24/11/2018
বান্দরবান পৌঁছে প্রথম দিন আমরা বান্দরবান সদর ঘুরে দেখেছি। বান্দরবান সদরে হোটেল ভাড়া ১০০০/২০০০ টাকা হবে, হোটেলের মান এবং সদস্য সংখ্যার উপরে নির্ভর করে (বান্দরবান সদরে আমাদের আত্মীয় থাকায় এই খরচটি হয়নি)।
সকালের নাস্তা এবং বিশ্রাম শেষে ১০ টায় বেরিয়ে পড়লাম বান্দরবান সদর ঘুরতে।
নীলাচল, মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র, রুপালী ঝর্ণা এই তিনটি স্থানের জন্য সিএনজি ভাড়া করলাম ৭০০ টাকা, সেখানে এই সিএনজি মাহিন্দা নামে পরিচিত, ধারন ক্ষমতা ৮/৯ জন।
প্রথমে নীলাচল (জনপ্রতি টিকিট ৫০ টাকা), এরপরে মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র (জনপ্রতি টিকিট ৫০ টাকা) এবং শেষে রুপালী ঝর্ণা ঘুরেছি। এদের মধ্যে নীলাচল ছিল সবথেকে সুন্দর।
তিনটি স্থান ঘুরে দুপুরের মধ্যে ফিরে আসলাম।
সন্ধায় বের হয়ে পরের ২/৩ দিন এর জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধ, শুকনো খাবার কিনে নিলাম (স্যালাইন, বিস্কুট, খেজুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, চিড়া, চকলেট )।
রাতের মধ্যে পরের দিনের সকল প্রস্তুতি শেষ করলাম।
২য় দিন :
বান্দরবান সদর থেকে থানচি যাওয়ার লোকাল বাস ছাড়ে সকাল ৮/৮:৩০ টায়, জনপ্রতি ভাড়া ২০০ টাকা, বাসে সময় লাগে ৫ ঘণ্টা। এছাড়া চাঁন্দেরগাড়ি দিয়ে যাইতে সময় লাগবে ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট/ ৩ ঘণ্টা, ভাড়া ৫০০০/৬০০০ টাকা, ধারন ক্ষমতা ১৪/১৫ জন। চাঁদেরগাড়িতে গেলে যাওয়ার সময় চাইলে নীলগিরি ঘুরে যেতে পারেন, নীলগিরিতে টিকিট জনপ্রতি ৫০ এবং চাঁদেরগাড়ি পার্কিং ৩০০ টাকা।
বান্দরবান সদর থেকে থানচি পৌঁছাবার পথে একবার আর্মি এবং একবার বিজিবি চেকিং পরবে, সেখানে নিজেদের পরিচয় লিখিয়ে যেতে হবে।
থানচি পৌঁছে গাইড ঠিক করে নিবেন। আমরা ঢাকা থেকে ফোনেই গাইড ঠিক করে গিয়েছিলাম (নাম : জেকব ত্রিপুরা), গাইড চার্জ ৫০০০ টাকা।
গাইডের সাহায্যে নিয়ে ৩ টার মধ্যে পর্যটক অফিস, থানা (থানায় জমা দেওয়ার ফর্ম ১০০ টাকা) এবং বিজিবি থেকে অনুমতি নিতে হবে ( জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্ম নিবন্ধনপত্র/ স্টুডেন্ট পরিচয়পএের ফটোকপি লাগবে )।
অনুমতি নেওয়ার পরে দুপুরের খাবার শেষ করতে হবে এবং যতটা সম্ভব খাবার পানি সাথে নিয়ে যেতে হবে।
এখন বোট/ট্রলার ভাড়া করতে হবে, গাইড নিজেই
বোট ভাড়া করবে। বোট ভাড়া করবে এমন ভাবে যে, বোট প্রথম দিন থানচি থেকে পদ্নমূখ রেখে আসবে এবং শেষ দিন রেমাক্রি থেকে আবার থানচি ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। বোটে ধারন ক্ষমতা ৫জন (বোট চালক বাদে) এক্ষেত্রে বোট প্রতি ভাড়া সব মিলিয়ে ৪,০০০ টাকা, আমাদের ২টি বোট ছিল তাই ভাড়া ৮,০০০ টাকা।
বোটে করে থানচি থেকে পদ্নমূখ যেতে সময় লাগে ২৫/৩০ মিনিট।
পদ্নমূখ থেকে আসল পরিশ্রম শুরু, পদ্নমূখ থেকে পায়ে হাঁটা শুরু।
পদ্নমূখ থেকে – পদ্নঝিরি হয়ে – রোনাজুনপাড়া হয়ে – হরিচন্দ্রপাড়া হয়ে পৌঁছাবেন জিন্নাপাড়া অথবা থুইচাপাড়া। সময় লাগবে ৭/৮ ঘণ্টা।
আমরা ৩ টায় পদ্নমূখ থেকে হাঁটা শুরু করি রাত ১১ টায় জিন্নাপাড়া গিয়ে পৌঁছাই। গাইড আগে থেকেই জিন্নাপাড়াতে আমাদের জন্য থাকা-খাওয়ার জায়গা ঠিক করে রেখেছিল।
থুইচাপাড়া/জিন্নাপাড়াতে একদিনের থাকার খরচ জনপ্রতি ১৫০ টাকা এবং প্রতিবেলা খাবার খরচ ১২০/১৫০ টাকা।
গাইডের থাকা-খাওয়ার খরচ নিজেদের প্রদান করতে হবে।
* ছুটির দিন এবং মৌসুম বিবেচনা করে বান্দরবান থেকে থানচির চাঁন্দের গাড়ি ভাড়া ও থানচি থেকে রেমাক্রির ট্রলার ভাড়া কম বেশি হতে পারে।
* এই যাত্রার সবথেকে কঠিন পর্বটি ছিল এই পদ্নমূখ থেকে জিন্নাপাড়াতে পৌঁছানো, এর জন্য প্রয়োজন অশেষ ধৈর্যশক্তি।
* প্রচুর পরিমানে জোক রয়েছে, সাথে ছুরি/কেঁচি এবং লবণ নিতে ভুলবেন না।
৩য় দিন :
আমিয়াখুম যাওয়ার দিন।
আমিয়াখুম যাওয়ার জন্য গাইড জিন্নাপাড়ার আরেকজন গাইডকে (নাম : রাজ) ঠিক করে দেয়, নতুন গাইডের চার্জ প্রথম গাইড প্রদান করে থাকে।
গাইড আমাদের সকাল ৭ টার মধ্যে উঠিয়ে দেয়, সকালের খাবার শেষ করে নিজেদের সাথে খাবার পানি এবং শুকনো খাবার নিয়ে নেই।
আমিয়াখুম যাওয়ার উদ্দেশ্যে নতুন গাইডের সাথে ৮ টায় জিন্নাপাড়া থেকে রওনা হই। জিন্নাপাড়া থেকে আমিয়াখুম যেতে সময় লাগে ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট/৩ ঘণ্টা। জিন্নাপাড়া থেকে আমিয়াখুম যাওয়া-আসার মোট সময় লাগে ৭/৮ ঘণ্টা।
আমিয়াখুম যাওয়ার মধ্যে সবথেকে কঠিন কাজ ছিল ‘দেবতা পাহাড়’, দেবতা পাহাড় থেকে নিচে নামাটা খুব খুব কঠিন। দেবতা পাহাড় একদম খাড়া এবং ভয়ংকর, দেবতা পাহাড় থেকে নিচে নামতে সময় লাগে ১ ঘণ্টা থেকে বেশি।
দেবতা পাহাড় থেকে নেমে আগে গিয়েছিলাম ‘ভেলাখুম’। ভেলাখুম যাওয়ার জন্য দেবতা পাহাড়ের নিচে রয়েছে ভেলা। ভেলাতে করে ভেলাখুম যাওয়ার খরচ ৩০০-৫০০ টাকা তবে এই টাকা গাইড নিজেই প্রদান করবে ভেলাচালককে। ভেলাখুম গিয়ে ঘুরে আসতে সময় লাগবে ৪০/৪৫ মিনিট।
ভেলাখুম ঘুরে আবার দেবতা পাহাড়ের নিচে আসলাম, সেখান থেকে আমিয়াখুম জলপ্রপাত যেতে ৫/৭ মিনিট লাগে।
অবশেষে পৌঁছে গেলাম স্বপ্নের ‘আমিয়াখুম’।
আমিয়াখুমের সৌন্দর্য বলে বা লিখে বুঝানো যাবে না, যে নিজে চোখে দেখেছে শুধু সেই বলতে পারবে
সৃষ্টিকর্তা কি সৃষ্টি করেছেন, “মাশা-আল্লাহ”।
আমিয়াখুম থেকে সাতভাইখুম যাওয়া যায় ভেলাতে করে, কিন্তু সময়ের সল্পতা এবং বৃষ্টির কারনে আমরা যেতে পারিনি ।
আমিয়াখুমের সৌন্দর্য দেখে আবার জিন্নাপাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হই। দেবতা পাহাড় নামার তুলনায় উঠা অনেক সহজ, দেবতা পাহাড় উঠতে ২৫/৩০ মিনিট সময় লাগে। এরপরে হাঁটতে হাঁটতে ৪ টার মধ্যে জিন্নাপাড়া ফিরে আসলাম এবং ২য় গাইড রাজ দাদাকে বিদায় জানালাম ।
৪র্থ দিন :
নাফাখুম যাওয়ার দিন।
নাফাখুম যাওয়ার জন্যে গাইড আমাদের সকাল ৬ টায় উঠিয়ে দিলেন। সকালের খাবার শেষ করে ৭:৩০ এর মধ্যে সকল প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম।
জিন্নাপাড়া থেকে ৭:৩০ এ যাত্রা শুরু করলাম। জিন্নাপাড়া থেকে উল্হাউপাড়া হয়ে উলাচিংপাড়া হয়ে নাফাখুম যেতে সময় লাগে ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট/৩ ঘণ্টা। নাফাখুম যাওয়ার পথে ৬/৭ বার পায়ে হেঁটে নদী পার হতে হয়, নদীতে পানি কোমর সমান হবে। ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট/৩ ঘণ্টা হাঁটার পরে পৌঁছে গেলাম প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য নাফাখুম জলপ্রপাত।
নাফাখুমে ৩০/৪০ মিনিট সৌন্দর্য উপভোগ করার পরে রেমাক্রির উদ্দেশ্যে। নাফাখুম থেকে হেডমানপাড়া এরপরে পিনিডংপাড়া হয়ে রেমাক্রি যেতে সময় লাগে ২/২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। তবে নাফাখুম থেকে ৩০ মিনিট হাঁটার পরে বোট পাওয়া যেতে পারে, সেখান থেকে বোটে করে রেমাক্রি যেতে সময় লাগে ২৫/৩০ মিনিট, বোটপ্রতি ভাড়া ৫০০ টাকা।
রেমাক্রি পৌঁছাবার পরে সেখানে আমাদের জন্যে সেই প্রথম দিনের ২টি বোট অপেক্ষা করছিল, রেমাক্রি থেকে সেই বোটে থানচির উদ্দেশ্যে রওনা হই। রেমাক্রি থেকে তিন্দু হয়ে থানচি পৌঁছাতে সময় লাগে ২ ঘণ্টা।
রেমাক্রি থেকে থানচি যাওয়ার পথে তিন্দুতে চোখে পরবে বিশাল আকৃতির পাথর নাম ‘বড় পাথর’। স্থানীয়রা বড় পাথরকে অনেক সন্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শক করে।
২ ঘণ্টার মধ্যে থানচি পৌঁছে গেলাম, থানচি পৌঁছাবার পরে গাইডের সাথে পর্যটক অফিসে গিয়ে দুপুরের খাবার শেষ করলাম।
৩ টার পরে থানচি থেকে বান্দরবান যাওয়ার জন্যে বাস পাওয়া যায় না, তাই থানচি থেকে বান্দরবানের জন্যে চাঁন্দের গাড়ি ভাড়া করলাম ৪,০০০ টাকা দিয়ে।
এবার গাইড জেকব দাদাকে বিদায় জানিয়ে চাঁন্দের গাড়িতে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে রওনা হই। ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের মধ্যে বান্দরবান সদরে পৌঁছেযাই। বান্দরবান সদর থেকে ঢাকা ফিরে আসার জন্যে রাত ৯:৩০ এর বাসের টিকেট করি।
বান্দরবান সদর থেকে রাত ৯:৩০ এ বাস ছাড়ে অতিরিক্ত জ্যাম এর কারনে ঢাকাতে আসে পৌঁছাই ৯ টায়।
যাত্রা শেষ (26 September 2018) |
* জনপ্রতি সবমিলিয়ে খরচ ৬০০০-৬৫০০ টাকা।
* গাইডের ফোন নাম্বার : 01554648036 (জেকব ত্রিপুরা)
পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতাঃ
প্রতিটি জায়গা অনেক পরিষ্কার, আপনার ব্যবহৃত পন্যের উচ্ছিষ্ট, ময়লা-আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন। জায়গা না থাকলে পকেটে করে নিয়ে আসুন।
ধন্যবাদ ❤️