08/07/2026
সমুদ্র পথে হজ্জযাত্রা,,
চট্টগ্রাম বন্দর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের মুসলমানদের হজযাত্রার অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মোগল আমল থেকে ব্রিটিশ শাসন এবং পরবর্তী পাকিস্তান আমল পর্যন্ত বাংলা, আসাম, সিলেট, ত্রিপুরা, কাছার ও পার্বত্য অঞ্চলের হাজার হাজার মুসলমান প্রতিবছর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জেদ্দাগামী জাহাজে চড়ে পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতেন। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে হজযাত্রা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে কয়েক শতাব্দীব্যাপী এই গৌরবময় ঐতিহ্যের অবসান ঘটে।
ব্রিটিশ শাসনামলে চট্টগ্রাম বন্দর, কলকাতা, করাচি ও মুম্বাইয়ের পাশাপাশি জেদ্দাগামী হজযাত্রার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। হজ মৌসুম শুরুর কয়েক মাস আগে আরব থেকে আগত মোয়াল্লেমরা চট্টগ্রামে এসে সম্ভাব্য হজযাত্রী সংগ্রহ, কাফেলা গঠন এবং মক্কা, মিনা, আরাফাত, মুজদালিফা, জেদ্দা ও মদিনায় তাঁদের আবাসন, আহার, পরিবহন এবং ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার সার্বিক ব্যবস্থা করতেন। সরকারি তত্ত্বাবধান সীমিত থাকলেও এই সুসংগঠিত বেসরকারি ব্যবস্থাপনাই দীর্ঘকাল হজ পরিচালনার প্রধান ভিত্তি হিসেবে কার্যকর ছিল।
১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে হজ ব্যবস্থাপনায় নতুন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে। চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে প্রতিষ্ঠিত হজ ক্যাম্পে হজযাত্রীদের নিবন্ধন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টিকাদান, পাসপোর্ট ও ভ্রমণসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হতো। ১৯৪৮ সালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৩,৮৯৫ জন হজযাত্রী জেদ্দার উদ্দেশে যাত্রা করেন। দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আগত যাত্রীদের সুবিধার্থে বিশেষ ট্রেন ও স্টিমার সার্ভিসের ব্যবস্থা থাকত।
১৯৫০-এর দশকে বিমানযোগে হজযাত্রার সূচনা হলেও উচ্চ ব্যয়ের কারণে অধিকাংশ হজযাত্রী সমুদ্রপথকেই বেছে নিতেন। ব্রিটিশ মালিকানাধীন Empire Orwell ও Sirdhana, বোম্বে-ভিত্তিক মোগল শিপিং লাইন্সের Islami ও Muhammadi এবং পরবর্তীতে Safina-e-Arab নিয়মিতভাবে চট্টগ্রাম ও করাচি বন্দর থেকে জেদ্দায় হজযাত্রী পরিবহন করত। সমুদ্রপথে এই দীর্ঘ যাত্রা ছিল কষ্টসাধ্য, কিন্তু তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে এটিই ছিল সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মাধ্যম।
১৯৬০ সাল থেকে পাকিস্তান সরকারের প্যান ইসলামিক স্টিম শিপ কোম্পানির অধীনে হজযাত্রী পরিবহনে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠানটির ‘সফিনা-এ-আরব-১’, ‘সফিনা-এ-আরব-২’, ‘সফিনা-এ-মুরাদ’, ‘সফিনা-এ-হুজ্জাজ’ এবং ‘সফিনা-এ-আবিদ’ জাহাজ নিয়মিতভাবে চট্টগ্রাম ও করাচি বন্দর থেকে জেদ্দায় হজযাত্রী পরিবহন করত। এর পাশাপাশি ‘এমভি শামস’ চট্টগ্রাম ও করাচি বন্দরের মধ্যে নিয়মিত চলাচল করত। এসব জাহাজের মধ্যে ‘সফিনা-এ-হুজ্জাজ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; প্রায় চার হাজার যাত্রী বহনের সক্ষমতা নিয়ে এটি ছিল সে সময়ের অন্যতম বৃহৎ হজবাহী জাহাজ। হজ মৌসুম শেষ হলে এসব জাহাজ পণ্য পরিবহনেও ব্যবহৃত হতো।
১৯৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে জাহাজের তৃতীয় শ্রেণি বা ডেকে ভ্রমণের ভাড়া ছিল প্রায় ৪৫২ টাকা, যা তখনকার অধিকাংশ পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয়ের ফল। দ্বিতীয় শ্রেণির ভাড়া ছিল ৮৮২ টাকা এবং প্রথম শ্রেণির জন্য গুনতে হতো ১,২৫৭ টাকা। এর বাইরে স্যানিটেশন কর, স্থানীয় যানবাহন ব্যয় এবং বাড়িভাড়া বাবদ আরও ৮৪ টাকা ১২ পয়সা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হতো। ফলে হজযাত্রা ছিল শুধু ধর্মীয় নয়, একই সঙ্গে একটি বড় অর্থনৈতিক প্রস্তুতির বিষয়।
সমুদ্রপথে হজযাত্রার মূল্যবান সমকালীন দলিল হলো ১৯৫৪ সালে The Irish Times-এ প্রকাশিত “An Irishman's Diary on a Pilgrim Ship to Jeddah” শীর্ষক নিবন্ধ। এর লেখক Norman Freeman, যিনি British India Steam Navigation Company-এর Sirdhana জাহাজে কর্মরত ছিলেন। জেদ্দা থেকে প্রায় দেড় হাজার হজযাত্রীকে চট্টগ্রামে ফিরিয়ে আনার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার দুর্ভোগ, অসুস্থতা এবং একই সঙ্গে যাত্রীদের গভীর ধর্মবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক দৃঢ়তার এক অনন্য চিত্র অঙ্কন করেছেন।
ফ্রিম্যানের বর্ণনায় দেখা যায়, প্রতিদিন জাহাজে আজান ও জামাতে নামাজের আয়োজন হতো এবং কিবলার দিক নির্দেশের জন্য বিশেষ ঘূর্ণায়মান নির্দেশক ব্যবহার করা হতো। একজন চিকিৎসক, তিনজন চিকিৎসা-সহকারী ও তিনজন নার্স যাত্রীদের চিকিৎসাসেবা দিতেন। তবু অসুস্থতা ও বার্ধক্যের কারণে কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করতেন; আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বিধি অনুসারে তাঁদের জানাজা শেষে সমুদ্রে দাফন করা হতো। কয়েক সপ্তাহ পর চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হজযাত্রীরা যখন স্বজনদের কাছে ফিরতেন, তাঁদের মুখে কষ্টের নয়, বরং হজ পালন সম্পন্ন করার গভীর প্রশান্তির ছাপই সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠত।
চট্টগ্রাম বন্দরের সমুদ্রপথে হজযাত্রার ইতিহাস কেবল একটি পরিবহন ব্যবস্থার ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সামুদ্রিক ঐতিহ্যের এক অনন্য অধ্যায়। সরকারি নথি, সমকালীন সংবাদপত্র, প্রশাসনিক দলিল, স্মৃতিকথা এবং বিদেশি পর্যবেক্ষকদের বিবরণে সংরক্ষিত এই ইতিহাস আমাদের সামুদ্রিক ঐতিহ্য, হজ ব্যবস্থাপনা এবং উপমহাদেশের মুসলিম সমাজের সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিবর্তনের এক অমূল্য দলিল ও উত্তরাধিকার।