20/09/2026
#বিচক্ষণতা_ও_বুদ্ধিমত্তা_মুমিনের_শক্তি
খন্দকের সেই ভয়াবহ রাত। চারদিকে ঘন অন্ধকার, তীব্র শীত আর শত্রুদের প্রবল উৎকণ্ঠা। এমন এক সংকটময় সময়ে সাহাবী হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) একাই শত্রুশিবিরের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন।
তাঁর দায়িত্ব ছিল শত্রুদের প্রকৃত অবস্থা জেনে ফিরে আসা। কাজটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য ভুলেই তাঁর পরিচয় প্রকাশ হয়ে যেতে পারত।
কিন্তু হুজাইফা (রা.) ছিলেন অসাধারণ প্রজ্ঞা ও উপস্থিত বুদ্ধির অধিকারী। বিপদের মুহূর্তেও তিনি বিচলিত না হয়ে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।
বদর যুদ্ধের আগের একটি ঘটনাতেও তাঁর চরিত্রের এই দিকটি স্পষ্ট হয়।
হুজাইফা (রা.) ও তাঁর পিতা একবার কুরাইশদের হাতে বন্দী হন। মুক্তির সময় কুরাইশরা তাঁদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেয়—তাঁরা বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের সঙ্গে অংশ নেবেন না।
মুক্তির পর তাঁরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে বিষয়টি জানালে হুজাইফা (রা.)-এর মনে ছিল মুসলিমদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা।
কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদের দেওয়া অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার নির্দেশ দেন।
মুসলিম বাহিনীর তখন প্রতিটি দক্ষ মানুষের প্রয়োজন ছিল। তবুও অঙ্গীকার ও নৈতিকতার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি।
এই ঘটনা আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দেয়—পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, একজন মুমিনের নৈতিকতা ও প্রতিশ্রুতির মূল্য কমে যায় না।
এরপর খন্দকের যুদ্ধ।
দীর্ঘ অবরোধে মুসলিমরা ক্ষুধা, শীত ও ক্লান্তিতে অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে ছিলেন। এমন সময় প্রচণ্ড ঝড় এসে শত্রুদের শিবিরে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। তাঁবু উল্টে যায়, আগুন নিভে যায় এবং তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ শত্রুদের প্রকৃত অবস্থা জানতে একজন সাহাবীকে পাঠাতে চাইলেন। কিন্তু সেই ভয়াবহ ঠান্ডা ও ক্লান্তির মধ্যে দায়িত্ব নেওয়া সহজ ছিল না।
অবশেষে হুজাইফা (রা.) সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং শত্রুশিবিরের ভেতরে প্রবেশ করেন।
সেখানে গিয়ে তিনি দেখলেন, শত্রুরা নিজেদের মধ্যে সতর্কতা বাড়িয়েছে। আবু সুফিয়ান সবাইকে নির্দেশ দিলেন—প্রত্যেকে যেন তার পাশের ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করে।
হুজাইফা (রা.) বুঝতে পারলেন, এখন তাঁর পরিচয় প্রকাশ পেলে বিপদ অনিবার্য।
কিন্তু তিনি আতঙ্কিত হলেন না।
পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত একটি কৌশল গ্রহণ করলেন। পাশের ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করার আগেই তিনি নিজেই তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কে?”
হঠাৎ এমন প্রশ্নে লোকটি নিজের পরিচয় জানিয়ে দিল। এভাবে হুজাইফা (রা.) নিজের পরিচয় গোপন রাখতে সক্ষম হলেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে নিরাপদে ফিরে এলেন।
এই ঘটনা শুধু উপস্থিত বুদ্ধির একটি দৃষ্টান্ত নয়; এটি সংকট মোকাবিলারও একটি বড় শিক্ষা।
বিপদের সময় ভয় পাওয়া মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু বিচক্ষণতা হলো—ভয়কে নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না দেওয়া।
হুজাইফা (রা.)-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল আমানতদারি।
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে কিছু গোপন তথ্য ও মুনাফিকদের পরিচয় জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেই তথ্য মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে বেড়াননি। দায়িত্বের সঙ্গে পাওয়া বিষয় দায়িত্বশীলতার সঙ্গেই সংরক্ষণ করেছেন।
কারণ সব সত্য সবার কাছে প্রকাশ করা প্রজ্ঞার পরিচয় নয়।
কখন কথা বলতে হবে, কখন নীরব থাকতে হবে এবং কোন তথ্য নিজের কাছে আমানত হিসেবে রাখতে হবে—এগুলোও একজন মুমিনের বিচক্ষণতার অংশ।
হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.)-এর জীবন তাই আমাদের জন্য অসাধারণ একটি শিক্ষা।
তিনি দেখিয়েছেন— সংকটে শান্ত থাকতে হয়, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হয়, আমানতের হক আদায় করতে হয়, আর প্রয়োজনের মুহূর্তে বিবেচনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
আমাদের জীবনেও এমন অনেক পরিস্থিতি আসে, যেখানে শক্তির চেয়ে প্রজ্ঞা বেশি প্রয়োজন হয়।
সব সমস্যার সমাধান বেশি কথা বলা নয়। কখনো নীরবতা প্রয়োজন, কখনো ধৈর্য, কখনো অপেক্ষা—আবার কখনো মুহূর্তের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি।
তাই কঠিন পরিস্থিতিতে হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন, নিজের দায়িত্ব বুঝুন এবং প্রজ্ঞার সঙ্গে এগিয়ে চলুন।
কারণ একজন মুমিনের শক্তি শুধু তার সাহসে নয়—তার ঈমান, আমানতদারি, ধৈর্য ও বিচক্ষণতার মধ্যেও প্রকাশ পায়।