19/08/2026
কোলকাতার হোটেলে আগুন!নিহত অনেক বাংলাদেশি,দায়ী কারা?
কলকাতার হোটেল অগ্নিকাণ্ড: ভ্রমণকারীদের জন্য বড় সতর্কবার্তা
কলকাতার নিউ মার্কেটের পাশের মির্জা গালিব স্ট্রিটে একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের সবাই বাংলাদেশি নাগরিক বলে পুলিশ জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও একটি শিশুও রয়েছে। আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
এই ঘটনাটি শুধু একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি আমাদের মতো বিদেশে ভ্রমণকারী মানুষদের জন্য একটি বড় শিক্ষা এবং সতর্কবার্তা।
আমি নিজে কলকাতার নিউ মার্কেট, মির্জা গালিব স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ও আশপাশের এলাকার অনেক হোটেল দেখেছি। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি—এই এলাকার অনেক পুরোনো ও কমদামি হোটেল এমন ভবনে পরিচালিত হয়, যেখানে আধুনিক হোটেলের মতো পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতিতে বের হওয়ার ব্যবস্থা চোখে পড়ে না।
অনেক জায়গায় ভবনগুলো পুরোনো, রাস্তা ও গলিগুলো অত্যন্ত সরু, সিঁড়িও সংকীর্ণ। একই ভবনে একাধিক আবাসিক হোটেল বা বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা পরিচালিত হতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও ভবনের আশপাশে বার বা অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—আগুন লাগলে আমরা যেভাবে ভাবি, বাস্তবে পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।
বিশেষ করে রাতের বেলা মানুষ যখন গভীর ঘুমে থাকে, তখন আগুনের চেয়ে ধোঁয়াই অনেক সময় বড় ঘাতক হয়ে দাঁড়ায়। দরজা খুলে বের হওয়ার আগেই যদি পুরো করিডোর বা সিঁড়ি ধোঁয়ায় ভরে যায়, তাহলে একটি সরু সিঁড়িই হয়ে যেতে পারে মৃত্যুফাঁদ।
এই ঘটনার ক্ষেত্রেও প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ধোঁয়ার কারণে অনেকেই আটকা পড়েছিলেন এবং উদ্ধার করা কয়েকজনকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্ত ও তদন্তের পর আরও পরিষ্কার হবে।
তাহলে দায়ী কারা?
এই প্রশ্নের উত্তর তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে দেওয়া উচিত নয়।
আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, হোটেলের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা কেমন ছিল, অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন ছিল কি না, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা ছিল কি না, ভবনের ব্যবহার নিয়ম অনুযায়ী ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখতে হবে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার:
হোটেল ব্যবসা শুধু একটি রুম, একটি বিছানা আর একটি বাথরুমের ব্যবস্থা করলেই শেষ নয়। মানুষের জীবন রক্ষার জন্য অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করাও হোটেল কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
আর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো—যে ভবনে শত শত মানুষ রাত কাটাচ্ছেন, সেটি নিরাপদ কি না নিয়মিত পরীক্ষা করা।
শুধু দুর্ঘটনা ঘটার পর অভিযান বা তদন্ত করলেই হবে না। দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ হোটেলগুলো চিহ্নিত করতে হবে।
তবে সবচেয়ে বড় শিক্ষা আমাদের, অর্থাৎ ভ্রমণকারীদের জন্য
আমরা অনেক সময় হোটেল বুক করার সময় শুধু দেখি—
দাম কত?
নিউ মার্কেটের কত কাছে?
রুম সুন্দর কি না?
AC আছে কি না?
Wi-Fi আছে কি না?
কিন্তু খুব কম মানুষ জিজ্ঞেস করি—
জরুরি অবস্থায় বের হব কীভাবে?
বিদেশে হোটেল নেওয়ার সময় অন্তত এই বিষয়গুলো খেয়াল করুন:
✅ হোটেলে একাধিক বের হওয়ার পথ আছে কি না।
✅ জরুরি Exit বা Emergency Exit কোথায়, সেটি আগে দেখে নিন।
✅ আপনার রুম থেকে সিঁড়ি কত দূরে, সেটা জেনে নিন।
✅ সম্ভব হলে সিঁড়ির কাছাকাছি রুম নিন।
✅ করিডোর বা সিঁড়ি অতিরিক্ত সরু কি না দেখুন।
✅ Fire extinguisher কোথায় আছে খেয়াল করুন।
✅ হোটেলে Smoke Alarm আছে কি না দেখুন।
✅ রুমে ঢোকার পর দরজা বন্ধ করে শুধু ঘুমিয়ে পড়বেন না—জরুরি অবস্থায় কোন পথে বের হবেন, সেটা কয়েক মিনিট সময় নিয়ে বুঝে নিন।
✅ পরিবার নিয়ে গেলে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের রুমের অবস্থান ও বের হওয়ার পথ বিশেষভাবে বিবেচনা করুন।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
শুধু কম দাম দেখে হোটেল নির্বাচন করবেন না।
১০০০ বা ১৫০০ টাকা বাঁচাতে গিয়ে এমন একটি হোটেলে থাকা উচিত নয়, যেখানে বিপদের সময় বের হওয়ার নিরাপদ পথ নেই।
কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—ভ্রমণের সময় হোটেল শুধু থাকার জায়গা নয়, এটি আপনার সাময়িক আশ্রয়স্থল। আর সেই আশ্রয় কতটা নিরাপদ, সেটাও আপনার জানা দরকার।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনো একটি এলাকার সব হোটেলকে একইভাবে অনিরাপদ বলা ঠিক হবে না। কিন্তু যেখানে ভবন পুরোনো, রাস্তা-গলি অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, সেখানে প্রশাসনের কঠোর পরিদর্শন এবং পর্যটকদের অতিরিক্ত সতর্কতা—দুটিই প্রয়োজন।
আজ যারা কলকাতা যাচ্ছেন, বিশেষ করে নিউ মার্কেট, মির্জা গালিব স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট বা আশপাশে কম বাজেটের হোটেল নিচ্ছেন—দয়া করে হোটেল বুক করার আগে শুধু রিভিউ ও দাম দেখবেন না। নিরাপত্তাটাও দেখুন।
কারণ,
ভালো একটি ট্রিপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নিরাপদে ফিরে আসা।
আল্লাহ এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহতদের ক্ষমা করুন, তাদের পরিবারকে এই শোক সহ্য করার শক্তি দিন এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা দান করুন।
সতর্ক থাকুন, নিরাপদে ভ্রমণ করুন।
নিচের ছবি গুলো কোলকাতার একটি নাগরিক ফেসিলিটিস হোটেল এর। যেটা ভালো হোটেলের আদর্শিক হতে পারে।