19/08/2020
সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাওয়া বন্ধ ও এর প্রতিবাদ 🤜🤛
পর্যটন খাতে দেড় হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হুমকির মুখে!!
টেকনাফের প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাওয়া বন্ধ হলে স্থানীয় বাসিন্দা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ প্রায় তিন লাখ মানুষ জীবিকা হারাবে। হুমকির সম্মুখীন হবে পর্যটন খাতে বিনিয়োগকারীদের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। তাই সেন্টমার্টিন দ্বীপ নিয়ে সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক)।
তারা বলেছেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটকদের ভ্রমণ সীমিতকরণ বা রাতযাপনে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হলে পর্যটন শিল্পে নিয়োজিত ৭-৮টি জাহাজ, তিন শতাধিক বাস-মাইক্রোবাস, ২০০ ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান, ৪ শতাধিক টুরিস্ট গাইড এবং দ্বীপের ১২০টি হোটেল-কটেজ ও ৭০টি রেস্তোরাঁয় কর্মরতদের জীবন-জীবিকা বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত মঙ্গলবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে কথাগুলো উপস্থাপন করেছে পর্যটনভিত্তিক সংগঠন টুয়াক।
টুয়াক সভাপতি তোফায়েল আহম্মেদের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন কার্যকরী কমিটির প্রধান উপদেষ্টা মুফিজুর রহমান মফিজ। তিনি বলেন, সরকার ২০০৯ সালে পর্যটনকে থ‘শিল্প’ ঘোষণার পর থেকে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে সম্পূর্ণ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পর্যটন শিল্প বিকশিত হয়েছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটন বিকশিত হওয়ার আগে স্থানীয় জনগোষ্ঠী সমুদ্র থেকে মাছ আহরণের পাশাপাশি প্রবাল উত্তোলন, প্রবাল পাথরকে নির্মাণ কাজে ব্যবহারের জন্য উত্তোলন করে বিক্রি, মাছের অভয়ারণ্য ধ্বংস, শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করে বিক্রি, কাছিমের আবাসস্থল নষ্ট করাসহ বিভিন্ন উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করত। সেন্টমার্টিনে পর্যটন শিল্প বিকশিত হওয়ার পর ওই জনগোষ্ঠী বিকল্প জীবিকায়ন হিসেবে কর্ম পাওয়ায় তাদের জীবনধারায় আমূল পরিবর্তন আসে এবং তারাই পরিবেশ রক্ষায় সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে ২০১৬ ও ২০১৭ সালকে পর্যটনবর্ষ ঘোষণা করার ফলে সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাসিন্দারা উৎসাহিত হয়ে তাদের বাসা-বাড়ির এক-দুই রুম পরিবেশবান্ধব অতিথিশালা তৈরি করে পর্যটক সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। দ্বীপকে ভালোবেসে বার্ষিক মাত্র ৫ মাসের ব্যবসা করার ঝুঁকি নিয়ে উদ্যোগক্তারা বিপুল বিনিয়োগ করেছেন। উল্লেখ্য, সেন্টমার্টিন দ্বীপকে প্রতিবেশ সঙ্কটপন্ন এলাকা ঘোষণার আগেই নির্মিত ৭-৮টি বিল্ডিং ছাড়া বাকি সব স্থাপনা সেন্টমার্টিন দ্বীপের ভারসাম্য রক্ষার উপযোগী ইকো টুরিজম ব্যবস্থাপনায় নির্মিত।
গত ৬ আগস্ট জুম মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয় যে, প্রতিদিন মাত্র ১২৫০ পর্যটক সেন্টমার্টিন দ্বীপ দিবাকালীন ভ্রমণ করতে পারবে কিন্তু রাত যাপন করতে পারবেন না। সংবাদটি সেন্টমার্টিন দ্বীপনির্ভর পর্যটন ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উদ্বিগ্ন ও বিস্মিত করেছে। পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন ৭-৮টি জাহাজের মাধ্যমে ৪-৫ হাজার পর্যটক দ্বীপটিতে ভ্রমণ করেন। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ পর্যটক সেখানে রাতযাপন করেন।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলেন, এমনিতেই করোনাভাইরাসের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাভাবে আমরা পর্যটন ব্যবসায়ীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতির স্বীকার হয়েছি। এখনো পর্যন্ত সরকারি বা অন্য কোনো সংস্থা থেকে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার সহায়তা বা প্রণোদনা পাইনি। দ্বীপকে ঘিরে পর্যটন ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করলেও এখনো লগ্নিকৃত বিনিয়োগ উত্তোলনের সুযোগই আসেনি। তাই এই মুহূর্তে এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশীয় পর্যটন শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি পর্যটন নির্ভর দ্বীপবাসিরা জীবিকা হারালে আবারো পরিবেশ ধ্বংসকারী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে যেতে পারে।
সেন্টমার্টিন দ্বীপকে পরিবেশবান্ধব পর্যটন স্পট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। প্রস্তবনাগুলো হলোÑ ১. পর্যটন মৌসুমে সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রতিদিন ২৫০০ পর্যটক দিবাকালীন এবং ১৫০০ পর্যটক রাত যাপন ও ভ্রমণ অনুমতি প্রদান করলে পর্যটন ও পরিবেশ উভয়েই সুরক্ষিত থাকবে। ২. ইতোমধ্যে টুয়াক সেন্টমার্টিনকে প্লাস্টিক ফ্রি করার জন্য ‘প্লাস্টিক ফ্রি ইকো টুরিজম কক্সবাজার’ নামক একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। যা বাস্তবায়িত হলে দ্বীপের প্রতিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি হতে রক্ষা করা সম্ভব হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি অনুমোদন ও আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন। ৩. সেন্টমার্টিন দ্বীপে বসবাসকারী স্থানীয় প্রায় ১৫ হাজার জনগোষ্ঠীকে আগামী ৫ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে দ্বীপ থেকে অন্যত্র পুনর্বাসন এবং পর্যটননির্ভর দ্বীপবাসী ও ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা গ্রহণ। ৪. সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার আগে সংশ্লিষ্ট ট্যুর অপারেটর, পর্যটক পরিবহন ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হোটেল ব্যবসায়ী ও জাহাজ ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ ফিরে পাওয়ার ব্যবস্থা। ৫. সেন্টমার্টিন দ্বীপের প্রতিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে হোটেল-মোটেলের বর্জ্য সরাসরি সমুদ্রে পতিত হচ্ছে। হোটেলগুলোতে এসটিপি প্ল্যান বাস্তবায়নের মাধ্যমে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত রক্ষার পদক্ষেপ গ্রহণ।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেনÑ টুয়াকের ফাউন্ডার চেয়ারম্যান এম এ হাসিব বাদল, উপদেষ্টা কামরুল ইসলাম, সৈয়দুল হক কোম্পানি, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এস এম কিবরিয়া খান, সিনিয়র সহসভাপতি আনোয়ার কামাল, যুগ্ম সম্পাদক আল আমীন বিশ্বাস, মুনীবুর রহমান টিটু, এস এ কাজল উপস্থিত ছিলেন।