31/08/2025
"সোনার বাংলা"
:: পর্ব:- উত্থান ::
১৬শ ও ১৭শ শতকে বিশ্বের রেশম ও সুতির বস্ত্র, ইস্পাত, সল্টপিটার এবং কৃষি ও শিল্পজাত পণ্যের অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারক ছিল সুবে বাংলা। এশিয়া থেকে ডাচ আমদানির শতকরা ৪০ ভাগ যেতো এখান থেকে। একই সাথে বিশ্বব্যাপী মসলিন, পাট এবং রেশম ব্যবসার কেন্দ্র হয়ে ওঠে ঢাকা। গুণগতমানের জন্যে বিশ্ববাজারে বাংলার পাট এবং তুলার ছিল প্রচুর চাহিদা।
ধীরে ধীরে মুঘল দরবারের আর্থিক মেরুদণ্ড হয়ে আবির্ভূত হয় সুবে বাংলা; রাজকোষে প্রবাহিত অর্থের অর্ধেকেরও বেশি এখান থেকে যেতো।
অভ্যন্তরীণভাবে, ভারতের বেশিরভাগ অংশই চাল, রেশম এবং সুতির বস্ত্রের মতো বাঙালি পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ছিল। বিদেশে, ইউরোপীয়রা তুলা বস্ত্র, সিল্ক এবং আফিমের মতো বাঙালি পণ্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
সমসাময়িক সময়ে বাংলায় জাহাজ নির্মাণ ছিল বিশাল এক শিল্প। বহির্বিশ্বে এখানকার জাহাজ মেরামতের কাজকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করা হত। অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ ইন্দ্রজিৎ রায়ের মতে, বস্ত্র উৎপাদন এবং জাহাজ নির্মাণের মতো শিল্পে বিশ্বব্যাপী আমরা সমাদৃত ছিলাম। মূলত এই সময়ই বাংলার আদি-শিল্পায়ন (Proto - Industrialization) শুরু হয়।
এই সময়ের বাংলার চাল বহনকারী জাহাজগুলোর কাঠামো আরো শক্তিশালী ও মজবুত করার জন্যে সংযুক্ত পাটাতনের নকশা ব্যাবহার করা হয়। বাঙালির উদ্ভাবিত এই কৌশলের বাস্তব সফলতা দেখে পরবর্তীতে ১৭৬০-এর দশকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই নতুন নকশা অনুকরণ করে, ফলে পরবর্তী ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় জাহাজগুলির সমুদ্র উপযোগিতা এবং নৌচলাচলের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে।
এছাড়াও বাংলায় তৈরি জাহাজ ব্রিটিশদের পক্ষে ১৮০৫ সালের ট্রাফালগার নৌযুদ্ধ আর অটোমানদের পক্ষে ১৮০৬ সালের রুশ - অটোমান যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়।
:: পর্ব:- পরিকল্পিত পতন ::
ঐতিহাসিক আর. সি. দত্তের মতে, "বাংলার লুণ্ঠন ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লবে সরাসরি অবদান রেখেছিল।" বাংলা থেকে সংগৃহীত মূলধন শিল্প বিপ্লবের সময় ব্রিটিশ শিল্পে বিনিয়োগ করা হয়। প্রথম শিল্পবিপ্লবের সময় ১৮৩০ থেকে ১৮৫০ এর দশকে বাংলায় গড়ে ওঠা শিল্পগুলোকে পদ্ধতিগত ও পরিকল্পিত ভাবে ভেঙে ফেলা হয়।
আগে বাংলা বস্ত্র শিল্পে, বিশেষ করে মসলিন শিল্পে, বিশ্বব্যাপী শীর্ষস্থানীয় ছিল। ব্রিটিশরা তাদের নিজস্ব বস্ত্র শিল্পের সাথে প্রতিযোগিতা দূর করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এই শিল্পকে ভেঙে দেয়।
উচ্চ খাজনা এবং ভারী করের বোঝায় কৃষি জমি উন্নয়নের জন্য চারপাশে মূলধনের অভাব তৈরি হয়। মহাজনদের ঋণের জালে আটকে উনিশ শতকে বাংলার কৃষি উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
এদিকে সমৃদ্ধ শিল্পগুলিকে ধুলিস্মাৎ করে বাংলাকে ব্রিটেনের কাঁচামাল সরবরাহকারী এবং পণ্যের বাজারে রূপান্তরিত করা হয়। ফলে একসময়ের সমৃদ্ধ অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে যায়, চারপাশে ব্যাপক দারিদ্র্যতা ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে এদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়।
১৭৭০ সালে পর্যাপ্ত খাদ্য থাকা সত্ত্বেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৃষ্ট বাংলার মহাদুর্ভিক্ষে আনুমানিক ১ কোটি মানুষ মারা যায়। আর ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষে বাংলায় প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ মারা যায়।
এই পদ্ধতিগত অবহেলা, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও শোষণমূলক নীতির কারণে, নিশ্চিত হয় বাংলা যেন দরিদ্র্য থাকে।
হারিয়ে যায় "সোনার বাংলা"।
অনুবাদ ও লেখা - শূন্য সাগর
Heritage Hike Bangladesh
Hendrik van Schuylenburgh: The Trading Post of the Dutch East India Company in Hooghly, Bengal (1665)