18/09/2022
গ্রিক উপকথার সূর্যদেবতা হিলিয়াসের মতো ভারতীয় উপমহাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজনীয় সূর্যদেবতারও রয়েছে একটি দর্শনীয় রথ, যাতে চড়ে তিনি আকাশে ঘুরে বেড়ান। তাই দেবতার সম্মানে কোনার্কের সম্পূর্ণ সূর্য মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছে একটি অতিকায় রথের মতো করে। সাতটি তেজী ঘোড়া টগবগিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ১২ জোড়া চাকার উপর অবস্থিত একটি অতিকায় রথকে, যেটি আসলে মূল মন্দির। আর এর পুরোটাই পাথরে খোদাই করা ভারী কারুকাজে পরিপূর্ণ।
মন্দিরের মূল প্রবেশপথেই দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দুজন অতিকায় প্রহরী। না, জীবন্ত কোনো প্রহরী নয়। যুদ্ধের হাতিকে পিষে ফেলতে থাকা দুটি বড় বড় সিংহ মূর্তি, যারা প্রতীকী অর্থে পাপ আর অসত্যকে বিনাশ করার প্রতীক। তবে এ অর্থটি আধুনিককালের। এর মূল অর্থ হচ্ছে বুদ্ধধর্মের (বুদ্ধধর্মের প্রতীক হাতি) চেয়ে হিন্দুধর্মের (সিংহ হিন্দুধর্মের প্রতীক) শ্রেষ্ঠত্ব নির্দেশ করা। তবে উপর থেকে দেখলে, সম্পূর্ণ মন্দিরটি একত্রে সূর্যদেবতার শ্রেষ্ঠত্ব আর মহিমাই প্রকাশ করে।
সিংহদ্বয়কে পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে, মূল মন্দিরে প্রবেশের পূর্বে দেখা মিলবে একটি ‘নত মন্দিরের’। কোনার্কের এই সূর্য মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার প্রাথমিককালে এ মন্দিরে নর্তকিরা নৃত্য পরিবেশন করতো দেবতার সন্তুষ্টির জন্য। এরপর ভেতরে প্রবেশ করলে পুরো মন্দিরের প্রাচীর দেয়ালগুলোতে চোখে পড়বে জ্যামিতিক প্যাটার্নে অঙ্কিত ফুল ও অন্যান্য নকশা। তবে দেয়ালের যে কারুকার্য অধিক নজর কাড়বে, তা হলো কামার্ত নরনারী ও দেবতাদের যৌনকর্ম আর প্রণয়ের ছোট ছোট চিত্রকর্ম। প্রতিটি খোদাইয়েই প্রাচীন কামাসূত্রের আদ্যোপান্তই যেন চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। এ ব্যাপারে একবার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন,
“এখানে পাথরের ভাষা মানুষের ভাষাকে হার মানিয়েছে!”
৭টি ঘোড়া টেনে নিয়ে যাচ্ছে ১২ জোড়া সুসজ্জিত চাকার উপর অবস্থিত সুরিয়া দেবতার রথ, এরকম চমৎকার নকশায় এ মন্দির তৈরি হয়েছে ১৩ শতকের দিকে। ইতিহাসবিদগণ মনে করেন, পূর্ব তীরের গঙ্গা রাজবংশের রাজা প্রথম নরসিংহ দেবই এ মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। আনুমানিক ১২৫০ খ্রিস্টাব্দে শেষ হয়েছিল এর নির্মাণকাজ। অভিজাত মননে নির্মিত এ মন্দিরের ত্রুটিহীন পরিমাপ, নকশা আর চোখ ধাঁধানো সব পাথুরে খোদাই কাজ যুগে যুগে মধ্যযুগীয় স্থাপত্যকলা ও নির্মাণশৈলীর জয়গান গেয়ে চলেছে। পুরো মন্দিরজুড়ে হাজারো ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছে যেন পুরো মধ্যযুগীয় ভারতের চিত্রই। নরনারীর প্রেম, ঝগড়া ফ্যাসাদ, বিরহ, বিচ্ছেদ কলহ, কিংবা রাজদরবারের চিত্র, রাজকবির গান, নর্তকীদের রাজসভায় নাচ, আর যুদ্ধ ময়দানের হাতি, ঘোড়া, তীর, বর্শা, বর্ম পরিহিত সৈন্য, স্বর্গে মদ্যপানরত দেব-দেবী আর আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ সূর্য, সবই আছে সেসব ভাস্কর্য আর খোদাই করা চিত্রকর্মে।
কামদ ভাস্কর্যের জন্য কোনার্কের সূর্য মন্দিরের জুড়ি মেলা ভার। মানব জীবনের আদিম প্রবৃত্তিকে পাথরের মাঝে এমন সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তোলায় এ মন্দিরটি শুধু উড়িষ্যার নয়, পুরো ভারতেরই সবচেয়ে সুন্দর মন্দিরগুলোর একটি। বাস্তবতা আর আধ্যাত্মিকতা এর প্রতিটি দেয়ালে মিলেমিশে দুইয়ের মধ্যে এক কাব্যিক মেলবন্ধন গড়ে তুলেছে। কিন্তু কালে কালে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় এর প্রকৃত সৌন্দর্য থেকে যে আমরা বঞ্চিত হয়েছি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মাটি থেকে দু'শতাধিক ফুট উপরে অবস্থিত মন্দিরটির দেবতার মূর্তির জন্য পবিত্র বেদীটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। প্রবেশপথের নত মন্দিরেরও যে অংশটুকু দেখা যায় তা এক-তৃতীয়াংশেরও কম। তথাপি যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তাতেই এ মন্দিরটি অন্যগুলোর চেয়ে অনন্য।
মন্দিরের দেয়াল ও বেদীর ভাস্কর্য এবং খোদাই করা পাথুরে কাজগুলোকে দু'ভাগে ভাগ করা সম্ভব। একটি উপরের অংশ, অন্যটি নীচের। স্পষ্টত উপরের কাজগুলো নীচেরগুলোর চেয়ে অধিক নিপুণ এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত। উপরের অংশে মূলত বিভিন্ন পৌরাণিক পশুপাখি ও দেব-দেবীর ছবি রয়েছে। মা দূর্গার মহিষাসুরকে হত্যার ছবি, নিবিষ্টচিত্ত বিষ্ণু আর শিবলিঙ্গই এদের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। তবে কৃষ্ণ, সরস্বতী আর গণেশের ভাস্কর্যও ছিল, যেগুলো ব্রিটিশ শাসনামলে লুণ্ঠিত হয়েছে। এরকম কিছু অত্যন্ত চমৎকার ভাস্কর্য বর্তমানে শোভা পাচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জাদুঘরে।
কোনার্ক সূর্য মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছিল চন্দ্রভাগা নদীর তীরে। কিন্তু কালের বিবর্তনে নদীটির গতিপথ বেঁকে যায়। ফলে মন্দির থেকে নদীটির দূরত্ব বর্তমানে কয়েক কিলোমিটারের মতো। এটি নির্মাণ করা হয় কলিঙ্গ স্থাপত্যশৈলী অনুসরণ করে। পূর্বদিকে মুখ করে রাখা হয়েছে এর প্রবেশদ্বার এবং দেবতার আসন (বেদী)। ফলে প্রতিদিন ভোরবেলায় সূর্যের প্রথম আভা সরাসরি দেবতাকে ছুঁয়ে যায়। ভারতবর্ষের বাইরে থেকে আনা খন্দালাইত পাথরে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হয় এর। অন্যদিকে, পুরো মন্দিরে রয়েছে ১২ জোড়া নিখুঁত সূর্যঘড়ি, যেগুলো দিয়ে মিনিট পর্যন্ত সঠিকভাবে হিসাব করা যায়। ১২ জোড়া সংখ্যাটা চেনা চেনা লাগছে না? হ্যাঁ, কোনার্ক সূর্য মন্দিরের ১২ জোড়া রথের চাকার প্রতিটিই একেকটি সূর্যঘড়ি!
ভগ্নপ্রায় এই মন্দিরটিকে আগামী প্রজন্মের জন্যে আগলে রাখার দায়িত্ব আমাদের ।।