02/06/2026
তিন বন্ধু মিলে ভার্সিটিতে এসেছিল পরীক্ষা দিতে। ওরা সবাই ই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট ছিল। সুন্দরমতো পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফিরবে এমনটাই প্ল্যান ছিল তাদের।
কিন্তু ওরা পরীক্ষা দিতে এসেছে শুনে ২০-২৫ জনের মতো ছাত্রলীগের পোলাপান তাড়াহুড়ো করে এসে সবগুলো ভবনের গেইট বন্ধ করে দেয়, যাতে কেউ আর বের হতে না পারে।
তারপর কল করে পুলিশকে। আর ওরা যাতে পরীক্ষা দিতে না পারে সেজন্যে ক্রমাগত বাঁধাও দিতে থাকে।
তারপর পুলিশ আসলে ছাত্রলীগের পোলাপানরা ওই ৩ জনের মধ্যে থেকে ২ জনকে পুলিশের হাতে জোর করে তুলে দেয়। পুলিশ গ্রেফতার করে দুজনকে।
তাদের অপরাধ ছিল তারা ছাত্রশিবির করত।
তিনজনের মধ্যে বাকি একজনকে গ্রেফতার না করেই চলে যায় পুলিশ। সেই একজনই ছিল ছবির ছেলেটা।
সে রাজশাহী বিশ্বিবদ্যালয়ের লতিফ হলের ছাত্র মো. রাসেল। সেও ছাত্রশিবিরের সদস্য ছিল।
পুলিশ দুজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পর রাসেল ওখানে কিছুক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে।সে বুঝতে পারছিল না তাকে কেন রেখে গিয়েছে।
সে তখনও টের পাচ্ছিল না তাকে নিয়ে কত বড় ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এভাবেই বেলা বাড়তে থাকে।
পুলিশ যেহেতু ২ জনকে ধরে নিয়ে গেছে তাই রাসেল ভেবেছিল ওকে বোধহয় আর কিছু করবে না অথবা ছেড়েই দিবে।
কিন্তু ওর ধারণা ভুল ছিল।
আনুমানিক সাড়ে তিনটার দিকে আবারও ক্যাম্পাসে ২৫-৩০ জন ছাত্রলীগের পোলাপান আসে। এবার তাদের হাতে হাতে বিভিন্ন অ*স্ত্র ছিল।
কারো হাতে বন্দুক, কারো হাতে ছুরি, চাপাতি, হকিস্টিক। এমনকি দুজনের কোমড়ে পিস্তলও ছিল।
তারা সবাই মিলে রাসেলকে টেনেহিঁচড়ে রাবির একটা রুমে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে তাকে নানান বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে।
যেসব বিষয়ে রাসেল জানে না সেসব বিষয়েও কতক্ষণ জিজ্ঞেস করে।
তাদের উদ্দেশ্যই ছিল এমনসব ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবে যাতে রাসেল উত্তর দিতে না পারে আর ফলে তাকে মারা যাবে।
এভাবে ঘন্টাখানেকের মতো ওরা রাসেলকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে।
রাসেল বারবার অনুনয়ের সুরে বলতে থাকে- "যেসব বিষয়ে তোমরা জিজ্ঞেস করছো সেগুলো আমি সত্যিই জানি না। জানলে প্রথমেই বলতাম। আমি তো এই ভার্সিটিরই স্টুডেন্ট ,আমাকে যেতে দাও প্লিজ। আমি তো তোমাদের কারো কোন ক্ষতি করিনি।"
কথাগুলো বলে রাসেল দরজার দিকে এগিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু ওরা রাসেলের অনুনয় শুনে আরও বেশি হিংস্র হয়ে উঠে।
পেছন থেকে ছাত্রলীগের একজন এসে রাসেলের পিঠে সজোরে একটা কোপ দেয়। আকষ্মিক কোপে রাসেল তীব্র চিৎকার দিয়ে উঠে।
কি হয়েছে বুঝার জন্যে পিছনের দিকে ঘুরতে যাবে ঠিক তখনই আরেকজন চাপাতি দিয়ে তার হাতে আরেকটা কো*প দেয়। হাত কিছুটা নড়ায় কো*পটা গিয়ে লাগে রাসেলের হাতের কব্জিতে।
চাপাতিটা অনেক ধারালো ছিল, আর কো*পটাও এতটাই জোরে ছিল যে হাত থেকে কব্জির অর্ধেক আলাদা হয়ে চামড়ার সাথে ঝুলতে থাকে।
এত অল্প সময়ে তীব্র আঘাতে রাসেল হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। কি করবে বুঝে উঠতে পারে না সে।
তারপর ছাত্রলীগের আরেকটা ছেলে এসে তার দুই পায়ে কয়েকটা গুলি করে। পায়ে গুলি খেয়ে এবারে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না রাসেল, মাটিতে পড়ে যায় সে।
এরপর ওরা সবাই চলে যাচ্ছিল। রাসেল ভেবেছিল ওদের নির্যাতন বোধহয় এটুকুতেই শেষ।
কিন্তু একটু পরই ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া ফিরে এসে রাসেলের দুই পায়ে চাপাতি দিয়ে অনবরত কো*পাতে থাকে।
এভাবে মিনিট পাঁচেকের মতো কো*পানোর পর ওরা সবাই ই চলে যায়। রাসেল একা পড়ে থাকে ওই বদ্ধ রুমটাতে।
ওর হাত, পা পিঠ থেকে তখন অনবরত র*ক্ত পড়ছিল। পানির মধ্যে শুয়ে থাকলে যেমন ভেজাভেজা অনুভব হয়, রাসেলের তেমনটা অনুভব হচ্ছিল। কিন্তু সেগুলো পানি ছিল না, ছিল তার নিজের শরীরেরই র*ক্ত।
রাসেলের সেন্স থাকার সময় পর্যন্ত সে একবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু দাঁড়াতে গিয়ে সে বুঝতে পারছিল তার পায়ে কোন অনুভূতি হচ্ছে না,
সে তখন টের পায় তার ডান পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে পুরো গোড়ালিটা আলাদা হয়ে গেছে।
রাসেলের ভাষ্যামতে- শরীরের অনবরত র*ক্তক্ষরণ দেখে রাসেলের বারবার মনে হচ্ছিল সে মারা যাবে। তখনই মনে মনে তওবা করে কালিমাও পড়ে নিয়েছিল সে।
রাসেল বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে ছিল। তার তখন শুধু বারবার বাবার দাড়ি মাখা চেহারটার কথা চোখে ভাসছিল।
সেদিন র*ক্তের মধ্যে শুয়ে শুয়েই রাসেল ভেবেছিল- আল্লাহ, আমি শহীদি মৃত্যু চেয়েছি, তুমি হয়তো কবুল করেছ।"
এসব ভেবে ভেবেই রাসেল তখন অনাগত মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করছিল।
তার ঠিক কিছুক্ষণ পর ভার্সিটির অন্যান্য স্টুডেন্টরা পুলিশ নিয়ে ওই রুমে উপস্থিত হয়। পুলিশ রাসেলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে থাকে।
রাসেলকে যখন গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন সে বারবার কান্নারত কন্ঠে বলছিল - "ওই রুমে আমার কা*টা পা টা পড়ে আছে, প্লিজ নিয়ে আসেন।"
এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় রাজশাহী মেডিকেলে। ওখানকার ডাক্তাররা আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের চাপে রাসেলের অপারেশন করতে অস্বীকৃতি জানায়।
এদিকে রাসেলের অবস্থাও তখন গুরুতর। তীব্র রক্ত*ক্ষরণ এবং প্রচন্ড ব্যথায় রাসেল তখন জোরে জোরে চিৎকার করছিল, মরে যাওয়ার মতো অবস্থা প্রায়।
এর কিছুক্ষণ পর অন্য ডাক্তাররা রাসেলের শোচনীয় অবস্থা দেখে তার অপারেশন টা করায়। দীর্ঘ ৬ ঘন্টা অপারেশন করার পর রাসেলকে আইসিইউতে নেয়া হয়।
ছাত্রলীগের ওরা যখন খবর পায় কিছু ডাক্তার রাসেলের অপারেশন করেছে এবং সে জীবিত আছে তখন তারা হাসপাতালে আবারও পুলিশ পাঠায়
এবং পুরনো মিথ্যা মামলায় রাসেলকে আইসিইউতেই গ্রেফতার করা হয়। এরপর কিছুটা সুস্থ হলে তাকে জেলে নেওয়া হয়।
রাসেলের তখন ফোর্থ ইয়ারের পরীক্ষাগুলো চলছিল। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে হওয়ায় তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল তাই সে জেলে বসেই পরীক্ষা দিতে চেয়েছিল।
কিন্তু আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের নির্দেশে তাকে হুইলচেয়ার টা পর্যন্ত দেয়া হয়নি। তাই জেলে বসেও পরীক্ষাগুলো দিতে পারেনি সে।
পরীক্ষা দিতে না পারায় পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব বাতিল হয়ে যায় তার। এটা শুনে রাসেল কান্নায় ভেঙে পড়ে। সে বুঝতে পারে তার স্বপ্নগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
তারপর পঞ্চাশ দিন পর ছাড়া পায় সে। কিন্তু তাতেও রক্ষা হয় না, কিছুদিন পর আবারও লীগের নির্দেশে ডিবি পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়।
রাসেলের অসহায় বাবা বুঝতে পারে ওকে রাজশাহী রাখলে যেকোন সময় মেরে ফেলতে পারে তাই ঢাকায় এনে ভর্তি করিয়ে দেয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে।
কিন্তু ঢাকায় আনার পরও তিনি বুঝতে পারেন ঢাকাতেও সে সেইফ না, তাই ২০২২ সালে স্কলারশিপ নিয়ে সে চলে আসে লন্ডনে। এখন ওখানেরই একটা ল ফার্মে কাজ করে।
রাসেলের উপর এতটা বর্বর নির্যাতনের কারণ বা অপরাধ কিছুই ছিল না। তার একটাই অপরাধ সে ছাত্রলীগ করতো না, ছাত্রশিবির করতো।
রাসেলও এখনো কাঁদতে কাঁদতে বলে- আমি শিবির করতাম শুধু এই দোষে ওরা আমার জীবনটা শেষ করে দিল।
আজকে আওয়ামী লীগের নেতা তোফায়েলের মৃত্যুতে অনেকেই মায়াকান্না করছে অথচ যেদিন তোফায়েলের মতাদর্শের লোকেরা শুধুমাত্র শিবির করার অপরাধে রাসেলের পা কে*টে ফেলেছিল সেদিন কোন সুশীল টু শব্দটা পর্যন্ত করেনি।
এমনকি ক্ষমতার দাপটের থানার ওসি তার বাবার মামলাটাও নেয়নি।
বিএনপির এমপি-মন্ত্রীরাও আওয়ামী লীগকে, ছাত্রলীগকে কত সহজে ক্ষমা করে দিচ্ছে, ওদের কুকর্মগুলো আমরাও ভুলে যাচ্ছি!
যারা একবার আওয়ামী লীগ ,ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হয়েছে তারাই জানে ওরা কতটা নৃশংস, পাষবিক।
এ ঘটনাটা ২০১৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের। পুরো ঘটনার বিবরণ রাসেল নিজ মুখেই পরবর্তীতে বর্ণনা করেছে।
রাসেলের বাড়ি ছিল গাইবান্ধা। তার বাবা ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। ২০০৩ সালের দিকে পুকুরে ডুবে রাসেলের একটা ভাই এবং বোন মারা যায়।
এরপর রাসেলই ছিল পরিবারেরর একমাত্র ছেলে।
তার বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল ছেলেটা ভার্সিটির পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের সাথে থাকবে, একটা সুন্দর পরিবার হবে তাদের।
কিন্তু রাসেলের বাবার সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ছাত্রলীগেরা সেটা পূরণ হতে দেয়নি। ছেলের পা হারানোর পর সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে।
আগের সন্তানদের শোক ভুলতে না ভুলতেই এ ছেলের পা হারানোর পর তার বাবা অনেকটা ভেঙে পড়েন। তারপর একবুক চাপা কষ্ট এবং মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে তার বাবাটাও ব্রেইন স্ট্রোক করে মারা যায়।
রাসেল এখন নিজ থেকে আর কোন স্বপ্ন দেখে না, তার বাবার স্বপ্নগুলোই সে মনে মনে ভাবে।
স্বপ্ন দেখবেই বা কিভাবে? আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগ তার সব স্বপ্ন ধ্বংস করে দিয়েছে, শুধুমাত্র শিবির করত বলে।
রাসেলের এখনো পুরনো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, নিজের পা টার কথা মনে পড়ে, বাবার স্বপ্নের সুখের পরিবারটার কথা মনে পড়ে।
একমাত্র ছেলে হওয়ায় রাসেলের বাবা তাকে অনেক আদর করতো এবং ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতো। অথচ আজকে রাসেলের সেই স্বপ্নগুলো নেই, তার বাবাটাও নেই।
আমরা হয়তো একদিন আওয়ামী লীগ কিংবা ছাত্রলীগের নৃশংসতা গুলো ভুলে যাব। কিন্তু রাসেল ভুলতে পারবে না।
যতবার ভুলতে যাবে ততবারই মনে পড়বে- তার একটা পা ছিল, সুন্দর স্বপ্ন ছিল আর হাসিখুশি একটা বাবা ছিল
- Ibrahim Khalil Shawon See less