04/04/2026
🌼 অলৌকিক ছোঁয়ায় লোকঐতিহ্যের গল্প: মহেন্দ্রনগরের শীতলা মায়ের পূজা 🌼
চৈত্রের রোদ যখন ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে, চারদিক যখন গরম আর ধুলোর চাপে ক্লান্ত, ঠিক তখনই মহেন্দ্রনগরের কলপাড়ে নেমে আসে এক অন্য আবহ। শাঁখের ধ্বনি, ধূপের গন্ধ আর ভক্তির আবেশে ভরে ওঠে চারপাশ—মনে হয়, মা শীতলা যেন নীরবে উপস্থিত আছেন সকলের মাঝে।
এই পূজার ইতিহাস আজ প্রায় ৬৮-৭০ বছরের পুরোনো। একসময় খুবই সাধারণভাবে, মাটির প্রতিমা গড়ে প্রতিবছর এই পূজা অনুষ্ঠিত হতো। পাড়ার মানুষের ভক্তি আর বিশ্বাসই ছিল এর একমাত্র শক্তি। সময়ের সাথে সাথে সেই আয়োজন বদলেছে, কিন্তু বিশ্বাসের জায়গাটা একই রয়ে গেছে। বর্তমানে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সাদা পাথরের বৃহৎ শীতলা মূর্তি, যাঁকে ঘিরে সারা বছর ধরেই চলে মানত। বিশেষ করে শনিবার ও মঙ্গলবার, বহু মানুষ এখানে এসে মানসিক করেন। লোকমুখে প্রচলিত—এই মায়ের কাছে কেউ খালি হাতে ফেরে না; রোগমুক্তির আশায় অসংখ্য মানুষ এখানে প্রার্থনা করেন।
চৈত্র মাসের এক শনিবারকে কেন্দ্র করে শুরু হয় এই পূজার মূল আয়োজন। সকাল থেকেই পাড়ার মহিলা সদস্যরা একসাথেই জড়ো হন—কারও হাতে ফুল, কারও হাতে ফল, কেউ বা ব্যস্ত পূজার উপকরণ জোগাড়ে। এই সম্মিলিত প্রস্তুতিতে ফুটে ওঠে পাড়ার ঐক্য আর আন্তরিকতা।
এই পূজার একটি বিশেষ রীতি হলো—মা’কে ডাব দিয়ে পূজা দেওয়া। আর দুপুর ১২টা থেকে শুরু হয় এক অনন্য আচার—বেদিতে জল ঢালা। অনেকে কাছের পুকুরে স্নান করে, ভিজে শরীরে এসে দণ্ডি কাটেন মায়ের উদ্দেশ্যে। বিশ্বাস, এই আচার পালন করলে মায়ের কৃপায় দূর হয় রোগ-ব্যাধি ও দুঃখ-কষ্ট।
পাড়ার মহিলারা কুলো হাতে বাড়ি বাড়ি ঘুরতে বের হন। প্রতিটি বাড়িতে সেই কুলো নিয়ে যাওয়ার একটি প্রাচীন রীতি রয়েছে। কেউ চাল দেন, কেউ ডাল, আবার কেউ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দান করেন—সবটাই মায়ের পূজার উপকরণ হিসেবে। এই প্রথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর বার্তা—সবার মঙ্গল কামনা, সবার অংশগ্রহণ। বিকেল ৫টার মধ্যেই পূজা সমাপ্ত হয়, কিন্তু তার পরেই শুরু হয় এক অন্য দৃশ্য।
শুধু ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয় এই উৎসব। ৩রা এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ৭ই এপ্রিল পর্যন্ত চলে নানা অনুষ্ঠান—
শিশুদের বসে আঁকো প্রতিযোগিতা, বালকভোজন, বাউল সংগীতের মনমুগ্ধকর আসর (বোলপুর ও নবদ্বীপের শিল্পীদের অংশগ্রহণে), এবং শেষদিনে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ও বিচিত্রা অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত লোকজ উৎসবের আবহ তৈরি হয়।
এই পূজা তাই শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—এ এক লোকবিশ্বাস, সামাজিক ঐক্য এবং অলৌকিক অনুভূতির মেলবন্ধন। এখানে দেবী আছেন মূর্তিতে, আছেন আচার-অনুষ্ঠানে, আবার আছেন মানুষের অটল বিশ্বাসে—যেখানে আজও মানুষ মনে করে,
“মা শীতলার কৃপায় সকলের মঙ্গল হোক।” 🌼