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্টের অধীনে কলকাতার স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন কর্তৃপক্ষ কলকাতা পৌরসংস্থা স্থাপিত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর কলকাতা নবগঠিত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী ঘোষিত হয়। এই সময় কলকাতা ছিল আধুনিক ভারতের শিক্ষা, বিজ্ঞান, শিল্প, সংস্কৃতি ও রাজনীতির এক পীঠস্থান। ১৯৫৪ সালের পর থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের ফলে সেই গৌরব অনেকাংশে খর্ব হয়। তবে ২০০০ সালের পর থেকে এই শহর পুনরায় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির পথে অগ্রসর হয় এবং সাংস্কৃতিক হৃতগৌরব অনেকাংশেই পুনরুদ্ধার করে। যদিও ভারতের অন্যান্য শহরের মতো কলকাতাতেও নগরায়ণজনিত দারিদ্র্য ও পরিবেশ দূষণ একটি গুরুতর সমস্যা।
কলকাতা শহরের প্রসিদ্ধি এই শহরের বৈপ্লবিক আন্দোলন ও সুদীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও পরবর্তীকালে বামপন্থী গণআন্দোলনগুলিতে এই শহর এক বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। অন্যদিকে আধুনিক ভারতের প্রধান প্রধান সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলিরও প্রাণকেন্দ্র এই কলকাতা। এই কারণে এই শহরকে ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী নামে অভিহিত করা হয়।
আবার কলকাতা শহরে বিভিন্ন ভাষা, জাতি ও ধর্মাবলম্বী মানুষদের শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যময় সহাবস্থানের জন্য এই শহরকে আনন্দ নগরী বা সিটি অফ জয় নামেও অভিহিত করা হয়।
রাজা রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, রোনাল্ড রস, সুভাষচন্দ্র বসু, মাদার তেরেসা, সত্যজিৎ রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, সি ভি রামন, অমর্ত্য সেন প্রমুখ বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বের কর্মভূমি কলকাতা মহানগরী তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য আজও বিশ্ববাসীর চোখে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত।
ভিসার জন্য আবেদন
বর্তমানে ভিসা আবেদন প্রকৃয়া পুরোপুরি অনলাইনে চলে যাওয়ায় ফরম জমা দেওয়ার সেই চরম ভোগান্তি একদমই নেই এখন। আবেদন প্রকৃয়া খুবই সোজা, দালাল বা অন্য কারো সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ভিসার জন্য আবেদন করতে হলে এখানে https://indianvisaonline.gov.in/visa ঢুকে নিদৃষ্ট ফর্ম পূরণ করে সাবমিট করতে হবে।
সফলভাবে সাবমিশন হলে আপনি সাবমিটেড ফর্মের একটা প্রিন্ট নিয়ে রাখুন। প্রিন্ট কপিটি আপনাকে নিজে গিয়ে ভিসা অফিসে জমা দিতে হবে। সাবমিশনের সাথে সাথেই আপনি জমা দেওয়ার সময় এবং তারিখ ফর্মের সাথেই পেয়ে যাবেন। সাধারণত অনলাইন সাবমিশনের ৫-৮ দিনের ভেতরেই এই তারিখ হয়ে থাকে। আবেদন পত্রে কোন ভুল হওয়া চলবে না, বিশেষত যে সকল তথ্য পাসপোর্টে দেওয়া আছে সেগুলো কোনভাবেই ভূল হতে পারবে না। তথ্যে ভুল থাকলে আবেদন পত্র সঙ্গে সঙ্গে ফেরত দেওয়া হয়।
আরেকটা বিষয়, কোন সীমান্ত দিয়ে পার হবেন এই কলামে যদি শুধু বাই হরিদাসপুর (বেনাপোলের ওখানে ভারতীয় সীমান্তের নাম) লিখেন, তাহলে আপনাকে এই সীমান্ত দিয়েই ঢুকতে এবং ফিরতে হবে। কিন্তু আপনি যদি বাই হরিদাসপুর/এয়ার লিখেন, তাহলে বেনাপোল দিয়ে যাওয়া আসার সুবিধার সাথে সাথে এয়ারে যাওয়া/আসার সুবিধাও পাবেন। আর ভিসা অফিস থেকে মাঝে মধ্যে ফোন করে, তাই মোবাইল ফোন নাম্বারটা আপনার নিজের হলেই ভাল।
আবেদন পত্র জমা
আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপিতে উল্লেখিত দিনে আবেদনপত্র ভারতীয় ভিসা অফিসে নিজে গিয়ে জমা দিতে হবে। ভারতীয় ভিসা অফিসটা গুলশান ১ থেকে শ্যুটিং ক্লাবের দিকের রাস্তায় কেএফসি’র পেছনে। হার্ড কপি জমাদানের সময় যেটাই দেওয়া থাকুক না কেন, নিদৃষ্ট দিনে একটু সকাল সকাল চলে আসবেন। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে জমা নেওয়া শুরু হয়। ভিসা অফিসে ঢোকার সময়ে আপনাকে একটা টোকেন নাম্বার দেওয়া হবে। এরপর এই নাম্বার অনুযায়ীই সব হবে। তারপর ফর্ম জমা দিয়ে জমা রশিদ নিয়ে আসুন। ভিসা হোক বা না হোক, ট্যুরিস্ট ভিসার ক্ষেত্রে সাধারণত জমা দেওয়ার ২দিন পরই পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়। ভিসা আবেদন ফর্ম এবং পাসপোর্ট জমা দেওয়ার সময় ৪০০ টাকা ফি হিসাবে ভিসা সেন্টারেই জমা দিতে হয়। জমা দেওয়ার সময় কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে।
১. আবেদনপত্রের নিদৃষ্ট স্থানে ১কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি আঠা দিয়ে আটকে দিন। তার ঠিক নিচে এবং দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় স্বাক্ষর দিতে হবে।
২. স্বাক্ষর পাসপোর্টে দেওয়া স্বাক্ষরের মত হতে হবে। তবে স্বাক্ষর অতটা গুরুত্বপূূর্ণ না, একটু আধটু না মিললেও সমস্যা নেই।
৩. নাগরিকত্ব সনদ (চেয়ারম্যান বা কমিশনারের), ন্যাশনাল আইডি কার্ড, স্থানীয় ঠিকানার সমর্থনে ফোন/ওয়াসা বা বিদ্যুৎ বিল, ডলার এনডোর্সমেন্ট সার্টিফিকেট, পেশার সমর্থনে অফিস/শিক্ষা প্রতিষ্ঠান/ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেট জমা দিতে হবে।
সব পেপারের অরিজিনাল কপি এবং এবং একসেট ফটোকপি দিতে হবে। শুধু ন্যাশনাল আইডির
২টি ফটোকপি হলেই চলবে। অরিজিনাল কপিগুলো আপনি ভিসার সাথে ফেরত পাবেন। কোন ফটোকপিই এ্যাটাস্টেড লাগবে না।
৪. আপনার ফ্যামিলির অন্য যে কোন সদস্যর ফর্ম আপনি জমা দিতে এবং নিতে পারবেন, সেক্ষেত্রে শুধু আপনার পাসপোর্ট/ন্যাশনাল আইডি দেখাতে হবে। অন্য কারোটা নিতে হলে অথরাইজেশন লেটার লাগবে।
৫. ভিসা সেন্টারের ভেতরে ফটোকপি করার সুবিধা আছে।
৬. ভিসা অফিসের ভেতরে কোন ব্যাগ নিয়ে ঢোকা যায় না এবং গেটে এগুলো রাখারও কোন ব্যবস্থা নেই। তাই সাথে ব্যাগ ট্যাগ না আনাই ভাল।
৭. পার্সপোর্ট এবং ভিসা ব্যতীত আপনার ১দিনের বাচ্চাকেও সাথে নিতে পারবেন না। ওদের জন্য আলাদা ভিসা লাগবে।
৮. ফর্মে “বিদেশে অবস্থানের ঠিকানা” নামে একটা ঘর আছে, এটা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। জানা শোনা একটা হোটেলের ঠিকানা বা পরিচিত যে কোন ঠিকানা দিয়ে দিন।
৯. ট্যুরিস্ট ভিসার জন্য মিনিমাম ১৫০ ডলার এন্ডোর্স করাতে হয়। ভিসা অফিসে আপনার ডলার চেক করবে না, শুধু সার্টিফিকেটটাই দেখবে। তাই ডলার আপনি যেখান থেকেই সংগ্রহ করুন না কেন সার্টিফিকেটটা ব্যাংক বা সরকার অনুমোদিত মানি চেঞ্জার থেকেই সংগ্রহ করুন।
অন্য কোনখান থেকে সার্টিফিকেট নিলে আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
এবার ফর্ম জমা দিয়ে ফেরত নেয়ার তারিখ এবং সময়ের সিøপ নিয়ে চলে আসুন।
ভিসা অফিসে শুধু ফর্ম জমা নেয়। কোন ইন্টারভিউ হয় না, সুতরাং ভীত হওয়ার কিছু নেই। যদি আপনার আবেদনপত্রের সাথে দেওয়া তথ্যে সন্দেহজনক কিছু না থাকে তাহলে আশা করা যায় আপনি এমনিতেই ভিসা পেয়ে যাবেন। আর তা না হলে আপনাকে ইন্টারভিউএর জন্য ডাকতে পারে। তবে ভিসা অফিসের আশে পাশে ঘুরঘুর করা দালালচক্রের যোগসাজসের কারণে একসঙ্গে জমা দেওয়া অনেকগুলো আবেদনপত্রের ভেতরে দু’একটা বাদ হয়ে যেতে দেখা যায়। যেমন, আপনি আপনার স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ ভিসার আবেদন করলেন, দেখা গেল আপনি ছাড়া বাকিদের ভিসা হয়েছে। এখন আপনাকে ছাড়াতো আর আপনার পরিবারের সদস্যরা যেতে পারবেনা, এদিকে আপনি এয়ারে টিকেটও করে ফেলেছেন, ফেরত দিতে গেলে ২৮ হাজার টাকা গচ্চা।
সুতরাং আপনাকে যেতেই হবে। সমস্যা নেই, এই পরিস্থিতিতে আশে পাশে দালালচক্রের কাউকে না কাউকে পেয়ে যাবেনই। ৬ থেকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে আপনার ভিসা করিয়ে দেবে সে..... এই ভিসা অফিস-দালাল-হাজার দশেক টাকা, এই চক্রের মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে বলে আমার মনে হয়। তবে এসব না ভেবে পজেটিভ চিন্তা করাই ভাল।
পাসপোর্ট ফেরত নেওয়া
আবেদনপত্র জমা দেয়ার সাথে সাথেই আপনাকে পাসপোর্ট ফেরত দেওয়ার দিন ও সময় উল্লেখ করে একটা সিøপ দেয়া হবে। ওই দিনও একইভাবে সময়ের একটু আগে চলে আসুন।
আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতেই পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়। পার্সপোট হাতে পেলে নিদৃষ্ট পৃষ্ঠায় ভিসা স্টিকার মারা আছে কি না দেখে নিন। এবার আপনি ভারত যাবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করুন। ১ মাস বা তিন মাস, যে ক’দিনের জন্যেই ভিসা হোক না কেন, মনে রাখবেন সময়টা শুরু হবে আপনার ভারতে প্রবেশের পর থেকে।
ঢাকা টু বেনাপোল
নব্বুই দশকের শেষ দিকে এসে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বেনাপোল সীমান্ত হয়ে কলকাতার সাথে বাস চলাচল শুরু হলে বাংলাদেশিদের জন্য ভারত যাতায়াতের সহজ রাস্তা খুলে যায়।
ভারতের বিভিন্ন যায়গায় থাকা আত্মীয়দের সাথে সাক্ষাৎ, স্রেফ ভ্রমণ এবং ভারতীয় চিকিৎসাসেবার জন্য বাংলাদেশীদের আগ্রহের জন্যই বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে পড়ে ভারত বাংলাদেশের মধ্যকার ব্যস্ততম সীমান্ত পথ। গড়ে হাজার খানেক বাংলাদেশি প্রতিদিন এই সিমান্ত দিয়ে ভারতে যাচ্ছে।
টিকেটিং
ভিসা পেয়ে গেলে সোজা গিয়ে টিকেট করে ফেলুন। তিনভাবে টিকেট করা যায়।
প্রথমত বিআরটিসি-শ্যামলী যৌথ উদ্যোগ অথবা ইন্ডিয়ান সৌহার্দ’র টিকেট করলে সরাসরি কলকাতা পৌঁছুতে পারবেন। বাস থেকে কোথাও নামতেও হবে না।
এমিগ্রেশনেও ঝামেলা কম হয়। তবে আমাদের এবং ওদের এই দুই তরফে বেনাপোল আর পেট্রাপোলে দুইবারে লাগেজসহ পুরো বাস চেকআপ শেষ হতে যে সময় নেয় ততক্ষণে আপনি কলকাতা পৌঁছে চান করে হালকা ঘুম দিয়ে নিতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত সোহাগ, শ্যামলী, গ্রিন লাইন এবং সৌদিয়া-এস আলমের দুই ভাগে সরাসরি টিকেট পাওয়া যায়। এরা বেনাপোলে নামিয়ে দিয়ে আপনার কপালে একটা স্টিকার লাগিয়ে দিবে। ওপারে আপনার স্টিকার দেখে নিদৃষ্ট বাস সার্ভিস আপনাকে ডেকে নেবে।
এক্ষেত্রেও এমিগ্রেশনে সামান্য চার্জের বিনিময়ে সুপারভাইজার কিছুটা সাহায্য করে থাকে, যদিও বেশিরভাগে হ্যাপা আপনাকেই সইতে হবে।
তৃতীয়ত যেকোনভাবে বেনাপোল পৌঁছে এমিগ্রেশন ফেস করে ওপারে গিয়ে আবার নিজ দায়িত্বে কলকাতা যাওয়া। এক্ষেত্রে এমিগ্রেশন, ওপারে গিয়ে ট্রান্সপোর্ট খুঁজে নেওয়া, সব ঝামেলা আপনাকেই নিতে হবে।
তবে খরচ অনেক কম। কলকাতা পর্যন্ত এই তিন ধরণের যাতায়াত ব্যবস্থাতেই মোটামুটিভাবে ১০০০-২০০০ টাকা খরচ হবে।
বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন
যাবার সময় বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীদের জন্য অলমোস্ট কোন ঝামেলা নেই। এমিগ্রেশন অফিসের সাথেই সোনালী ব্যাংকের একটা কাউন্টার আছে, শুক্রবারেও খোলা থাকে। ওখানে বন্দর শুল্ক হিসেবে পাসপোর্ট প্রতি ৩০০ টাকা জমা দিয়ে রশিদ নিয়ে নিন। তবে জমা রশিদের বাইরে ২০ টাকা করে দিতে হবে ফাউ। কোন কিছু বলে লাভ নেই। তারপর এমবার্কেশন কার্ড পূরণ করতে হবে। এখানেই প্রচুর সাহায্যকারী পাবেন লিখে দেওয়ার জন্য। পাঁচ, দশ, পনের বিশ, পঞ্চাশ বা একশ, যার কাছ থেকে যা পারে এরা এভাবে চার্জ নিয়ে থাকে। ফর্ম আপনি নিজেও লিখতে পারেন। ঢাকাতেও বাসের টিকেট কাউন্টারেই এমবার্কেশন ফর্ম পাবেন। ফর্মে বিদেশে অবস্থানের ঠিকানা নামে একটা ঘর আছে, কোন চিন্তা না করেই জানা একটা হোটেলের ঠিকানা বা পরিচিত যে কোন ঠিকানা দিয়ে দিন। এবার পূরণ করা ফর্মটা এমিগ্রেশনের ভেতরে জমা দিতে হবে। ফর্মের নিচের অংশটুকু অফিসার ফেরত দেবে। এটা সঙ্গেই রাখুন যত্নের সাথে। আবার বাংলাদেশে ফেরার সময়ে এটা লাগবে। অফিসার পাসপোর্ট ফেরত দিলে ডিপারচার সিল, তারিখ এবং স্বাক্ষর মিলিয়ে নিন। এবার বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে ঢুকে পড়ুন ভারতীয় সীমান্তে।
ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন
এমিগ্রেশনে আপনার মূল কাজ হল একটা এরাইভাল কার্ড পূরণ করে জমা দিয়ে পাসপোর্টে এরাইভাল সিল ও স্বাক্ষর নেয়া। ইন্ডিয়ায় ঢোকার সময়ে বাংলাদেশ এমিগ্রেশনে লাগেজ চেক করে না। আর এপারে খুব গুরুত্ব না দিলেও লাগেজ চেকিং হয়। কিন্তু ইন্ডিয়ান এমিগ্রেশনে ঢোকার মুখে অন্য ধরণের অভ্যর্থনার মুখোমুখি হবেন আপনি। এ্যারাইভাল ফর্ম পূরণ করে লাগেজ চেকিংয়ের হাত থেকে বাঁচাতে দালালরা আপনাকে প্রতিযোগিতা করে এমনভাবে ডাকাডাকি করতে থাকবে যে আপনার মনে হতে পারে এমিগ্রেশনের মধ্যে না জানি কোন্ কেয়ামত হয়। মূলত এখানকার দালালদের মূল ব্যবসা হল মানি এক্সচেঞ্জ। এরা যে কোন ভাবে হোক আপনাকে পেট্রাপোল বাজারে থাকা তাদের মানি চেঞ্জিং সেন্টারে নিয়ে যাবে এবং ডলার এক্সচেঞ্জ করার জন্য চাপাচাপি করবে। নতুন যায়গা হিসেবে আর আপনার মানসিক স্ট্রেংথ যদি খুব বেশি না হয়, তাহলে এমিগ্রেশনে দালালের সাহায্য নেওয়ায় ভালো। ইন্ডিয়ান এমিগ্রেশনের অফিসারগুলো সাংঘাতিক খতরনাক। সব কিছু ঠিক থাকলেও অহেতুক ঝামেলা করে। দালালকে কিছু টাকা দিলে এই ঝামেলা থেকে বেঁচে যাবেন, এমনকি আপনার লাগেজও চেকিং ছাড়াই পার হয়ে যাবে। এমিগ্রেশনে পার হেড ৪০ রুপি দিতে হয় অফিসিয়াল খরচ হিসেবে। যদিও এটার ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই।
ইন্ডিয়ায় যেতে সাথে কি ধরণের এবং কি পরিমাণ কারেন্সি নেওয়া যাবে এ নিয়ে কিছূটা অনিশ্চয়তা থাকে। বিভিন্ন কথা শোনা যায়। অভিজ্ঞতা হল-
১. সাথে বাংলাদেশি কারেন্সি থাকলে এপার ওপার কোথাওই সমস্যা নেই। বরং সাথে ১০, ২০, ৫০ টাকার নোটে কিছু বাংলাদেশি কারেন্সি রাখা ভালো, ফেরার সময়ে প্রয়োজন হয় খুব। হয়ত যেখানে ১০ টাকা দিলে কাজ হয়ে যেত, সেখানে খুচরা নোটের অভাবে ১০০ টাকা দিতে হবে বাধ্য হবেন।
২. আপনি ঢাকা থেকেই হাজার খানেক ইন্ডিয়ান রুপি সাথে নিয়ে নিন। সাবধানতার জন্য লুকিয়েই নিন, বা গ্রুপে অনেকে থাকলে সবার কাছে ২০০, ৪০০ করে ভাগ করে রাখুন। আমার মনে হয় না কোন সমস্যা হবে। তারপরেও ধরা পড়লে গ্রহণযোগ্য একটা ব্যাখ্য দিলেই হবে।
বেনাপোলে এক্সচেঞ্জ হাউজ আছে। আপনি টাকা বদলে রুপি বা ডলার বদলে রুপি নিতে পারেন। তবে আমি সীমান্ত এলাকায় কোন ধরণেরই এক্সচেঞ্জ না করার পরামর্শ দেব। ঠকে যাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।
৩. ডলার। মোস্ট ইমপর্টেন্ট কেস। সাধারণত ট্যুরিস্ট ভিসার জন্য ১৫০ ডলার এনডোর্স করতে হয়। বেশি এনডোর্স করলে কোন সমস্যা নেই, তবে পরিমান সন্দেহজনক হলে ভিসা অফিসেই ডাকতে পারে।
আমি বলব, এনডোর্সমেন্টের বাইরেও আপনি সাথে বেশি কিছু ডলার নিয়ে নিন। কারণ ফেরত আসার সময়ে ইমিগ্রেশন আপনার পার্সপোর্টে এনডোর্সমেন্টের পরিমাণ এবং ইন্ডিয়ায় ডলার এক্সচেঞ্জের সার্টিফিকেট মিলিয়ে দেখবে। খরচ না হওয়া ডলার এরা ফেরত আনতে দিতে চায় না।
অনেক সময় জোর করে রেখে দেয়। এনডোর্সমেন্টের বাইরে হলে এই সমস্যা নেই। তবে যেহেতু এনডোর্সমেন্টের বাইরে ডলার নেওয়া আইনসিদ্ধ নয়, লুকিয়ে নিন। কিভাবে লুকাবেন সেটা আপনার বিষয়। দয়া করে জুতার ভেতরে, মোজার মধ্যে বা আন্ডার গার্মেন্টস এর ভেতরে রাখবেন না, চেকিং-এ এটা খুব কমন যায়গা।
তবে ইন্ডিয়ান এমিগ্রেশনে সাথে রোগী, অতি বয়স্ক কেউ থাকলে ওরা যথেষ্ঠ নমনীয় ব্যবহার দেখায়, অনেক সময় চেকিংও হয় না। আমাদের এমিগ্রেশনে আবার এসব নেই, সবার সম অধিকার।
সীমান্তের খাদক শ্রেণী
আগেই ওপারের দালাল শ্রেণীর কথা বলেছি। ট্যুরিস্টদের জন্য এরা সাহায্যকারী অবশ্যই। তবে তার চেয়ে বেশি আতংক সৃষ্টিকারী। এমিগ্রেশনে ঢোকার মুখেই ৫ টাকা বা ১০ টাকার বিনিময়ে এমিগ্রেশন পার করিয়ে দেওয়ার কথা বলে আপনার পার্সপোর্ট নিয়ে নেবে। আর একবার পাসপোর্ট আপনার হাতছাড়া হল তো আপনি এদের খপ্পড়ে পড়ে গেলেন। এদের সাথে এমিগ্রেশন অফিসারদের যোগসাজস আছে, তাই আপনার কোন কিছুই করতে হবে না। দালাল চক্রের কেউ একজন আপনাকে পেট্রাপোল বাজারে তাদের মানি এক্সচেঞ্জ অফিসে নিয়ে বসাবে। এরপর দেখা যাবে আপনি একখানে, আপনার লাগেজ এবং পাসপোর্টের কোন হদিস নেই। অন্য একটা দেশের ভুখন্ডে আপনি পাসপোর্ট ছাড়া, লাগেজ ছাড়া। এরচেয়ে আতংকজনক পরিস্থিতি আর কিছুই হতে পারে না। এরকম পরিস্থিতিতে আপনার সবকিছু খুইয়ে ফেলাও বিচিত্র কিছু নয়। তবে সচারচর পুরো লাগেজ বা পাসপোর্ট হাওয়া হয়ে যায় না। বিজনেস এথিকস হবে হয়ত। তাই আপনি আপনার সবকিছুই ফেরত পাবেন। তবে আপনাকে এদের কাছ থেকে ডলার ভাঙাতে হবে। বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে এরা কম রেটে আপনার ডলার এক্সচেঞ্জ করবে। দেখা যায়, কলকাতার চেয়ে এখানে ২-৩ রুপি কম দেয়।এটা অনেক। ধরুণ আপনি ১০০ ডলার বদলে পেলেন ৪২০০ রুপি, যেটা কলকাতাতে পেতেন ৪৪৫০ রুপি। ২৫০ রুপি বা প্রায় ৫০০ টাকা নিট লস। এটাই হল এই দালালদের মূল ব্যবসা। আর কোনভাবে যদি কিছু আদায় করা যায়, সেটা উপরি। যেমন ৫ বা ১০ টাকায় যে এমিগ্রেশন পার করিয়ে দেওয়ার কথা ছিল, সেটা গিয়ে দাড়াবে ১০০-১৫০ টাকায়।
তারপর এরা প্রায় জোর করে আপনাকে বনগাঁ স্টেশনে গিয়ে রেলে করে কলকাতা যাওয়ার অটোতে তুলে দিতে চাইবে। সেখানে অটোতে অতি অবশ্যই বেশি ভাড়া হবে এবং নিশ্চিতভাবেই এর একটা ভাগ তারা পাবে। তারপর সেই অটো বনগাঁ স্টেশনে দাড়ালে আবার নিশ্চয় কোন ভদ্রলোক এসে জোর করে সাহায্য করতে চাইবে। অতএব মানে মানে করে যত দ্রুত এদের হাত থেকে মুক্ত হতে পারবেন, আপনার পকেট থেকে তত কম খসবে। কিভাবে মুক্ত হবেন, সেটা আপনার মানসিক শক্তি এবং বুদ্ধিমত্তাই বলে দেবে। ভাল হয়, এপারে সীমানায় পরিচিত কেউ থাকলে তার মাধ্যমে ওপারের একজন দালাল কন্ট্রাক্ট করে নেওয়া। তাতে টাকা খসলেও অন্তত মানসিক অস্থিরতা থেকে মুক্ত থাকবেন।
পেট্রাপোল থেকে কলকাতা
বেনাপোল থেকে কলকাতা মাত্র ৮৪ কিলোমিটার। কিন্তু অপ্রশস্ত হাইওয়ে, অসংখ্য বাজার আর ইন্ডিয়ার নিজেদের তৈরী বাসের কারনে সময় লাগে প্রায় ৪-৫ ঘন্টা এবং বাসও ঘন্টা, দেড় ঘন্টা পরপর থাকে। পক্ষান্তরে রিকশা বা অটোতে বনগাঁ স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরতে পারলে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘন্টা এবং খরচও কম। তবুও আমার মতে, পেট্রাপোল থেকে সরাসরি বাসে চলে যাওয়াই ভাল। এখানে সোহাগ, গ্রিন লাইন এবং শ্যামলী’র কাউন্টার আছে। ২৬০ রুপি ভাড়া। এগুলোর একটাতে ঢুকে অপেক্ষা করতে থাকুন। এখানে অনেক বাংলাদেশিকে পাবেন। একটা দেশি দেশি ভাব আছে, সাথে দালালদের হাত থেকে মুক্ত হতে পারলেন।
এবার বাস আসলে আপনি উঠে বসুন। ও, এখান থেকে টিকেট নিলে কোন সিট নাম্বার দেয় না, এমনকি কোন কোন সময় টিকেটও দেয় না। হাতে লেখা একটা কাগজ দেয়। চিন্তার কিছু নেই। ওই কাগজ সুপারভাইজারকে দেখালেই হবে আর বাস খালিই থাকে, সিট পাবেন। যদি না পান, আরেকটু অপেক্ষা করে পরের বাসে যান। চার থেকে পাঁচ ঘন্টা পরেই আপনি পৌঁছে গেলেন কলকাতার মারকুইস স্ট্রিট-এ। ঢাকা-কলকাতা রুটের সব বাস এখানেই থামে।
পেট্রাপোল থেকে যাত্রা শুরুর ঘন্টা দুই পরে রাস্তার মাঝে এক হোটেলে বাসগুলো ২০ মিনিটের একটা ব্রেক দেয়। আর যদি ট্রেনে যান, তাহলে আপনাকে নামতে হবে শিয়ালদা স্টেশনে। এখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে যেকোন যায়গায় যেতে পারবেন।
এখানে দুটো বিষয় বলে রাখা ভালো।
১. ইন্ডিয়ায় ঢুকে প্রথমেই আপনার ঘড়ির সময় আধাঘন্টা পিছিয়ে নিন।
২. যদি আপনার একান্তই টাকা বা ডলার বদলে রুপি নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তাহলে আপনার জন্য ভালো হবে ওপরের তিন বাসের কাউন্টারে আসা। এরা তুলনামূলকভাবে রিজনেবল রেট দেয়।
৩. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল- পুরো পশ্চিমবঙ্গে লোকজন রুপিকে টাকা বলে। পরিচিত শব্দ হওয়াতে আমরা বাংলাদেশিরা অধিকাংশ সময়েই রুপি এবং টাকার পার্থক্যটা ঠিক মনে রাখতে পারি না।
ফলস্বরূপ প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা খরচ হয়ে যায়। যেমন ধরুণ এক বোতল পানি, যেটা আমরা কিনি ১০ টাকা দিয়ে, ইন্ডিয়াতে সেটা ১৪ টাকা। আমরা যেহেতু বাইবর্ন খরুচে স্বভাবের, তাই ৪ টাকা বেশি দিয়ে পানির বোতল কিনতে আমাদের কোন সমস্যা হয় না।
কিন্ত এই ১৪ টাকা যে আসলে প্রায় ২৫ টাকা, সেই বোধটা আমাদের মাথায় থাকে না একদমই। ফলে খরচও বাড়ে হুহু করে। একইভাবে যে আপেল আমাদের এখানে ১০০-১২০ টাকা কেজি, সেই একই আপেল ওখানে ১২০-১৪০ টাকা কেজি। মনে রাখতে হবে এই ১২০-১৪০ টাকা মানে আসলে ২০০-২৫০ টাকা। তাই একটু সাবধান থাকলে আপনার খরচ বাঁচার পাশাপাশি দেশের মূল্যবান ফরেন কারেন্সিও বাঁচে।
হোটেল বুকিং
মারকুইস স্ট্রিটে নেমে আপনার প্রথম কাজ হবে হোটেল খুঁজে নেওয়া। পুরো মারকুইস স্ট্রিট এবং পার্ক স্ট্রিট জুড়ে অসংখ্য চলনসই হোটেল আছে। পেট্রাপোল (ওরা বলে, বর্ডার) থেকে আসা বাসগুলো যেখানে থামে সেখানে দাড়িয়ে আশেপাশে তাকালেই এর অনেকগুলো চোখে পড়বে।
এসি, নন এসি, সব ধরণের রুমই আছে। সাধারণত ৫০০ থেকে ১০০০ এর ভেতরে ভাড়া। আরো বেশি ভাড়ার ভালো হোটেলও আছে। প্রথম দিনে আপনি পছন্দসই হোটেল নাও পেতে পারেন।
প্রথম দিনের জন্য আপনি বরং সবচে কাছের হোটেল সম্রাট বা হোটেল ২১ এ উঠুন, পরদিন খুঁজে নিতে পারবেন আপনার সাধ ও সাধ্যের মধ্যে থাকা হোটেলগুলো। তারপর একটা মোবাইল ফোনের সিম কিনে নিন। ১৫০ টাকা মত লাগবে, সাথে দুই কপি ছবি এবং পাসপোর্টের নিদৃষ্ট কিছু পাতার ফটোকপি। এখানে একটা বিষয় বলা উচিৎ। ভারত আমাদের বৃহত্তম প্রতিবেশি হওয়ায়, অনেক ক্ষেত্রে সুযোগ সুবিধা বেশি হওয়ায় এবং বাংলাদেশিদের বিদেশপ্রীতি আর খরচের বহর দেখে বাংলাদেশিরা এখন ভারতীয়দের কাছে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দুধেল গাভীর মত হয়ে গেছে। কর্পোরেট সার্ভিসগুলোতে বাংলাদেশিদের এরা খুবই খাতির করে। শুধুমাত্র বাংলাদেশিদের এন্টারটেইন করার জন্য এখানকার প্রায় সব সেলফোন অপারেটরেরই বাংলাদেশ প্যাকেজ আছে। এইসব প্যাকেজের ফোন থেকে বাংলাদেশে যত কম খরচে কথা বলা যায়, ভারতের অন্যান্যা রাজ্যে তা যায় না। ভাবার কোন কারণ নেই যে, এটা আমরা যেমন বিদেশি দেখলে গলে গিয়ে কিছু একটা করে বর্তে যাই সেরকম কিছু, বরং এর সবটার পেছনেই টাকা। এইসব প্যাকেজের সিম কার্ডের প্যাকেটে থাকে বাংলাদেশের বিভিন্ন ছবি। আবেগতারিত হয়ে আমরা সেইসব ছবি দেখে আপ্লুত হয়ে সাট সাট করে দেশে ফোন করি আর রেভিনিউটা চলে যায় ইন্ডিয়াতে।
পার্ক স্ট্রিট এলাকাটা কলকাতা নিউ মার্কেটের (ওরা বলে, মার্কেট) পাশেই। যায়গাটা একটু ঘিঞ্জি। তবে আপনি যদি কলকাতাতে ট্যুরের জন্য এসে থাকেন বা চেন্নাই-ভেলোর-মাদ্রাজ-হায়দ্রাবাদ যাওয়ার ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতে চান এবং এখানে আপনার পরিচিত কেউ যদি না থাকে, তাহলে থাকার জন্য এই এলাকাই ভালো। বাংলাদেশ বাংলাদেশ গন্ধ লেগে আছে। খেতে ঢুকলে বা রাস্তাতে নোয়াখালি, চাটগাঁ, রংপুর, পুরান ঢাকা, সব ল্যাংগুয়েজই শুনতে পাবেন। মুসলিম প্রধান এলাকা হওয়ায় মুসলিম হোটেলও আছে একাধিক। কলকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাই কমিশন এখানে। সোনালী ব্যাংকের একটা শাখাও রয়েছে পার্ক স্ট্রিটের ওয়ান্ডারল্যান্ডের পাশে, পার্ক ম্যানসনে। পার্ক স্ট্রিট থেকে কলকাতার দর্শনীয় স্থানগুলোও থাকবে আপনার নাগালের ভেতরে। ট্যাক্সি, বা রুট নাম্বার জেনে নিতে পারলে ট্রাম ও পাবলিক বাস ব্যবহার করতে পারবেন সহজেই।
আর যদি চিকিৎসার জন্য আসেন, সেক্ষেত্রে সেন্ট্রাল কলকাতায় না থেকে বাই পাস বা মুকুন্দপুর-সন্তোষপুরের আশেপাশে থাকাই ভালো। হসপিটালগুলোর বেশিরভাগ এ এলাকাতেই। আর থাকার খরচও কম।
কিছু টিপস-
*মারকুইস স্ট্রিট থেকে দর্শনীয় স্থানগুলো-
# নিউ মার্কেট- হাটা পথের দূরত্ব। আমাদের গাওসিয়া, চাঁদনি চক, ধানমন্ডি হকার্স, নিউমার্কেট, নিলক্ষেত, বাবুপুরা এবং গাউসুল আজম মার্কেট এর মিলিত আয়তনের সমান হবে, আর চরিত্রে কোন পার্থক্য নেই। সেই একই ভিড়।
# ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম- হাটা পথের দূরত্ব।
# ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল- ২ কিমি। ইন্ডিয়ার ইতিহাস এখানে সচিত্র সংরক্ষণ করা আছে।
# বিড়লা প্লানেটোরিয়াম- ২ কিমি। আমাদের ভাসানি নভো থিয়েটার।
# সায়েন্স সিটি- ৭ কিমি। বাচ্চা কাচ্চাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক।
# নিক্কো পার্ক- ১২ কিমি। মিরপুরের বোটানিকাল গার্ডেন।
# বিড়লা মন্দির-৪ কি.মি.
# ইডেন গার্ডেন- ২ কিমি
# রেসকোর্স (ওরা বলে, ময়দান)- ২ কি.মি.
# কফি হাউজ- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে। মধুর ক্যান্টিনের মত গেলেই ধাক্কা খেতে হয়। মান্নাদে’র গানে ছাড়া কলকাতার আমজনতা এর নাম জানে না।
# এ্যকোয়াটিকা- ১৫ কিমি। সমূদ্রতলদেশের একটা ডামি করার চেষ্টা করা হয়েছে।
# হাওড়া ব্রিজ, শিয়ালদহ এবং মহাকরণও রাখতে পারেন তালিকায়।
* মেট্রো রেলে একটা ট্রিপ দিতে পারেন। এখানে মনে রাখতে হবে, ইন্ডিয়ানরা মেট্রো স্টেশনে ঢোকার সাথে সাথে চরিত্র বদলে ফেলে। এর ভেতরে এরা সুশৃংখল, নিয়মানুবর্তি এবং সৎ।
*কলকাতাতে ঘুরতে গেলে গ্রুপে যাওয়াই ভালো। অনেক দিক দিয়ে সাশ্রয় হবে।
*সাধারণত ট্যাক্সি ড্রাইভাররা ধান্ধাবাজি করেনা। তবুও আগে ভাগে বলে নেওয়াই ভালো। মিটার এবং রিজার্ভ, দু’ভাবেই যাওয়া যায়। মিটারে গেলে যা বিল আসে তার ডাবল দিতে হয়। এখানে মিটার থেকে বিল পেপার প্রিন্ট হয়ে আসে।
*সারা ইন্ডিয়াতেই সরকারি দর্শনীয় স্থানগুলোতে ইন্ডিয়ান এবং নন ইন্ডিয়ান টিকেটের মূল্য দুই রকম। যেমন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে ইন্ডিয়ানদের জন্য ১০ রুপি এবং নন ইন্ডিয়ানদের জন্য ১৫০ রুপি। অনেক পার্থক্য। কিছু হিন্দি জানা থাকলে বা সাথে কোন ইন্ডিয়ান থাকলে এক্ষেত্রে সুবিধা পাবেন।
* আর যদি চিকিৎসার জন্যে দূরে কোথাও যাবার প্লান থাকে, তাহলে দেরি না করে ট্রেনের টিকেট বুক করে ফেলুন। স্টেশনে গিয়ে নিজেই করতে পারেন। বিদেশিদের জন্য আলাদা কাউন্টার আছে। ইন্ডিয়ার ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেমের মূল চালিকা শক্তি হলো রেল।
তাই এদের রেল ব্যবস্থা অতি উন্নত না হলেও সিস্টেমেটিক। সমস্যা হওয়ার কথা না। তারপরও বাসের কাউন্টারে নেমে হেলপ নিতে পারেন।
*কলকাতা থেকে কেনাকাটা না করাই ভাল। আমাদের দেশের চেয়ে বিশেষ উন্নত কিছু পাওয়া যায় না, তাছাড়া দামও বেশি (বাক্তিগত পরামর্শ)।
# কলকাতায় যখন ডলার ভাংগাবেন, তখন অবশ্য অবশ্যই ডলার ভাংগানোর মানি রিসিপট নেবেন। তা না হলে বর্ডারে বিপদে পড়তে পারেন।
ফিরতি বেলা
ফেরার সময়ে শুধু একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, ইন্ডিয়ান সময় ৫টায় বর্ডার বন্ধ হয়ে যায়। সেভাবে সময় নিয়েই আসবেন। আসার সময়ে দু’পাশের কাস্টমসেই বেশ ঝামেলা করে, বিশেষ করে বাংলাদেশ কাস্টমসে। উপরওয়ালা দিয়ে ফোন না করিয়ে, বা টাকা না দিলে আপনার ব্যবহৃত ব্যক্তিগত ডিওডোরান্টটাও রেখে দিতে পারে। আবার টাকা দিলে লাগেজ চেকও হয় না।
ইন্ডিয়ান কাস্টমসে সাধারণত ডলার থাকলে ফেরত দিতে চায় না। ডলার ভাঙানোর সার্টিফিকেটের সাথে এন্ডোর্স করা ডলারের পরিমাণ মিলিয়ে দেখে। তবে, কাস্টমস এ ব্যাপারে যতটা না তৎপর, পেট্রাপোল বাজারের প্রতিটা মানুষ আরো বেশি তৎপর। বিভিন্ন কথা বলে আপনাকে আতংকিত করে ফেলবে এবং আপনার সাথে ফেরত আসা ডলার এক্সচেঞ্জ করানোর জন্য চেষ্টা করবে। এসব ব্যাপারে বাসের সুপারভাইজারের সাহায্য নিতে পারেন। আর এমিগ্রেশনে ঢোকার মুখে দাড়িয়ে থাকা কুলিদের সাহায্য নিলে লাগেজ চেকিংয়ের ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে পারেন। সব শেষ করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ুন, দেখবেন বুকের ভেতরে কেমন নতুন এক শক্তি এসে ভর করবে। নিজের দেশ বলে কথা।
(সংগৃহীত)
Follow Us:
Facebook:
https://www.fb.com/voyagerbangladesh
OR
https://www.fb.com/VoyagerBangladeshbd
Twitter: https://twitter.com/totravelbd
Web: www.voyagerbangladesh.com
Blog:http://voyagerbangladesh.blogspot.com