17/08/2022
চৌরঙ্গী রেস্টুরেন্ট -
আজ সকালে নাস্তা করলাম পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের পাশেই ৪৭,নর্থব্রুক হল রোডে অবস্থিত ১০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী "চৌরঙ্গী রেস্টুরেন্ট"। নর্থব্রুক হল রোড দিয়ে একটু এগুলোই চোখে পড়বে এই ঐতিহ্যবাহী চৌরঙ্গী রেস্টুরেন্টটি ।
এতো পুরোনো রেস্তোরাঁ কিন্তু এখনো সেই স্টিল প্লেট এবং স্টিল গ্লাস দিয়েই খাদ্য পরিবেশ করা হয়। কালের পরিভ্রমনে অনেক কিছু পরিবর্তন হলে ও তারা তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এখনো।
জানা যায় এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা গোবিন্দ লাল পাল এই চৌরঙ্গী রেস্টুরেন্টটি খোলেন।রেস্টুরেন্ট লেখাটি থাকলেও এখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবার লুচি-ডাল। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই রেস্টুরেন্টটি ছিলো কবি,সাহিত্যিক,সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদদের আড্ডাস্থল।ভোজনরসিক লোকদের জন্য তৈরি হতো লুচি,বুটের ডাল,চা,ডিমের ওমলেট। এলাকার লোকজন ছাড়াও আশেপাশের এলাকার লোকজন এসে ভিড় করতো এ ই রেস্টুরেন্টে।
১৯৭৫ সালে গোবিন্দ লাল পাল মারা গেলে ব্যবসার হাল ধরেন তার সন্তান স্বপন কুমার পাল ও ভোলানাথ পাল। কিন্তু আগের সেই আড্ডা এখন আর নেই।
রেস্টুরেন্টটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে রেস্টুরেন্টের মালিক স্বপন পাল বলেন, বাবা যখন দোকানদারি করতেন তখন এদেশের অনেক জ্ঞানী-গুণী,বিখ্যাত লোকজন এই দোকানে আসতেন এবং খাবারের পরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতেন। এটাই ছিলো তাদের সকলের আড্ডাস্থল।
তিনি বলেন, আমাদের রেস্টুরেন্টে ইংলিশ চ্যানেল বিজয়ী ব্রজেন দাশ, সঙ্গীত পরিচালক সমর দাশ, কবি নির্মলেন্দু গুণ, সৈয়দ শামসুল হক, অভিনেতা প্রবীর মিত্র, দৈনিক সংবাদের সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্ত, বিখ্যাত গায়ক ফকির আলমগীর সহ অনেক নাম করা ব্যক্তিরা এখানে আসতেন। এছাড়া কবি জসীম উদ্দিন বাংলাবাজারে এলেই এখানে আসতেন এক কাপ চা খেতে।
স্বপন পাল জানান, গোবিন্দ লালের সাথে এসব বিখ্যাত ব্যক্তিদের একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিলো আর সে কারণেই তারা এখানে আসতেন। বর্তমানে তারা অনেকেই এখন আর বেঁচে নেই। আবার অনেকে নতুন ঢাকায় চলে গেছেন । একে তো দূরের রাস্তা আবার অন্যদিকে এখানে দিনভর লেগে থাকা তীব্র যানজট, এ কারণেই তারা এখন আর আসেন না ।
রেস্টুরেন্টটিতে লুচি ও ডাল একসাথে দেয়া হয়। লুচির দাম ৫টাকা আর ডাল মাত্র ১০ টাকা। লুচি তৈরির মূল উপাদান হলো ময়দা। ক্রেতাদের চাহিদা সামাল দিতে আগে থেকেই তৈরি থাকে ময়দার খামি। দোকানে ঢুকলেই দেখা যাবে দুইজন কারিগর ব্যস্ত লুচি বেলতে আর একজন শুধু লুচি ভাজছেন। অন্যদিকে ওয়েটারদেরও বিশ্রাম নেবার ফুসরত নেই। সারাক্ষণই ব্যস্ত ক্রেতাদের অর্ডার নেয়ার জন্য। সকলের অর্ডার একটিই লুচি-ডাল।
চৌরঙ্গী রেস্টুরেন্ট প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এবং বিকেল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
চৌরঙ্গী রেস্টুরেন্টের ইতিহাস বলতে গিয়ে স্বপন পাল বলেন, বাবা কিন্তু প্রথমে এখানে দোকানটি দেননি। সর্বপ্রথম দোকানটি ছিলো প্যারিদাস রোডে আর দোকানটি চালাতেন আমার ছোট চাচা কালাচান লাল পাল। যদিও দোকানটির কোনো নাম ছিলো না। পরে বাবা তাকে নিয়ে এসে আবার নতুন করে রেস্টুরেন্টটি খুললেন এবং নাম দিলেন ‘চৌরঙ্গী রেস্টুরেন্ট’।
রেস্টুরেন্টের নাম চৌরঙ্গী কেন রাখা হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমরা জানি না কখনো জিজ্ঞেস করাও হয়নি তিনি যেহেতু বেঁচে নেই এখন তো আর সম্ভব না।
খাবারের মান সম্পর্কে বলতে গিয়ে স্বপন পাল বলেন, সবাই তার দোকানের খাবারের প্রশংসা করে। কিন্তু আমি কথায় বিশ্বাসী নই কাজে বিশ্বাসী। আমি শুধু বলবো আমার বাবার সম্মান যেনো কোনোভাবেই নষ্ট না হয় সেদিকেই লক্ষ্য রাখি।
এটা ছাড়া আর কোনো পেশার সাথে যুক্ত আছেন কী না?এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাবা মারা যাবার পর থেকে আমরা দুইভাই এই ব্যবসার সাথে জড়িত । এটা ছাড়া আমরা আর কিছু করি না। এটাই আমাদের দুই পরিবারের অর্থ আয়ের একমাত্র পথ।