18/06/2026
কাতারে মাদকের ভয়াবহতা, সহজ শিকার না হয়ে, তথ্য জানুন এবং সচেতন থাকুন।
দৃশ্যপট ১:
বাংলাদেশের কোন এক জেলার জনৈক আরমান মিয়া (ছদ্মনাম) কাতারে এসেছেন ০৩ বছর। তথাকথিত ফ্রি ভিসায় কাজ করতে কাতারে এসে কোন নির্দিষ্ট কাজ না পেয়ে নানান ধরণের কাজের চেষ্টা করেছেন। বর্তমান সময়ে কাজ না থাকায় আর্থিক অনটনে পড়ে বিভিন্ন জায়গায় কাজ খুঁজতে থাকেন। পরে ফেসবুকে ডেলিভারি ও সাপ্লাইয়ের কাজ আছে মর্মে সংবাদ পেয়ে ফেসবুকে দেয়া ঠিকানায় যোগাযোগ করেন। ফেসবুকের কোম্পানি তাকে নির্দিষ্ট স্থান থেকে পার্সেল সংগ্রহ করে নির্ধারিত ঠিকানায় পৌঁছে দিতে বলে। মোবাইলে পার্সেলের ছবি এবং লোকেশন পাঠায়। কিশোরগঞ্জের আরমান মিয়া সরল বিশ্বাসে পার্সেল সংগ্রহের জন্য নির্ধারিত লোকেশনে গিয়ে দেখেন পার্সেল রাস্তায় পড়ে আছে। তিনি যখন পার্সেল তুলতে যাবেন, ঠিক সেই সময় মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার অপরাধে কাতারের সিআইডি তাকে আটক করে। তার মোবাইল চেক করে সিআইডি নিশ্চিত হয় যে, সে এ ডেলিভারির সাথে সম্পৃক্ত। প্রথমে পুলিশ স্টেশন, পরে আদালত। তিনি জানেনও না যে, পার্সেলের ভিতরে কি পণ্য আছে। আদালতে আরমান প্রমাণ করতে পারেন না যে, তিনি ড্রাগ ব্যবসার সাথে জড়িত নন, শুধু পার্সেল ডেলিভারি দিয়ে সৎভাবে অর্থ উপার্জন করতে চেয়েছেন। ফলাফল ১৫ বছরের কারাদন্ড। এরকম গল্প চট্টগ্রামের আরাফাত. নাঈম, গাজীপুরের রাকিবুল, ইউসুফ খান, মাদারীপুরের রানা, মুন্সিগঞ্জের সালামতউল্লাসহ আরও অনেকের।
দৃশ্যপট-২
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বাংলাদেশের কোন এক জেলার অলি মিয়া (ছদ্মনাম) ভাগ্য পরিবর্তন আর উন্নত জীবনের আশায় উপসাগরীয় দেশ কাতারের যাত্রী। পরিচিত একজন বিমানবন্দরে একটি প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলেছে, কাতারে তার ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দিতে। গ্রামে বেড়ে ওঠা সহজ-সরল অলি মিয়া বিদেশের স্বপ্নে বিভোর, আর বিমানবন্দরের নানান ঝক্কি-ঝামেলায় দিশেহারা। প্যাকেটের ভিতরে কি আছে সেটা দেখার বা জানার প্রয়োজন বোধ করলেন না। এলাকার লোক, নিশ্চয়ই বিপদে পরে তার মাধ্যমে জরুরী কিছু নিয়ে যাচ্ছে। নির্বিঘ্নে ইমিগ্রেশন অতিক্রম করে বিমানে চড়ে বসলেন। নির্দিষ্ট সময় কাতারে বিমান অবতরণ করলো। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু লাগেজ নিয়ে বের হতে গিয়ে বিমানবন্দর পুলিশ লাগেজ পুনরায় চেক করতে নিয়ে গেল। চেকিং-এ সেই পরিচিত লোকের প্যাকেটে গাঁজা পাওয়া গেল। মূহুর্তে অলি মিয়ার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। তিনি নানাভাবে বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে, এ প্যাকেট তার না, তিনি শুধু প্যাকেটটি তার দেশী ভাইকে পৌঁছে দিতে নিয়ে এসেছেন। কেউ তার কোন কথা শুনলো না। বুঝলোও না। গাঁজা বহনের দায়ে আদালত তাকে ১০ বছরের কারাদন্ড প্রদান করলো। জেলখানায় কেটে গেছে ৮ বছর ৪ মাস। সুখের স্বপ্ন, সুখের সংসার মিশে গেছে ধুলোয়। আজও তার মনে একটাই প্রশ্ন, মানুষকে বিশ্বাস করা কি অপরাধ? যার কোন উত্তর তার কাছে নেই।
দৃশ্যপট-৩
বাংলাদেশের কোন এক জেলার ফরহাদ হোসেন (ছদ্মনাম) ২০২৪ সালে কাতারে আসেন। তার রুমমেট ড্রাগের ব্যবসা করতো। একদিন সেই বন্ধু বাংলাদেশে যাবার সময় তাকে কিছু সাদা কাগজ দিয়ে যায় কোথাও পৌছেঁ দেবার জন্য। সরল বিশ্বাসে কাগজগুলো রেখে দেন ফরহাদ। রাতে সিআইডি এসে রুম তল্লাসী করে কাগজসহ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। পরে জানতে পারেন কাগজগুলো মাদক। মাদক মামলায় ১৫ বছরের সাজায় গত এক বছর ধরে জেলে আছেন তিনি।
দৃশ্যপট-৪
বাংলাদেশের কোন এক জেলার খোরশেদ আলম (ছদ্মনাম) গত ৬ বছর ধরে কাতারে আছেন। ফ্রি ভিসা আসা খোরশেদের কাজ না থাকায় ফেসবুকে সাপ্তাহিক বেতনের ভিত্তিতে ডেলিভারি কাজের অফার পান। কোম্পানির কোন ঠিকানা জানেন না। নির্ধারিত লোকেশন থেকে পার্সেল তুলতে গিয়ে গ্রেফতার হয়ে জানতে পারেন পার্সেলের ভিতর শাবু/ আইস নামক মাদক রয়েছে। তিনি কোম্পানির নম্বরে যোগাযোগ করলে কেউ ফোন রিসিভ করেনি। আদালত তাকে মাদক মামলায় ১০ বছর কারাদন্ড দিয়েছে।
দৃশ্যপট- ৫
বাংলাদেশের কোন এক জেলার আমির হোসেন (ছদ্মনাম) এক সম্মানিত কাতারির বাড়ীর মসজিদে প্রাইভেট ইমাম ছিলেন। পরে ইমামের চাকরি চলে যাওয়ায় তিনি ড্রাইভারের কাজ করতেন। সাদা পেপার রাখার জন্য তাকে ১০ বছরের কারাদন্ড দেয় আদালত। আপীল করে সাজার মেয়াদ ৫ বছর হয়েছে।
এরকম গল্প অসংখ্য বাংলাদেশি প্রবাসীদের, যারা কাজের জন্য ডেলিভারি করতে গিয়ে বা সরল বিশ্বাসে কারো পার্সেল বহন করে অথবা বন্ধুর পার্সেল সংরক্ষণ করে কারা ভোগ করছেন। বিশেষত: যারা ফ্রি ভিসার নামে কাতারে অবস্থান করছেন, তারা কাজ না পেয়ে অথবা সহজ অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে অনলাইনে এ ধরনের কাজের সন্ধান পেয়ে যোগাযোগ করে সহজ ভিকটিমে পরিণত হচ্ছেন।
অতএব, নিরাপদ থাকতে,
১. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মোবাইল ফোন বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রাপ্ত সন্দেহজনক প্রস্তাব, চাকরির অফার বা কোন ধরনের পণ্য বহনের অনুরোধ সম্পর্কে সতর্ক থাকুন এবং এ ধরনের যোগাযোগ এড়িয়ে চলুন।
২. কোনো সন্দেহজনক সাদা কাগজ, খাম, প্যাকেট বা পার্সেল গ্রহণ, সংরক্ষণ কিংবা বহন করা থেকে বিরত থাকুন।
৩. অপরিচিত বা স্বল্প-পরিচিত ব্যক্তির অনুরোধে কোনো ব্যাগ, প্যাকেট, নথি বা মালামাল বহন করবেন না। অন্যের লাগেজ, ব্যাগ বা পার্সেলের ভেতরে কী আছে তা সম্পূর্ণ নিশ্চিত না হয়ে তা নিজের কাছে রাখা বা পরিবহন করা থেকে বিরত থাকুন।
৪. অতিরিক্ত অর্থ, কমিশন, উপহার বা অন্য কোনো বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে কোনো বস্তু বা প্যাকেট বহনের প্রস্তাব পেলে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করুন। সন্দেহজনক কোনো কাগজ, খাম, প্যাকেট বা বস্তু স্পর্শ, খোলা বা পরীক্ষা করার চেষ্টা করবেন না।
৫. কর্মস্থল, আবাসস্থল বা আশপাশে কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ লক্ষ্য করলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করুন।
৬. এ সংক্রান্তে আপনার সর্বোচ্চ সতর্কতা আপনাকে অনাকাঙ্খিত বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। সহকর্মী, বন্ধু ও পরিচিতজনদের মধ্যে মাদকবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধি করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করুন।
৭. নিজের নিরাপত্তা, পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং কাতারে বাংলাদেশি কমিউনিটির সুনাম রক্ষার স্বার্থে সর্বদা সতর্ক থাকুন ও কাতারের প্রচলিত আইন মেনে চলুন।
প্রচারে-
বাংলাদেশ দূতাবাস, দোহা।