19/10/2025
বুড়িগঙ্গা: কোথায় ছিলে, কোথায় গেলে! ঢাকা: ধ্বংসস্তূপের এক নগরী
একসময়ের 'পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর নগরী' ঢাকা আজ যেন এক যুদ্ধবিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপ। কালের পরিক্রমায় মোগল ও ইংরেজদের বর্ণনায় যে শহরটির তুলনা ছিল না, সেই ঢাকা আজ পরিবেশগত বিপর্যয়ের শিকার।
যে বুড়িগঙ্গা ছিল প্রাণের ধারা:
ইতিহাস বলে, বুড়িগঙ্গা নদী একসময় মোহাম্মদপুরের ঐতিহাসিক সাত গম্বুজ মসজিদের পাশ ঘেঁষে বইতো। মসজিদের ঘাটেই ভেড়ানো হতো নৌকা, চলত জনজীবনের কোলাহল। কিন্তু দখল ও ভরাটের মহোৎসবে সেই বুড়িগঙ্গা আজ মূল চ্যানেল থেকে সরে গিয়ে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পশ্চিমে, বসিলারও পরে কেরানীগঞ্জের সীমানায় সংকুচিত ও দূষিত রূপে কোনোমতে টিকে আছে। মূল বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল (মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার, হাজারীবাগ এলাকা) আজ হয় দখল হয়ে বসতি, নয়তো নর্দমায় পরিণত।
নদী ও খাল বেষ্টিত ঢাকা:
ঢাকার চতুর্দিকে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও বংশী—এই চারটি প্রবাহমান নদী এবং শহরের অভ্যন্তরে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা ৮২টি খাল ছিল ঢাকার প্রকৃতির ঢাল। এই খাল আর নদীপথের কারণেই ঢাকা ছিল বিশ্বের অন্যতম সহজ নৌ-যোগাযোগের শহর। এমনকি টানা দশ বছর বৃষ্টি হলেও এই শহরে জলাবদ্ধতা হতো না—যা ছিল এক অসাধারণ প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা।
বর্তমান করুণ পরিণতি:
আজ সেই নদী ও খালগুলো দখল আর দূষণে মৃতপ্রায়। নগরের খালগুলোর অধিকাংশই বিলীন, ভরাট ও আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ফলস্বরূপ, মাত্র ১৫ মিনিটের বৃষ্টিতেই পুরো শহরে তীব্র জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। নাগরিক দুর্ভোগ এতটাই বেড়েছে যে ঠাট্টা করে প্রশ্ন ওঠে—"জাতীয় সংসদ ভবন কোন নদীর তীরে অবস্থিত?" এই পরিস্থিতি ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং প্রকৃতির ওপর অবিচারকে স্পষ্ট করে তোলে।
প্রকৃতির প্রতি এই অবহেলা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে দিয়ে একটি বাস অনুপযোগী শহরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ঢাকার এই পরিবর্তন যেন এক সুন্দর নগরীর ধ্বংসাবশেষের করুণ উপাখ্যান।
* ছবিতে যা আছে: ১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত সাত গম্বুজ মসজিদ-এর সামনের দিকে কোনো ঘাট বা তীর, যেখানে নদীর কালো জল নয়, স্বাভাবিক স্বচ্ছ জল দেখা যাচ্ছে এবং সেখানে নৌকা বা লঞ্চ ভিড়ানো আছে। মসজিদের পাশ দিয়ে নদী বয়ে যাচ্ছে—এমন চিত্র।
ছবিটির বর্ণনা (সাত গম্বুজ মসজিদ ও বুড়িগঙ্গা নদীর পুরোনো দৃশ্য)
১. স্থাপত্য ও পরিবেশ:
ছবিতে দেখা যাচ্ছে মুঘল স্থাপত্যরীতিতে তৈরি একটি সুন্দর মসজিদ, যা সাত গম্বুজ মসজিদ নামে পরিচিত। মসজিদটি একটি উঁচু প্ল্যাটফর্ম বা টিলার উপর প্রতিষ্ঠিত, যার চারপাশ বাঁধানো প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। প্ল্যাটফর্মের নিচে সবুজ ঘাসযুক্ত জমি রয়েছে, যা সম্ভবত মসজিদের প্রাঙ্গণ।
২. নদীর উপস্থিতি:
সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, মসজিদটি সরাসরি একটি বিশাল জলরাশির তীরে অবস্থিত। এটিই একসময়ের বুড়িগঙ্গা নদী-র সেই প্রশস্ত রূপ। নদীর জল তখন কতটা পরিষ্কার ছিল, তা ছবির দৃশ্য থেকে অনুমান করা যায়। দিগন্তজুড়ে জলরাশি, যার অপর প্রান্ত আবছা দেখা যাচ্ছে। নদীর বিস্তৃতি দেখে বোঝা যায়, এটি এককালে ঢাকার প্রধান নৌপথ ছিল।
৩. নৌযান ও ঘাট:
মসজিদের প্ল্যাটফর্মের ডান পাশে, নদীর সাথে সংযুক্ত একটি বাঁধানো ঘাট দেখা যাচ্ছে। ঘাটের সাথে বড় আকারের কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী নৌকা বা ছোট লঞ্চ ভেড়ানো আছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে এই স্থানটি সে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ যাত্রাপথ বা বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল। দূর দিগন্তে আরও কয়েকটি নৌযান দেখা যাচ্ছে, যা নদীর প্রাণবন্ত চলাচলকে প্রমাণ করে।
৪. সার্বিক আবহাওয়া:
ছবিটির আবহাওয়া মেঘলা বা বর্ষার মাঝামাঝি সময়ের হতে পারে। আকাশজুড়ে মেঘ, যা ছবিটিকে একটি স্নিগ্ধ ও গম্ভীর ভাব দিয়েছে। সবমিলিয়ে, ছবিটি ঢাকার ইতিহাসের এক গৌরবময় সময়ের চিত্র, যখন প্রকৃতি ও স্থাপত্য সহাবস্থান করত।
বর্তমানে ছবির এই অংশে যা আছে:
আপনার আগের বার্তায় দেওয়া তথ্যের মতোই, এই স্থানটির বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। একসময়ের নদী তীর আজ একটি ব্যস্ততম সড়ক ও জনবহুল এলাকায় পরিণত হয়েছে।
১. বুড়িগঙ্গা নদীর অবস্থান:
* ছবিতে যে প্রশস্ত নদীটি দেখা যাচ্ছে, সেটি আর এখানে নেই। নদীটি ভরাট হতে হতে এবং দখলদারিত্বের ফলে মসজিদ থেকে বহু দূরে (প্রায় আড়াই কিলোমিটার পশ্চিমে) সরে গেছে।
* মসজিদের পাশ দিয়ে যে অংশটি বয়ে যেত, সেটিই ছিল আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল। বর্তমানে এই চ্যানেলটি মূলত ভরাট হয়ে যাওয়া একটি সরু নর্দমা বা খাল-সদৃশ জলাধার হিসেবে পরিচিত।
২. ভূমির পরিবর্তন ও স্থাপনা:
* মসজিদের সামনে নদীর জায়গায় এখন বিশাল এলাকা জুড়ে ভূমি ভরাট হয়ে গেছে।
* বর্তমানে এই জায়গাটিতে চলে গেছে ব্যস্ত 'সাত মসজিদ রোড' এবং এর দুই পাশে গড়ে উঠেছে ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকা, যেমন মোহাম্মদপুর, চান মিয়া হাউজিং ও অন্যান্য আবাসন প্রকল্প।
* একসময়ের ঘাট ও তীরবর্তী সবুজ প্রাঙ্গণ এখন ভবন, দোকানপাট, মাদ্রাসা এবং অন্যান্য অবকাঠামোতে ঢাকা পড়েছে।
৩. পরিবেশ ও যোগাযোগ:
* নৌ যোগাযোগের কেন্দ্র এখন পরিণত হয়েছে যানজটপূর্ণ সড়ক পথে।
* ছবির সেই মনোরম শান্ত পরিবেশ আর নেই। এলাকাটি এখন ঢাকার
একটি অন্যতম ব্যস্ত ও কোলাহলপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
সংক্ষেপে, ছবিতে যে নদীর কোল ঘেঁষা শান্ত, প্রশস্ত বুড়িগঙ্গা দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে তার চিহ্নমাত্র নেই। সেখানে এখন সড়ক, গাড়ি, বহুতল ভবন এবং কোলাহলপূর্ণ জনজীবনের ভিড়। এটিই ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং নদী ধ্বংসের করুণতম উদাহরণগুলির মধ্যে অন্যতম।
ছবি : ছবিটি সম্ভবত বিশ শতকের প্রথমার্ধ বা মাঝামাঝি সময়ে (যেমন ১৯৫০ বা ১৯৬০-এর দশক) তোলা হয়েছিল।