11/09/2026
এইটিজ ট্রেন্ডের কিছু ব্যাপার একটু খেয়াল করলেই আপনার চোখে পড়বে।
সবার মাথায় প্রচুর চুল।
ন্যাচারাল ওয়েস্টলাইন খুব ছোট। শোল্ডার আর চেস্ট সবারই ওয়েস্টের চেয়ে অনেক চওড়া।
ওয়েস্টলাইন ছোট, কিন্তু কাপড়গুলো ছিল ওভারসাইজড। তাই পুরো মানুষটাকেই খুব রিল্যাক্সড মনে হতো।
প্রায় কারোই ভুঁড়ি নেই।
সবার পায়ের শেইপ খেয়াল করবেন। খুব মোটা না, কিন্তু শক্তিশালী।
ছেলেদের চেস্ট খুবই ফ্ল্যাট। কিন্তু পুরো স্ট্রাকচার দেখলে মনে হয় শরীরে যথেষ্ট শক্তি আছে।
মেয়েদের গড়নও ছিল বেশ ছিপছিপে।
কারো চোখেই ক্রনিক স্ট্রেসের ছাপ খুব একটা দৃশ্যমান না।
কারোই পেটের ওপরের অংশ ভারী না।
এর একটা বড় কারণ ছিল জীবনযাপন।
আশির দশকের মানুষ প্রচুর হাঁটতো। দিনে ১০+ কিলোমিটার হাঁটা অনেক মানুষের জন্য অস্বাভাবিক ছিল না। শহরের বাইরের জীবন তো আরও বেশি হাঁটানির ওপর নির্ভরশীল ছিল।
হাঁটা ছিল সহজ।
গাড়ির সংখ্যা আজকের মতো ছিল না। প্রতিটি রাস্তা ছিল গাড়ি আর যানজটে পূর্ণ নয়। গুলিস্তান, পল্টন, মতিঝিল বা পুরান ঢাকার মতো ব্যস্ত এলাকা বাদ দিলে অনেক জায়গাতেই পায়ে হাঁটা ছিল স্বাভাবিক চলাচলের মাধ্যম।
চট্টগ্রাম ছাড়া দেশের অধিকাংশ বিভাগীয় শহরও আজকের তুলনায় অনেক ছোট, ধীর এবং মফস্বলধর্মী ছিল।
রাস্তায় প্রতি দশ ফুট পরপর একটা খাবারের দোকান ছিল না।
সপ্তাহে একবার দূরে থাক, মাসে একবার রেস্টুরেন্টে খাওয়াটাই অনেক পরিবারের কাছে বিলাসিতা ছিল।
ঘরের খাবারই ছিল মূল খাবার।
তখনো নদীর পানি, বাতাস এবং পরিবেশ আজকের মতো দূষিত হয়ে যায়নি।
তখনো খাবারে ভেজাল একটা ব্যাপক সামাজিক বাস্তবতা হয়ে ওঠেনি।
মানুষ রাত ৯টা, ১০টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়তো। শহরেও।
অবশ্য তখনকার জীবনের সমস্যাও কম ছিল না।
সাধারণ মানুষের জন্য ডাক্তার দেখানো অনেক কঠিন ছিল।
এক মহল্লায় দুইটা ফার্মেসি থাকাও অনেক জায়গায় স্বাভাবিক ছিল না।
চাকরিজীবীরা সাধারণত দিনে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা কাজ করে বাড়ি ফিরতেন। শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সময় আরও বেশি হতে পারতো।
ছেলেরা প্রচুর খেলাধুলা করতো।
আর খেলা মানেই ছিল শারীরিক পরিশ্রম।
ফুটবল, কাবাডি, ভলিবল, দৌড়, মাঠের খেলা।
মেয়েরা কুতকুত, ফুলটুক্কা, বউছি এবং অন্যান্য ঘরোয়া খেলায় অংশ নিতো।
খেলা ছিল।
শরীর নড়াচড়া করতো।
আজকের মতো সারাদিন বসে থাকা ছিল না।
আর ভ্রমণ?
আজকের মতো ভ্রমণও এত সহজ ছিল না।
বিমানযাত্রা ছিল অনেকের কাছে বিশেষ একটি ঘটনা।
পরিবারের কেউ বিদেশে যাচ্ছে মানে সেটা ছিল বড় খবর।
এয়ারপোর্টে যাওয়া ছিল একটা আলাদা অভিজ্ঞতা।
হাতে কাগজের টিকিট।
পাসপোর্ট।
ভিসা।
ব্যাগের ট্যাগ।
কাউন্টারে দাঁড়িয়ে চেক-ইন।
এয়ারপোর্টে আত্মীয়স্বজনের বিদায়।
কেউ বিদেশ যাচ্ছে শুনলে পুরো পরিবার তাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিতে যেত।
আজকের মতো মোবাইলে অনলাইনে টিকিট কাটা, সঙ্গে সঙ্গে ই-টিকিট পাওয়া, WhatsApp-এ itinerary পাঠানো বা কয়েক মিনিটের মধ্যে fare comparison করা তখন ছিল না।
ট্রাভেল এজেন্টের ওপর নির্ভরতা ছিল অনেক বেশি।
টিকিট, ভিসা, রুট, fare এবং ভ্রমণের পুরো প্রক্রিয়াতেই একজন ভালো ট্রাভেল এজেন্টের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করে। প্রথমে DC-3 দিয়ে শুরু করে, পরে F-27, Boeing 707সহ বিভিন্ন বিমান বহরে যুক্ত হয়। আশির দশকে Fokker 28 এবং DC-10-30 যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের সক্ষমতা আরও বাড়ায়।
অর্থাৎ আশির দশকে বিদেশ ভ্রমণ আজকের মতো mass-market ছিল না।
লন্ডন, জেদ্দা, দুবাই, কুয়ালালামপুর বা সিঙ্গাপুরের নামই অনেক পরিবারের কাছে ছিল দূরের পৃথিবী।
বিদেশ যাওয়া মানে ছিল প্রস্তুতি।
পরিবারের আলোচনা।
কাগজপত্র।
ভিসা।
টিকিট।
আত্মীয়স্বজনের দোয়া।
আর এয়ারপোর্টে বিদায়ের সেই আবেগ।
নব্বইয়ের দশকে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করলো।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়লো।
ব্যবসা বাড়লো।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা বাড়লো।
বিদেশে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়লো।
ট্রাভেল এজেন্সি, এয়ারলাইনস, ভিসা প্রসেসিং এবং আন্তর্জাতিক টিকিটিং ধীরে ধীরে আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায় পরিণত হলো।
১৯৯৩ সালের একটি World Bank তুলনায় বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পর্যটক আগমন প্রায় ১০১ হাজার এবং হোটেল রুমের সংখ্যা প্রায় ৩,০৬৩ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ তখনকার পর্যটন অর্থনীতি আজকের তুলনায় কত ছোট ছিল, তার একটা ধারণা পাওয়া যায়।
আজ আমরা কয়েক মিনিটে একটা ফ্লাইট খুঁজে ফেলি।
একসাথে দশটা airline compare করি।
অনলাইনে ticket issue করি।
মোবাইলে boarding pass রাখি।
Google Maps দিয়ে airport খুঁজে নিই।
ভিডিও কল করে বিদেশে থাকা পরিবারের সঙ্গে কথা বলি।
কিন্তু একটা সময় ছিল যখন বিদেশ ভ্রমণের পুরো প্রক্রিয়াটাই ছিল ধৈর্যের ব্যাপার।
তখন সুবিধা কম ছিল।
কিন্তু জীবনের গতি কম ছিল।
আজ সুবিধা অনেক বেশি।
কিন্তু জীবনের গতি অনেক বেশি।
তখন মানুষ ছিল বেশি active।
আজ মানুষ বেশি informed।
তখন খাবার ছিল সীমিত।
আজ খাবারের availability অনেক বেশি।
তখন চিকিৎসা পাওয়া কঠিন ছিল।
আজ ডাক্তার, হাসপাতাল, ওষুধ এবং emergency care অনেক সহজলভ্য।
তখন মাতৃস্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত ছিল।
আজ maternal healthcare অনেক উন্নত হয়েছে এবং বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।
তখন average height কম ছিল।
আজকের প্রজন্ম তুলনামূলকভাবে লম্বা।
তখন modern fitness science ছিল না।
আজ protein intake, strength training, gym, supplements এবং sports science সম্পর্কে মানুষ অনেক বেশি জানে।
অর্থাৎ অতীতকে শুধু ভালো আর বর্তমানকে শুধু খারাপ বলার সুযোগ নেই।
প্রতিটি সময়ের সুবিধা আছে।
অসুবিধাও আছে।
আশির দশকে আমাদের বড় সমস্যা ছিল খাদ্যাভাব।
মানুষ ছিল।
খাবার ছিল না।
আজ মানুষ আছে।
খাবারও আছে।
কিন্তু অনেকের পরিশ্রম নেই।
ঘুম নেই।
প্রাকৃতিক চলাফেরা নেই।
খাবারের quality নিয়ে প্রশ্ন আছে।
আর আছে প্রতিদিনের chronic stress।
তাই আশির দশকের শরীর হুবহু ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলেও সেই সময়ের কিছু অভ্যাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
আর সেটা করতে কোনো জাদুর দরকার নেই।
হাঁটুন।
খেলাধুলা করুন।
বাসার খাবার খান।
অতিরিক্ত processed food কমান।
সময়মতো ঘুমান।
শরীরকে নিয়মিত ব্যবহার করুন।
প্রয়োজনে আধুনিক চিকিৎসা নিন।
আর ভ্রমণ করুন।
কারণ একটা সময় ভ্রমণ ছিল বিলাসিতা।
আজ ভ্রমণ মানুষের জীবনযাত্রার অংশ।
সময়ের সঙ্গে পৃথিবী বদলেছে।
বাংলাদেশও বদলেছে।
আমাদেরও বদলাতে হবে।
কিন্তু পরিবর্তনের মধ্যেও যেসব সহজ, স্বাভাবিক এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস আমরা হারিয়ে ফেলেছি, সেগুলো আবার ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব আমাদেরই।
মানুষ হিসেবে আমাদের সমস্যাগুলোকে অতিক্রম করে যেতে হবে।