05/03/2026
চিরতরে থেমে গেল স্পিরিট এয়ারলাইন্স।
করোনা, যুদ্ধ, দেউলিয়াত্ব আর সরকারি উদাসীনতার ভার বহন করতে না পেরে ভোর রাতে নিঃশব্দে মাটিতে নেমে এল একটি গোটা বিমান সংস্থা — এবং আর উড়বে না।
স্পিরিট এয়ারলাইন্স, প্রতিষ্ঠা - ১৯৯২। শেষ দেখা: ২ মে ২০২৬, রাত ১২টা ১৭ মিনিট, ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ বিমানবন্দর। উজ্জ্বল হলুদ রঙের সস্তা বিমান সংস্থা যেখানে ১৭ হাজার মানুষের কর্মস্থল।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান চলাচল শিল্পের ইতিহাসে ২ মে ২০২৬ একটি বিষণ্ণ তারিখ হয়ে থাকবে। ভোর রাতে, যখন বেশিরভাগ মানুষ ঘুমিয়ে, তখন কোনো বড় ঘোষণা বা আলোচনা ছাড়াই স্পিরিট এয়ারলাইন্স তার ওয়েবসাইটে একটি ছোট বিবৃতি প্রকাশ করে: "২ মে ২০২৬ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের কার্যক্রম বন্ধ করা হল।" মাত্র কয়েকটি শব্দে শেষ হয়ে গেল ৩৪ বছরের একটি যাত্রা, ১৭ হাজার মানুষের জীবিকা এবং লক্ষ লক্ষ সাধারণ যাত্রীর সস্তায় আকাশে ওড়ার স্বপ্ন।
স্পিরিটের শুরু হয়েছিল মিশিগানে, একটি সাধারণ ট্রাকিং কোম্পানি হিসেবে। ১৯৮০-এর দশকে সংস্থাটি বিমান চলাচলে প্রবেশ করে এবং ১৯৯২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিমান সংস্থা হিসেবে নিবন্ধিত হয়। এরপর থেকে তাদের উজ্জ্বল হলুদ বিমান আর সস্তা টিকিট মার্কিন আকাশপথে একটি পরিচিত নাম হয়ে ওঠে। সংস্থাটি এমন লক্ষ লক্ষ মানুষকে বিমানে তুলেছিল যারা অন্যথায় হয়তো কখনো উড়তেই পারতেন না।
১৯৯২ সালে বিমান সংস্থা হিসেবে যাত্রা শুরু।১৭ হাজারের বেশি কর্মী হঠাৎ বেকার হয়ে গেলো! ২৭৭টি
ফ্লাইট শনিবার বাতিল হয়।
স্পিরিট এয়ারলাইন্সের এই পরিণতি একদিনে আসেনি। বরং একের পর এক আঘাতে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছিল সংস্থাটি। প্রতিটি ধাক্কা একটু একটু করে তার মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।
করোনা মহামারির বিপর্যয়: ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি হলে স্পিরিটের যাত্রীসংখ্যা তলানিতে গিয়ে ঠেকে। সস্তা টিকিটের উপর নির্ভরশীল এই সংস্থাটি মহামারির ধাক্কা কখনো পুরোপুরি সামলাতে পারেনি। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে লোকসানের পাহাড় জমতে শুরু করে।
যাত্রীসংখ্যায় ধারাবাহিক পতন: ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ স্পিরিট মাত্র ১৭ লক্ষ যাত্রী পরিবহন করেছে, যা ঠিক এক বছর আগের তুলনায় পাঁচ লক্ষ কম। বিমানের সিটিং ক্যাপাসিটিও মে ২০২৪ সালের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছিল। যাত্রীরা ধীরে ধীরে অন্য সংস্থায় সরে যাচ্ছিলেন।
জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি: ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে বেড়েছে। বাজেট এয়ারলাইন্স হওয়ায় স্পিরিটের মুনাফার মার্জিন এমনিতেই পাতলা ছিল — বাড়তি জ্বালানির খরচ সেই সূক্ষ্ম ভারসাম্যটুকু পুরোপুরি ভেঙে দেয়।
পর পর দুবার দেউলিয়াত্ব: এক বছরের মধ্যে দুবার দেউলিয়া ঘোষণা করতে বাধ্য হয় স্পিরিট। এই ধরনের পরিস্থিতি যাত্রীদের আস্থা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয় এবং বিনিয়োগকারীরাও মুখ ফিরিয়ে নেন। নতুন ঋণ বা বিনিয়োগ পাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সরকারি সাহায্য না পাওয়া: সংস্থাটি ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ৫০ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তা চেয়েছিল। কিন্তু যথেষ্ট সমর্থন না পেয়ে সেই আবেদন ব্যর্থ হয়। সরকারি সাহায্যের শেষ আশাটুকু নিভে যাওয়ার পরেই কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শেষ ফ্লাইটটি ছিল স্পিরিট ফ্লাইট ১৮৩৩। মিশিগানের ডেট্রয়েট থেকে রওনা হয়ে রাত ১২টা ১৭ মিনিটে ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ বিমানবন্দরে অবতরণ করে বিমানটি। টার্মাকে অবতরণের পর বিমানবন্দরের একজন কর্মকর্তা রেডিওতে পাইলটদের বললেন, "আপনাদের সাথে কাজ করতে পেরে ভালো লেগেছে। আপনাদের জন্য শুভকামনা।" সেই একটি বাক্য রেডিওতে ভেসে গেল, আর সঙ্গে ভেসে গেল ৩৪ বছরের একটি যুগ।
"বিমানবন্দরে যাবেন না" — এই সতর্কবার্তা দিয়ে স্পিরিটের ওয়েবসাইট শেষ হয়ে যায়। কাউন্টারে কেউ নেই, ফোনে কেউ নেই। একটি গোটা সংস্থা রাতারাতি শুধু একটি ওয়েবপেজ হয়ে গেল।— প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রীদের বিবরণ থেকে, LAX বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন বিমানবন্দরে যাত্রীরা তখন বিভ্রান্তিতে দাঁড়িয়ে। লস অ্যাঞ্জেলেস বিমানবন্দরে ফাঁকা কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে একজন যাত্রী বলেন, "কেউ নেই, সবাই হতভম্ব।" ডেট্রয়েটে আরেক যাত্রী লুকাস ত্রিভেদি বলেন, "স্পিরিট না থাকলে অন্য এয়ারলাইন্সের দাম আকাশ ছোঁবে, এটা আমার মতো সাধারণ মানুষের জন্য বড় সমস্যা।" শুধু তাঁরা নন — লক্ষ লক্ষ মানুষ যারা কম খরচে উড়তেন, তাদের সামনে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
যাদের টিকিট সরাসরি স্পিরিটের ওয়েবসাইট বা অ্যাপ থেকে কেনা, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত পাবেন। ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে কেনা টিকিটের ক্ষেত্রে এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। তবে যারা ভাউচার বা ফ্রি স্পিরিট পয়েন্ট ব্যবহার করেছেন, তাদের অপেক্ষা করতে হবে — দেউলিয়া আদালত সিদ্ধান্ত নেবে তাদের পাওনা কীভাবে মেটানো হবে। এই পরিস্থিতিতে সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্স বিশেষ ছাড়ের ভাড়ায় স্পিরিটের যাত্রীদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে।
স্পিরিটের বিমানগুলো এখন বিভিন্ন বিমানবন্দরে নিষ্প্রাণ দাঁড়িয়ে আছে — সেগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। হলুদ রঙের এই বিমানগুলো একসময় আমেরিকার আকাশকে উজ্জ্বল করে রেখেছিল। এখন সেই উজ্জ্বলতা নিভে গেছে।