31/07/2026
‘নিভৃত এক হজের স্মৃতি: একখণ্ড তাফসির এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা
সালটা ছিল ২০১৬। জীবনের এক স্মরণীয় মুহূর্তে আমরা হজের সফরে পবিত্র মক্কায় উপস্থিত হলাম। আমাদের কাফেলাটি ছিল বেশ বড়—একজন বিজ্ঞ আলেম বা স্কলার এবং নব্বই জন সাথী। আমাদের কাফেলার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল যে, এখানকার প্রায় প্রতিটি মানুষ দ্বীন পালনের ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক, জ্ঞানপিপাসু এবং পড়াশোনার প্রতি যথেষ্ট আগ্রহী।
সেই সময়ে সৌদি আরব থেকে একটি বিশেষ তাফসির প্রকাশিত হওয়ার সংবাদ বেশ 'ভাইরাল' হয়ে পড়ে। সেই তাফসিরটি ছিল সহীহ হাদীস ভিত্তিক। প্রচলিত অনেক তাফসিরের ভুলগুলো চিহ্নিত করে বাংলাভাষী মানুষদের জন্য মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় ও সৌদি সরকার এই মহতী উদ্যোগ নিয়েছিল। আমরা জানতে পারলাম, মক্কা-মদীনার নির্দিষ্ট কিছু স্থানে এই তাফসিরটি বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। আমাদের কাফেলার সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ালো এই অমূল্য সম্পদটি সংগ্রহ করা।
মক্কার সেই ব্যাকুল অনুসন্ধান
মক্কায় পৌঁছে ওমরাহ শেষ করেই আমাদের শুরু হলো এক নীরব যুদ্ধ—তাফসির সংগ্রহের যুদ্ধ। প্রথমে আমরা গেলাম মসজিদুল হারামের বিশাল লাইব্রেরিতে। সেখানকার দায়িত্বশীলদের কাছে খোঁজ নিতেই তারা নিরাশ করে বললেন, "ভাই, আমাদের স্টক শেষ হয়ে গেছে।" আমরা দমে গেলাম না। হারামের আশপাশের সব দোকানে তন্নতন্ন করে খুঁজলাম, কোথাও নেই।
অবশেষে হারামের লাইব্রেরির একজন তত্ত্বাবধানকারীর সাথে সখ্যতা গড়ে তুললাম। তাকে বললাম, "ভাই, আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি, যদি এক কপিও আমাদের জন্য ব্যবস্থা করে দিতেন!" তিনি আমাদের ভেতরে নিয়ে গেলেন। চারদিকে হাজার হাজার দাওয়াতি বই রাখা, যা মানুষকে ফ্রিতে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তিনি আলমারি দেখিয়ে আক্ষেপ করে বললেন, "এখানে সব বই-ই ফ্রিতে দেওয়ার জন্য, কিন্তু ওই তাফসিরটি আমাদের কাছে এখন আর নেই। যা দু-এক কপি আছে তা শুধু লাইব্রেরিতে বসে পড়ার জন্য।"
ভীষণ মন খারাপ হলো আমাদের। তিনি আমাদের সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, "আপনারা যখন মদীনায় যাবেন, সেখানে খোঁজ নেবেন। যেহেতু এটি মদীনা থেকে প্রিন্ট হয়, ইনশাআল্লাহ সেখানে পাবেন।" ২০ দিন মক্কায় অবস্থানের পর আমরা বুক ভরা আশা নিয়ে মদীনার পথে রওয়ানা হলাম।
মদীনার দিনগুলো এবং ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি
মদীনায় পৌঁছেই আমরা যেন হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। মসজিদে নববীর লাইব্রেরিতে গেলাম বারবার। কিন্তু প্রতিবারই উত্তর এলো— "সব শেষ।" আমরা তো ছাড়ার পাত্র নই; একদিন পর আবার গেলাম, দুইদিন পর আবার গেলাম। ভাবলাম হয়তো নতুন কেউ দায়িত্ব পালন করছে বা স্টক এসেছে। কিন্তু ফল শূন্য।
আমাদের কাফেলার কয়েকজন তো সরাসরি কিং ফাহাদ প্রিন্টিং প্রেসে চলে গেলেন। সেখান থেকে জানানো হলো যে, বর্তমানে এটার মুদ্রণ বন্ধ আছে এবং তাদের হাতে কোনো কপি অবশিষ্ট নেই। মদীনার শেষ দিনগুলো ঘনিয়ে এলো, অথচ আমাদের শূন্য হাত পূর্ণ হলো না।
সেই জুতা হাতে নেওয়া মুহূর্ত এবং এক ঐশী উপলব্ধি
মদীনা থেকে বিদায় নেওয়ার আগের দিন। আসরের সালাত শেষ করে আমি মসজিদে নববী থেকে বের হওয়ার জন্য হাটছি। হাতে জুতা জোড়া নিয়েছি, ঠিক এমন সময় মাথার মধ্যে বিদ্যুতের মতো একটা চিন্তা খেলে গেল—
"আমরা পৃথিবীর সব চেষ্টা করলাম, সব দরজায় কড়া নাড়লাম; কিন্তু যিনি এই ঘরের মালিক, তাঁর কাছে তো চাইলাম না! আমি তো এখন মুসাফির, আর মুসাফিরের দোয়া তো আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না।"
এক গভীর অপরাধবোধ আমাকে গ্রাস করল। আমার আল্লাহর কাছে চাইতেই ভুলে গেলাম? আমি সাথে সাথে জুতা জোড়া আবার রেখে ফিরে গেলাম। আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে চাইলাম, "হে আল্লাহ! আপনার কালাম বোঝার জন্য এবং বিশুদ্ধ জ্ঞান দিয়ে নিজেদের জীবন আলোকিত করার জন্য আমরা এই তাফসিরটি খুঁজছি। আমাদের দেশে এমন সঠিক তাফসিরের বড় অভাব। আপনি আমাদের খালি হাতে ফিরিয়ে দেবেন না।"
দোয়া শেষ করে আবার বের হওয়ার জন্য হাটছি, তখন মনের মধ্যে খটকা লাগল— আল্লাহ তো আর আকাশ থেকে তাফসির ফেলে দেবেন না, আমাকে তো আবার কোথাও গিয়ে চাইতে হবে। কিন্তু কার কাছে চাব? যারা রিফিউজ করেছে তাদের কাছেই আবার? না, আমি আর চাইতে পারবো না। লজ্জা ও দ্বিধা নিয়ে যখন মসজিদের দরজার কাছে এলাম, জুতা পড়বো, তখন হঠাত আমাদের কাফেলার এক ভাই বাইরে থেকে দৌড়ে এসে মসজিদে ঢুকছেন, আমাকে দেখে বললেন, "ভাই চলেন, তাফসিরটা কালেক্ট করি!"
আমি অবাক হয়ে বললাম, "ভাই, এতদিন পর আপনি তাফসীর খুঁজছেন, আমরা পুরো সফর তো খুঁজলাম, কোথাও নেই। এখন কোত্থেকে আসবে?" তিনি জেদ ধরলেন, "আরেকবার ট্রাই করতে দোষ কী?" আমি মধ্যে একটা ভাবনার উদয় হলো, এটা কি আল্লাহর পক্ষ থেকে? আল্লাহ কি আমার দোয়ার উসিলায় এই ভাইকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন? তবুও আমি বললাম, "আমি সাথে যাব, কিন্তু আমি চাইতে পারব না। আমি দুইবার রিফিউজ হয়েছি।"
এক অলৌকিক ঘটনা
আমরা আবার সেই লাইব্রেরিতে গেলাম। গিয়ে দেখি আমাদের সামনে একজন আমেরিকান নও-মুসলিম ভাই দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ইংরেজি তাফসির চাচ্ছেন। তাকেও বলা হলো তাফসির শেষ, তবে তিনি নও-মুসলিম বলে তাকে বিশেষ বিবেচনায় ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো।
এরপর আমাদের পালা। আমার সাথী ভাইটি আবারও সেই বাংলা তাফসিরের কথা তুললেন। লাইব্রেরিয়ান আবারও সেই একই উত্তর দিলেন— "সব শেষ।" কিন্তু হঠাত তিনি আমাদের থামিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, "আপনারা সবাই কেন এই তাফসিরটিই খুঁজছেন?"
যেহেতু আমি কিছুটা ইংরেজি জানতাম, আমি তাকে খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে বললাম, "দেখুন ভাই, আমাদের দেশে দ্বীনের নামে অনেক কুসংস্কার আর শির্ক-বিদআত ছড়িয়ে আছে। সাধারণ মানুষ কোরআনের সহীহ মর্মার্থ বুঝতে পারে না। এই তাফসিরটি সহীহ হাদীসের ওপর ভিত্তি করে লেখা, যা আমাদের জন্য পথপ্রদর্শক হতে পারে। আমরা কেবল নিজেদের জন্য নয়, আমাদের দেশের মানুষের মাঝে সঠিক দ্বীন প্রচারের জন্য এটা খুঁজছি।"
আমার কথাগুলো সম্ভবত তার হৃদয়ে স্পর্শ করল। তিনি আমার সাথে অনেক কথা বললেন, মুগ্ধ হলেন। এরপর তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাত বললেন, "আপনি একটু দাঁড়ান।" তিনি ভেতরে গিয়ে দুই খণ্ডের একটি পূর্ণাঙ্গ সেট নিয়ে এলেন এবং বললেন, "আমি কেবল একটাই দিতে পারছি। আপনাদের কথা শুনে আমার ভালো লাগল, তাই এটি দিলাম।"
আমরা দুজন অভিভূত হয়ে গেলাম! চোখে পানি চলে এল। যে জিনিসটি পাওয়ার কোনো জাগতিক সম্ভাবনা ছিল না, পুরো কাফেলার সবাই সর্বোতভাবে চেষ্টা করলো কেউ পেলো না, এমনকি আমার সামনের আমেরিকান নওমুসলিমকেও তারা তাফসীর দিলো না, কিন্তু আল্লাহ পাক এক নিমিষেই তার ব্যবস্থা করে দিলেন। কিভাবে আমার আল্লাহর এই কৃতজ্ঞতা আদায় করা সম্ভব?
গল্পের শেষ অংশ: আল্লাহর অসীম রহমত
আমরা মদিনায় পাওয়া সেই দুই খণ্ডের সেটটি ভাগ করে নিয়েছিলাম, এক খণ্ড আমার কাছে আর অন্যটি আমার সাথী ভাইয়ের কাছে। একটু অপূর্ণতা থেকে গেলো আরেকটি খন্ড ঐ ভাইয়ের কাছে রয়ে গেছে যা পরে হয়ত একচেন্জ করে নিতে পারবো। যাই হোক পরম মমতায় সেই তাফসীর পড়া শুরু করলাম।
হজ শেষ করে বাংলাদেশে ফেরার প্রায় দুই মাস পর আমার খুব কাছের এক দ্বীনি ভাই ওমরাহতে গিয়েছিলেন। আল্লাহর কী অশেষ রহমত! সেই লাইব্রেরিয়ান ভাইটি আমার কথা মনে রেখেছিলেন এবং তিনি ওই ভাইয়ের মাধ্যমে আমার জন্য আরও এক সেট তাফসির পাঠিয়ে দিলেন। মদীনার সেই অপূর্ণ সেটটি এভাবেই পূর্ণ হয়ে আমার আলমারিতে জায়গা করে নিল। সুবহানাল্লাহ!
এরকম আরও অনেকগুলি ঘটনা ঘটেছে আমাদের হজ্জ সফরে। এই ঘটনাগুলি মনে হলে আমি আসলে আবেগতাড়িত হয়ে যাই, মনে হয়ে যেন আমি আমার মহান রবের কৃতজ্ঞতা যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারছি না, যিনি আমাদের এত ভালবাসেন আমাদের উপর এত দয়া করেন।
মনে হয় যদি সব হাজিদের জানিয়ে দিতে পারতাম মহান আল্লাহ কিভাবে তাঁর ঘরের মেহমানদের মেহমানদারি করে থাকেন! তাহলে সবাই হজ্জ সফরে লাভ-ক্ষতির জাগতিক হিসাব নিয়ে পড়ে না থেকে আমাদের রবের এই নিয়ামতগুলো উপলব্ধি করতে পারতো এবং হৃদয় জুড়ানো ও এক বরকতময় হজ্জ সফরের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারতো...!
এই সফর থেকে শিক্ষা
এই ঘটনাটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ রিয়ালাইজেশন বা উপলব্ধি। আমি শিখলাম:
১. আল্লাহর ওপর ভরসা: আমরা দুনিয়াবি সব চেষ্টা করি, কিন্তু মালিকের দরবারে হাত তুলতে ভুলে যাই। অথচ আল্লাহর কাছে চাইলে তিনি অসম্ভবকেও সম্ভব করে দেন। কাজেই আমার চাওয়া যতই কঠিন হোক আল্লাহর কাছে আগে চাইতে না ভুলি এবং আল্লাহর উপর যেন ভরসা রাখতে পারি তিনিই কবুল করার মালিক, তিনিই কবুল করেন।
২. হজ সফরের শিক্ষা: হাজিরা আল্লাহর ঘরের মেহমান। এই সফরে মহান আল্লাহর মেহমানদারীর অসাধারন সব ঘটনা হাজিরা উপলব্ধি করে থাকেন। এরকম আরও অসংখ্য ঘটনার সাক্ষী আমাদের কাফেলার আরও অনেকেই। এই হজ্জ সফর হলো দোয়া কবুলের জায়গা। কাজেই হজ্জ সফরে লাভ ক্ষতি লেনদেন ফোকাস না করে মহান রবের সান্নিধ্য পাওয়ার বিষয়কে সবার ফোকাস করা উচিৎ।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হজের এই অসাধারন অভিজ্ঞতা অর্জন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।