01/08/2026
চাঁটগাইয়া মানুষদের কিছু ইউনিক ব্যাপার আছে যার মধ্যে অন্যতম হলো, তারা চট্টগ্রামের বাইরের সবাইকে "ভইংগে" বলে ডাকে, সে অন্য জেলার মানুষ হোক কিংবা বিদেশের..... ডাজেন্ট ম্যাটার, সে হচ্ছে "ভইংগে" এটাই চট্টগ্রামে তার একমাত্র পরিচয়।
আবার ছোট বেলায় দেখতাম শহর থেকে কেউ গ্রামে গেলে তাদের বলতো "শউর্গো খাউও" মানে শহরের কাক।এখন বলে কিনা জানি না।
আত্মীয়দের মাঝে বন্ডিং খুবই শক্তিশালী এই চাঁটগার লোকদের, কোন আত্মীয়ের বিপদে সবাই সর্বোচ্চ চেষ্টাটা করে।
চট্টগ্রামের দাওয়াত মানে ১০-১৫ পদের খাবার দাবার।আথিতেয়তায় অনন্য এই চট্টগ্রামের মানুষ। অতিথি কে চাঁটগার ভাষায় বলা হয় "গরবা"। আর চট্টগ্রামে এই "গরবা"র সম্মান অন্য লেভেলের।যারা এক্সপেরিয়েন্স করেছেন অবশ্যই স্বীকার করতে বাধ্য হবেন।
চট্টগ্রামের মেজবানি খাবারের স্বাদ দুনিয়ার আর কোথাও পাওয়া যাবে না। যখনই দাওয়াত পাই, মিস করি না। যারা নরমাল দোকান থেকে মেজবানি মাংস খেয়েছেন তারা আসল টেস্টই পান নি, এই টেস্ট শুধুমাত্র চট্টগ্রামের অরিজিনাল মেজবানেই পাওয়া সম্ভব।
চা এর মধ্যে ডুবিয়ে রুটি, পরাটা, কেক, বিস্কিট,পিয়াজু, সিংগারা, সমুচা,মুড়ি এবং আরো বহু কিছু যে খাওয়া সম্ভব তা এখানকার এক ঐতিহ্য।
চট্টগ্রামের ভাষার মধ্যে একটা ইউনিক শব্দ যা খুশিতে কিংবা রাগে সবক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়, সেটা হচ্ছে "চু**নির ফুয়া"। জাস্ট টোনের উপর ডিপেন্ড করে শ্রোতাকে বুঝে নিতে হবে সে মায়া করে বলছে নাকি খুশি হয়ে বলছে কিংবা রাগে গোস্বায় গা*লি দিয়ে বলছে।আমার এক বন্ধু আছে যে সারাদিনে নরমাল শব্দের চাইতে এই শব্দটাই বেশি ইউজ করে, তার পুরো জীবনের কথার হালখাতা খুললে এই শব্দ ছাড়া আর হয়ত বিশেষ কিছু পাওয়া যাবে না।
চট্টগ্রামের ভাষা বাংলা থেকে অনেকটাই ভিন্ন, বহু শব্দই বাংলায় নেই,কিন্তু এই ভাষার আলাদা কোন বর্ণমালা ও নেই।খাঁটি চাঁটগা ভাষার কথোপকথন অন্যদের পক্ষে বোঝা প্রায় অসম্ভব। যেমন-
কোথায় যাচ্ছো? - "হন্ডে যদ্দে?"।
অস্থির লাগছে - রুহ বিরবিরার।
মাথা ব্যাথা করছে- মাথাত চিনচিনার।
পেটে গ্যাস হয়েছে- ফেডত ভুডভুডার।
সে হাঁপিয়ে গেছে - ইতের রুহ আয়ির আর যার
তুমি কি রকম মানুষ! - তুই ওডা খন্ডইল্যা গৌর!
তার সব শেষ হয়ে গেছে - ইতে ফুডিয়েরে আওয়াজ দিয়ি।
এ দেখছি পিছুই ছাড়ছে না - ইতে দেইদ্দি লেসার ডইক্কে লাগি রইয়ি।
সব স্বাদ মিটিয়ে দিবো- এইক্কো চাঁবোর চোডে বেয়াক রস বাইর গড়ি দিয়ুম।
উপযুক্ত শিক্ষা হয়েছে - এব্বারে বিষ মরিয়েরে ত্রিশ ফার হইয়ি।
খাবারের স্বাদ ভালো না - হানা ইবে আফোয়াইদ্দে, মুক মারি আইয়ির।
ছেলেটি খুবই শুকনো - ফোয়া ইবে ম্যারা ফুয়ানা,ফেড পিডত লাগি রইয়ি।(অর্থাৎ এতই শুকনো যে পেট শুকিয়ে পিঠে গিয়ে লেগেছে 😄)
ওহ আর পারা যাচ্ছে না - মাইল্লে ফিড়ে।
যেহেতু এভাবে বললে অন্যরা বুঝবে না তাই চাঁটগাইয়ারা বাধ্য হয়ে অন্যরা বুঝতে পারে মতন বাংলা বলে যদিও চাঁটগার টোন থেকেই যাই। এ এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
বিশিষ্ঠ লেখক প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন বাংলা ভাষা সিলেটে গিয়ে আহত আর চট্টগ্রামে এসে হয়েছে নিহত।
রসিকতা করে বললেও, বাস্তবে সিলেটি এবং চাঁটগার ভাষা যথেষ্ঠ সমৃদ্ধ এবং স্বতন্ত্র, বহু ব্যাপার চট্টগ্রামের একটা শব্দ দিয়েই প্রকাশ করা সম্ভব, বাংলায় এই সব শব্দকে ভাব সম্প্রসারণ করে তারপর অর্থ বুঝা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রামে বিয়ে একটা খুবই জটিল বিষয়,মেয়ে পক্ষ কাবিন যা বলবে তা সারাজীবন ২৪ ঘন্টা মেহনত করেও হালাল ভাবে অনেক ক্ষেত্রে শোধ করা সম্ভব নয়,তাই বিয়ের পর বেশিরভাগ স্বামীই বউয়ের কাছে মাফ চেয়ে নেয়, তবে বউয়েরা মাফ করে কিনা তা জানি না।
বড় ভাইদের বলা হয় "বদ্দা", এই শব্দটা বলাতে এবং শুনতে যে শান্তি এবং রেস্পেক্ট লুকিয়ে থাকে তা চাঁটগার মানুষ মাত্র সবাই জানে।
লইট্যা এবং শুটকি মাছ কেমন মজা করে খাওয়া যায় তা চট্টগ্রাম ছাড়া বুঝা সম্ভব নয়।
চট্টগ্রামের মানুষদের সঠিক নাম শুধুমাত্র কাগজে কলমেই লিপিবদ্ধ থাকে বাস্তবে তাদেরকে খুবই ভিন্ন নামে ডাকা হয়,যেমন শফিক কে ডাকা হবে শইপ্পে, কাউসার কে কছইজ্জে, বক্কর কে বক্কইজ্জে, আইয়ুব কে আয়ুপ্পে, নিজের নাম এভাবে শুনতে শুনতে আসল নামই আর মনে রাখা যায় না। এভাবে বিকৃত ভাবে নাম ডাকা অন্য জেলায় ডাকে কিনা, আমার জানা নাই, কমেন্টসে জানাবেন।
আর চট্টগ্রামের লোকেশন ও খুবই ইউনিক, পাহাড় - নদী ও সমুদ্র মিলে এই জনপদ। দিনে পাহাড় ঘুরে সন্ধ্যায় চাইলে সাগরে সূর্যাস্ত দেখা সম্ভব।
তবে স্কুলে যখন পড়তাম (২০০০ সালের দিকে) সেই সময়ে চট্টগ্রাম শহর ছিল এক সুন্দর মনোরম শহর, ট্রাফিক জ্যাম কি জিনিষ তা শহরের মানুষ জানতো না।বর্তমানের মত এত বায়ু দূষণ ও ছিল না। খুবই মিস করি সেই সময়ের চট্টগ্রাম শহরকে।
এই জনপদে আল্লাহ রহমত ঢেলে দিয়েছেন বিনা হিসেবে,
কিন্তু আমরাই এর মূল্য না বুঝে ক্ষতি করে চলেছি প্রতিনিয়ত, এবং এর মাশুল সবাইকেই একত্রে দিতে হবে।
Shahid Hosen