29/10/2024
চিংড়ি মালাইকারির ইতিহাস অনুসন্ধান।
এ বঙ্গের সবচাইতে জনপ্রিয় খাদ্য তালিকা কেউ যদি খোঁজ করে তাহলে সর্বপ্রথম এই চিংড়ি মালাইকারির কথাই মনে পরে। আমাদের যেকোনো উৎসবে আনন্দে এই চিংড়ি মালাই কারি পদটি থাকলে তার কদর আলাদা হয়ে থাকে। কচি ডাবের ভেতরের নরম শাস বেটে তার থেকে দুধ তৈরি করে এর সাথে আমাদের দেশীয় মসলা এবং চিংড়ি সহযোগে বাঙালির অতি সুস্বাদু রান্না হচ্ছে এই মালাই করি। কচি নারকেলের মিষ্টতা তার সঙ্গে বঙ্গ মসলা ঝালের সুনিপুণ মেলবন্ধন সত্যি অসাধারণ। সেই হেতু এর প্রথম আবিষ্কর্তা কে তার খোঁজতো অবশ্যই করা দরকার।
এই বিষয়টি নিয়ে বহু আগেই ভেবেছিলেন রাধাপ্রসাদ গুপ্ত মশাই। আরও অনেকে এ নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন। যেমন বিজনবিহারী ভট্টাচার্য, বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়, প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী থেকে লীলা মজুমদার কে না এই মালাই করি আবিষ্কারকের সন্ধান করেননি। কেউ রেসিপি অনুসন্ধান করেছেন কেউ আবার এর শিকড়ের সন্ধান করার চেষ্টা করেছেন। তবে রাধাপ্রসাদ এধরণের খাদ্য পদ ‘রোজ মেরি ব্রিসেনডেনের’ বইতে সন্ধান পেলেন যার নাম, ‘ফ্রায়েড প্রন কারি’। কিন্তু সেটা প্রথম প্রকাশিত “South East Asian food in Australia” ১৯৭০ সালে। প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর রেসিপি ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’ বই যদি অনুসন্ধান করি তাহলে সেটা ১৯০৫ সালে দিকে প্রকাশিত। তারও আগে বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় ‘প্রাক-প্রণালী’ ১৮৮৫ সালে দিকে রান্ধন বিষয় মালাই করি অনুরূপ পদ খোঁজ মেলে। এর আগের কোনো ঐতিহাসিক বইতে চিংড়ি মালাই করি অনুরূপ কোনো খাদ্য লিখিত আকারে পাওয়া যায় না। তাহলে কি ধরে নেবো এই চিংড়ি মালাই কারীর প্রথম অস্তিত্ব পাওয়া যায় ওই উনিশ শতকের দিকে?
ব্যাপারটি মোটেও সেরকম নয়। বাঙালি রান্নার প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত লিখিত তথ্য খুব কম পাওয়া যায়। বিশেষ করে, কোনো নির্দিষ্ট রান্নার উৎপত্তি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন। অনেক বঙ্গীয় রান্নার মতো, চিংড়ি মালাইকারির রেসিপিও সম্ভবত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মৌখিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তাই লিখিত কোনো তথ্য না থাকায় এর সঠিক উৎপত্তি নির্ণয় করা কঠিন। আদি বাংলার ভৌগোলিক বিচার যদি করি তাহলে দেখতে পাবো দক্ষিণ বঙ্গীয় অঞ্চল সমূহ নারকেল গাছের প্রচুর প্রাচুর্য ছিল। আর এই নারকেলকে নানা ভাবে নানা রান্নাতে ব্যবহার করার প্রচল ছিল দক্ষিণ বঙ্গে। সেই হিসেবে বঙ্গীয় রন্ধন শৈলীতে নারকেলের ব্যবহার কোনো নতুন বিষয় নয়। প্রাকৃতিক নারকেল সঙ্গে দক্ষিণ বঙ্গের চিংড়ি প্রাচুর্য এবং আমাদের দেশীয় মসলা সাথে মিলে মিশে উপাদেয় খাবার যে তৈরি হবে এতে আচার্যের কিছু নেই।
এবার আসি চিংড়ি মালাই কারি নামকরণ নিয়ে। চিংড়ি ছাড়া ‘মালাই’ এবং ‘কারি’ এই দুটি নাম নিয়েই যত বিতর্ক। ‘মালাই’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ঘন দুধ বা ক্ষীর যা এক ধরনের তঞ্চিত ননি। এটি ভারতীয় উপমহাদেশে উদ্ভূত, যা মূলত ভারতীয় উপমহাদেশীয় রন্ধনশৈলীতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু কথা হল, মালাইকারিতে দুধ থাকে না। থাকে নারকেলের দুধ! তাকে কি তবে মালাই বলা হচ্ছে? এর দুই ধরনের ব্যাখ্যা হতে পারে প্রথম হচ্ছে এর গঠন এবং স্বাদ মালাইয়ের মতো লাগে, দৃতীয়টি হচ্ছে এর উৎপত্তির অবস্থান হিসেবে নাম। কিন্তু এর সপক্ষে যুক্তি মজবুত নয়।
ভারতীয় ঝোল বা তরকারি জাতীয় খাবারকে ইংরেজিতে ‘কারি’ বলা হয় আর এই কথাটা এসেছে সম্ভবত কারি পাতা থেকেই। এই কারি পাতার ব্যবহার প্রধানত ভারতের দক্ষিণ অঞ্চলে বেশি প্রচলিত। কেরল, তামিল এই সব অঞ্চলে নারকেল দুধ কারি পাতা সম্বলিত রন্ধন বহুল জনপ্রিয়। বিশেষ করে মালায়ালম (কেরালা) আমাদের মতো চিংড়ি, সামুদ্রিক মাছ, নারকেল দুধ এবং কারি পাতা সম্বলিত রান্নার প্রচলন আছে। আর এইরকম সদৃশ দেখেই সম্ভবত ইংরেজরা বাংলার এই রান্নার পদটিকে ‘মালয় কারি’ অর্থাৎ চিংড়ি মালাই করি বলতে শুরু করে। আমার উল্লিখিত কিছু বইয়ের সময় কাল ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলেই ছিল। এটি সেরকম কোনো মজবুত উদাহরণ নয়। কিন্তু এটা বলা যেতেই পারে ব্রিটিশ দেড় আগে নির্দিষ্ট করে এই মালাইকারির নাম খুব একটা পাওয়া যায় না।
আরো একটি যুক্তি বাজারে প্রচলিত আছে তা হলো মালয় দ্বীপপুঞ্জে আমাদের এইরকম সদৃশ রান্না বহুল জনপ্রিয়, যেহেতু ভারতের দক্ষিণ অঞ্চলের সাথে মালয় দ্বীপপুঞ্জে যোগাযোগ ছিল তারাই এই ধরনের রান্না আমাদের দেশে আমদানি করে বলে এর নাম মালয় কারি প্রচলিত হয়েছে। কিন্তু এর সাথে বাংলার কোনো সরাসরি যোগ নেই বললেই চলে। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে এই একই ধরনের খাবার ব্রহ্মদেশ (মায়ানমার), থাইল্যান্ড, মালয়শিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়াতে রান্না করতে দেখা যায়। তাদের নাম আলাদা আলাদা দেশে আলাদা আলাদা হলেও ইংরেজদের দেয়া নাম ইংরেজিতে ‘কারি’ বলেই প্রচলিত।
চিংড়ি মালাই কারি নব্য নাম অনুমান হলেও কিন্তু এই সাদৃশ্য রান্না আমাদের বঙ্গে বহুকাল আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। তাই নামে যাই হোক চিংড়ি মালাইকারির কোনো নির্দিষ্ট ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না, তবুও এই রান্নার স্বাদ এবং জনপ্রিয়তা বাঙালি সংস্কৃতির আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই রান্নার ইতিহাস খোঁজ মানে হলো বাঙালি রান্নার ইতিহাসেরই একটি অংশ, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মৌখিকভাবে হস্তান্তরিত হয়ে আসছে বা প্রচলিত হয়ে
Collected