09/10/2025
পাহাড়ের রাণী, দার্জিলিং। আমি আজন্ম দার্জিলিং জেলার মানুষ, আমাদের জেলা সদর দার্জিলিং, শিলিগুড়ি একটি মহকুমা শহর। কাজে-কর্মে, উঠতে-বসতে আমাদের জেলা সদরে যাওয়া আসা বরাবরের। তাই দার্জিলিংকে আমরা একটু অন্যরকম ভাবে চিনি। দার্জিলিংয়ে মেঘ গাভীর মত চড়ে বেড়ায়, এটা বাস্তব, ফলে হঠাৎ করে কখনো সখনো বৃষ্টি হয়। নিম্ন হিমালয়ের অঙ্গ হবার সুবাদে, এই পাহাড় মাটি-পলি দিয়ে গড়া, গোড়া খুব নরম। বৃষ্টিতে সহজেই ধ্বস নামে, এটা আমাদের কাছে স্বাভাবিক। আমরা এই অঞ্চলের মানুষেরা এতে অভ্যস্ত। আমি শুধু দার্জিলিং নিয়ে লিখছি কারণ, এবারের দুর্যোগে কালিম্পঙে খুব একটা অসুবিধে হয় নি। দার্জিলিং জেলার মূলত তিনটি ব্লক - মিরিক, জোড়বাংলো - সুখিয়াপোখরি আর বিজনবাড়ি দুর্যোগের কবলে পড়েছে। এছাড়াও আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারিহাট ব্লক আর ফালাকাটা ব্লক আক্রান্ত হয়েছে দুর্বিপাকে।
লেখাটা যখন শুরু করলাম, আজ বিকালে পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিছু ছোট রাস্তা বাদ দিয়ে প্রায় সবকটি খোলা রয়েছে। দার্জিলিং ওঠা নামার জন্যে মূল রাস্তা, জাতীয় সড়ক ১১০ (হিল কোর্ট রোড) এবং পাঙ্খাবাড়ি রোড খোলা রয়েছে। দার্জিলিং থেকে মিরিকের রাস্তা খোলা। দার্জিলিং থেকে কালিম্পঙ যাবার রাস্তা খোলা। শিলিগুড়ি থেকে কালিম্পঙ যাবার মূল রাস্তা (জাতীয় সড়ক ১০) খোলা। শিলিগুড়ি থেকে লাভা আলগাড়া হয়ে রামধুরা হয়ে রংপো (সিকিম) যাবার রাস্তা খোলা। শিলিগুড়ি থেকে রংপো (সিকিম) যাবার মূল সড়ক খোলা। শিলিগুড়ি থেকে রাম্ভি বাজার হয়ে মংপু হয়ে সিটং যাবার রাস্তা খোলা। শিলিগুড়ি থেকে শিবখোলা দিয়ে সিটংয়ের রাস্তা খোলা। দার্জিলিং থেকে জোড়বাংলা হয়ে ছয় মাইল হয়ে তাকদার রাস্তা খোলা। লাভা থেকে লোলেগাঁও রাস্তা খোলা। ধূপগুড়ি মাদারিহাট সড়ক খোলা। মাদারিহাট (জলদাপাড়া) ফালাকাটা সড়ক খোলা। কুচবিহার মাথাভাঙ্গা জামালদা চ্যাংড়াবান্ধা শিলিগুড়ি সড়ক খোলা। শিলিগুড়ি থেকে সেবক হয়ে মালবাজার - চালসা - লাটাগুড়ি, অথবা শিলিগুড়ি - গজলডোবা - ক্রান্তি - লাটাগুড়ি সড়ক খোলা। চালসা - নাগরাকাটা - বানারহাট - বিন্নাগুড়ি - তেলিপাড়া মোড় রাস্তা খোলা।
এনজেপি স্টেশন সম্পূর্ণ রূপে খোলা এবং সব গাড়ি চলছে (কিছু লোকাল ডিএমইউ বাদ দিয়ে), বাগডোগরা এয়ারপোর্ট খোলা এবং বিমান ওঠানামা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা যাবার মূল সড়ক (জাতীয় সড়ক ৩৪) যথেষ্ট ভালো কন্ডিশনে।
তাহলে কি কি বন্ধ রয়েছে?
শিলিগুড়ি থেকে মিরিক যাবার সরাসরি রাস্তা আপাতত বন্ধ (আগামী ১৫ দিনের মধ্যে খুলে যাবার কথা) দুধিয়াতে ব্রিজ ধসে যাবার কারণে। তাও যাঁদের মিরিক যাবার ইচ্ছে শিলিগুড়ি থেকে, তাঁরা কার্শিওং পার হয়ে সিঙ্গেল টি এস্টেট হয়ে বুনকুলুং হয়ে যেতে পারেন। অথবা, নকশালবাড়ির বেলগাছি চা বাগান থেকে পুটুং হয়ে মিরিকের রাস্তা খোলা।
শিলিগুড়ি থেকে রোহিনী রাস্তা ধরে কার্শিওং বা দার্জিলিং যাওয়া আপাতত বন্ধ। দিন কয়েক সময় লাগবে। বিকল্প হিসেবে হিল কার্ট রোড বা পাঙ্খাবাড়ী খোলা রয়েছে।
জলদাপাড়া ফরেস্টের হলং ফাটক থেকে জঙ্গলে ঢোকার একটা কাঠের পুরানো ব্রিজ জলের স্রোতে ভেসে গিয়েছে আর জঙ্গলে জল ঢুকেছে তাই জলদাপাড়া জঙ্গলে প্রবেশ আপাতত বন্ধ।
জলদাপাড়া বনাঞ্চলের শালকুমার বিটের শিশামারা গ্রামে বাঁধ ভেঙে জল ঢুকেছে, ওখানে একটু সময় লাগবে।
খোলা রয়েছে -
দার্জিলিং, কার্শিওং, লাভা, কালিম্পং, লোলেগাঁও, সিটং, মংপু, তাকদা, তিনচুলে, রামধুরা, ইচ্ছেগাঁও, সিলারিগাঁও, রিশপ, বাগোরা, লামাহাটা, বাদামতাম, গ্যাংটক, পেলিং, রাবংলা, নামচি, লাচুং, উত্তারে, লাটাগুড়ি, গোরুমারা, মাদারিহাট, চালসা, সামসিং, সুন্তালেখোলা, ঝালং, বিন্দু, মূর্তি, বাতাবাড়ি, জয়ন্তী, বক্সা, সান্তারাবাড়ী, কোদালবস্তি, চিলাপাতা, কুচবিহার এবং আরো অজস্র জায়গা। আলিপুর, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিং জেলার বেশির ভাগ পর্যটক গন্তব্যস্থল সম্পূর্ণ রূপে খোলা এবং নিরাপদ।
এত বিস্তারিত লেখার উদ্দেশ্য একটাই। কিছু আর এন আই রেজিস্ট্রেশন ছাড়া নিজেদের খবরের পোর্টাল বলে ডিমান্ড করা ফেসবুক পেজ এবং কিছু ইন্ডিভিজুয়াল মানুষ এই দূর্যোগকে নিজেদের ভিউ কামানোর জন্যে ব্যবহার করছেন। ভুল তথ্য দিচ্ছেন, একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
প্রাকৃতিক দূর্যোগ কোথায় না হয়? বলে কয়ে তো আসে না! ইন্দোনেশিয়া থেকে মেক্সিকো, কলম্বিয়া থেকে জাপান সব দেশ বিভিন্ন সময় প্রকৃতির করাল রোষে পড়ে। কখনও দেখিনি সেখানকার মানুষকে এইভাবে সামাজিক মাধ্যমে ভয়ের চাষ করতে।
আমাদের অঞ্চলের অর্থনীতি পর্যটন নির্ভর। বাইরের মানুষ আমাদের অঞ্চলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে, কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ দেখতে, পাইন ফারের বনে নিভৃতে হাঁটতে, সাধারণ মানুষের সাথে মিশতে আসেন। এঁদের ভরসায় আমার এখানকার শত সহস্র গাড়ি চলে, হোটেল চলে, হোমস্টেতে মানুষ এসে থাকেন, গাইডদের পেট চলে, সাফারি গাড়ির ড্রাইভাররা পরিবার চালান, পান সিগারেটের দোকান চলে, রেস্তোরাঁ বার চলে। এ এক বিশাল অর্থনীতি।
একটাই চাওয়া, ভয়ের আবহাওয়া তৈরি করে আমাদের এখানকার মানুষের পেটে লাথ মারবেন না। যাঁরা উত্তরবঙ্গ নিয়ে ভুল তথ্য ছড়িয়ে ব্যবসা করছেন, তাঁদের প্রতি এইটুকু আবেদন রইলো।|
উত্তরবঙ্গে আসুন, নির্ভয়ে আসুন, আমাদের পাহাড়ে জঙ্গলে আসুন, আমাদের গ্রামগুলিতে আসুন। একটু প্রকৃতিবান্ধব হয়ে যাত্রা করুন। আমি, আপনি, পরিবেশ, সমাজ, পাহাড় সব ভালো থাকবে তাহলেই।
তন্ময় গোস্বামী
শিলিগুড়ি