17/01/2026
ট্রাভেল এজেন্সি থেকে আবার ফোন এল। ওপাশ থেকে একজন বলল, “স্যার, আপনার হোটেল বদলানোর ব্যাপারে কথা ছিল..."
আমি বললাম, “ওই হোটেল তো ছেড়ে এসেছি। থ্যাংকস।”
ওপাশের লোক বললেন, “স্যার বিষয়টা আসলে ওটা না। এই মাসে আপনাকে নিয়ে ৪ জন এরকম দামি হোটেল ছেড়ে শিফট করলেন।”
আমি থমকে গেলাম, "মানে?"
“গেস্টরা এসে কাবা ভিউ-সহ সবচেয়ে দামি রুম নিচ্ছে। তারপর হুট করে সেই রুম ছেড়ে দিয়ে দূরে কোথাও সস্তা রুম খুঁজছে। সবার মুখে একই কথা—বিলাসিতায় মন টিকছে না, একটু হাঁটতে চায়, একটু কষ্ট করতে চায়। আমরা ভাবছি আমাদের মার্কেটিংয়ের ধরনটাই পাল্টে ফেলব।"
***
উমরা করতে গিয়েছিলাম। ক্লক টাওয়ারে রুম বুক করেছি। এমন রুমে ছিলাম—পর্দা সরালেই কাবা শরীফ।
প্রথম দিন ভোরে জানলার পর্দাটা সরালাম। হাতে ধোঁয়া ওঠাই কফি। সামনে কাবা—ভিউটা জাস্ট পারফেক্ট।
কিন্তু ঠিক তখনই ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।
এখানেই কি ইবরাহিম নবি নিজের ছেলেকে কোরবানি দিতে এসেছিলেন? শত-হাজার নবি-রাসুল কি এখানেই হেঁটেছিলেন পায়ে?
মানুষ তারা সারা জীবনের সঞ্চয় জমিয়ে একটিবার দাঁড়াতে চায় এই কাবার ছায়ায়।
আর আমি কি না আয়েশ করে কফি খাচ্ছি এখানে!
কাবা শরীফ নিচে—আমি ওপরে? আমি ওপর থেকে নিচে কাবার দিকে তাকাচ্ছি? এ তো রীতিমতো বেয়াদবি!
সাথে সাথে ফোন দিয়েছিলাম ট্রাভেল এজেন্সিতে, “ভাই, চিপ রুম দেন একটা আমাকে। এখান থেকে দূরে হলেও সমস্যা নাই।"
হারাম শরিফ থেকে ২০ মিনিটের হাঁটা পথ দূরে এক হোটেলে উঠলাম। জানালা দিয়ে কিছুই দেখা যায় না। পরিবারের লোকজন ভাবল, আমার বোধহয় মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
কিন্তু হাঁটতে হাঁটতেই বদলে গেল সব।
বাইরে কড়া রোদ। পিল পিল করে এগোচ্ছে মানুষ।
ওই যে এক থুত্থুরে বুড়ো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। এক মা কোলে বাচ্চা নিয়ে ভিড় ঠেলে এগোচ্ছেন—এদের কাছে এই সফরটাই সব।
আমার কাছে যেটা সামান্য অসুবিধা, ওদের কাছে সেটাই রোজকার রুটিন। আমার কাছে যেটা 'স্যাক্রিফাইস', ওদের কাছে ওটাই স্বাভাবিক।
আরাম আর ত্যাগের মাঝখানের ওই রাস্তাটুকুতেই আমি আসলে খুঁজে পেলাম নিজেকে। উমরাহ তো পিকনিক না; উমরা মানেই তো এই খাটুনি।
আল্লাহ ইবরাহিম নবিকে পরীক্ষা করেছিলেন কোরবানি দিয়ে।
আর আমাদের পরীক্ষা করছেন আরাম-আয়েশ দিয়ে।
[সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা]
~সংগৃহীত