11/07/2017
দেশের বাহিরে যারা উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছেন তাদের স্বপ্নকে আরও প্রজ্বলিত করবে গল্পটি ।
“তুই জাপানে আবেদন করলি কোন আন্দাজে ? জাপানি ডিগ্রীর তো দুই পয়সার দাম নাই”, কথা গুলো আমাকে বলেছিলেন, আমার বাবা-মায়ের সামনেই, আমার আপন খালাতো ভাই, যিনি একজন এডভোকেট । কথা গুলো শুনে আমার মন একটু খারাপ হলেও আমার বাবা-মায়ের মুখে একটা অপমানের ছাপ দেখতে পেয়েছিলাম । বলছি, আজ থেকে ২০ বছর আগের কথা । ১৯৯৫ সন, সবে মাত্র অর্নাস পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে, আমি প্রথম শ্রেনী পেয়েছি, একটু ভাবের উপর আছি । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, দেশের বাইরে চলে যাবো । তখন দেখতাম, কেমিষ্ট্রি আর বায়ো-কেমিষ্ট্রি থেকে ছেলে-মেয়েরা একে একে জাপানে চলে যাচ্ছে । আমি ছিলাম এপলাইড কেমিষ্ট্রির ছাত্র । তখন জাপানের মনোবুশো স্কলারশীপের পরিমান ছিলো প্রায় এক লাখ টাকা । মজার কথা হলো, তখন প্রথম শ্রেনীর কর্মকর্তাদের বেতন স্কেল ছিলো মাত্র ২৮৫০ টাকা বেসিক । তখন কিন্তু আজকের দিনের মতো ইমেইল ছিলো না । আমরা তখন চিঠি লিখতাম বিদেশের প্রফেসারদের কাছে । দেখা যেতো ১০০ টা চিঠি লিখলে মাত্র ৫ থেকে ৬ টার উত্তর আসতো । অনেক কষ্টকর ছিলো বিদেশের তথ্য পেতে । জীবনের প্রথম, এক বছরের একটা স্কলারশীপ পেয়েছিলাম জাপানে । সেটাই আমার পুরো জীবন পরিবর্তন করে দিলো । জাপান থেকে লিখলাম ইংল্যান্ডে, হয়ে গেলো আমার পিএইচডির স্কলারশীপ । ২০০৬ সনে রুহুল খান হয়ে গেলো ডঃ রুহুল খান । বেশ কয়েক বছর পার করেছি কানাডাতে, ভালোই আছি ম্যাপেল-লিফের দেশে । আমার বিদেশ পর্বটা কিন্তু জাপান দিয়েই শুরু হয়েছিলো । আজ জাপানের কথা মনে হওয়ার কারন হলো, গত সপ্তাহে কথা হচ্ছিলো আমাদের ডিন সাহেবের সাথে । কথায় কথায় জানতে পারলেন, আমি জাপানে এক বছর ছিলাম । তিনি আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আমি জাপান থেকে কি শিক্ষা লাভ করেছি । আমি বলেছিলাম, কিভাবে দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করা যায়, জাপানের কাছ থেকে সেটাই আমার জীবনের শিক্ষা । ডিন সাহেব আমাকে বলেছিলেন, পারলে কানাডিয়ান ছেলে-মেয়েদের জাপানি শিক্ষাটা একটু দিয়ে দিয়েন । আজকের লেখার উদ্দেশ্য হলোঃ মানুষের কথায় কান দিলে চলবে না । কোন হেলা-ফেলাকে পাত্তা দেয়া যাবে না । আশ পাশের অনেকেই বলবে নানা কথা । কেউ বলবে ওমুক দেশের ডিগ্রীর দাম নাই, তমুক দেশ খুব ঠান্ডা, ওই দেশে টাকা কম দেয়, এরকম হাজারো কথা । আমার কথা হলো, প্রথমবার কোন ভাবে দেশের বাইরে যেতে পারলেই হলো, তারপর অনেক সুযোগ চলে আসবে । অনেকেই অনেক আজে-বাজে কথা বলবে বিভিন্ন দেশ নিয়ে । মনে রাখতে হবেঃ “আংগুর ফল টক” নামক প্রবাদটি । দেশের বাইরে যেয়ে খুব ভালো করার চেষ্টা করতে হবে । তাহলে অনেক ভালো কিছু পাওয়া যাবে । আমার এক ভারতীয় বন্ধু আমাকে বলেছিলো, আমরা কানাডাতে ইমিগ্রেন্ট তাই আমাদের লোকাল কানাডিয়ানদের চেয়ে বেশী পরিশ্রম করতে হবে তাহলেই আমরা “সারভাইব” করতে পারবো । আমি মেনে চলেছি আমার সেই ভারতীয় বন্ধুর কথা । অনেক সময়, এক ধাপে আমেরিকা বা কানাডাতে নাও যাওয়া যেতে পারে । তাই দুই বা তিন ধাপের কথা মাথায় রাখতে হবে । বেশ কিছু দেশের কথা উল্লেখ করছি, যেখানে একটু সহজে যাওয়া যেতে পারে আর টাকা পয়সাও একটু কম খরচ হবে । যেমনঃ জাপান, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, চায়না, হংকং, দুবাই, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, জার্মানী, অস্টিয়া, বেলজিয়াম । তোমরা এই দেশগুলো থেকে এমএস বা পিএইচডি করে অনেক সহজেই আমেরিকা বা কানাডাতে চলে যেতে পারবে । পিএইচডি ডিগ্রী থাকলে কানাডাতে মাইগ্রেসন করতে পারবে সহজেই । তাই যাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ তাদেরও চিন্তার কোন কারন নেই । অহেতুক TOEFL+GRE নিয়ে চিন্তা না করে ভালো মতো পড়া-লেখা করো আর জাপান, কোরিয়া, চায়না, মালয়েশিয়ার মতো দেশে যেয়ে পড়া-লেখা শেষ করে নর্থ-আমেরিকাতে যাওয়ার চেষ্টা করো । আমার গতকালের লেখার পর, আমার এক বন্ধু "মেঘ" জানতে চেয়েছিলো, জাপান থেকে পিএইচডি করে কি কানাডা বা আমেরিকা যাওয়া যাবে কিনা ? আজকের লেখাটা শেষ করবো, মেঘের প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কিত এক মজার কাহিনী দিয়ে । কয়েক সপ্তাহ আগে, বিকেল বেলা বাসার সামনের পার্কে দাড়িয়ে আছি, এমন সময় খুব উন্নত মানের একটা জীপ গাড়ী থেকে নামলো এক ভদ্র ছেলে । খুব পরিচিত মনে হলো, কে হতে পারে ? মনে হয় অনেক চেনা । আমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি ছেলেটার দিকে । দেখলাম, ছেলেটাও আমার দিকে তাকিয়ে আছে । আমি এগিয়ে যেয়ে বললাম, আপনি কি বাংলাদেশী ? ছেলেটা কোন কথা না বলে সরাসরি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললোঃ রিপন (আমার ডাক নাম) তুই এইখানে !!!! আমিতো বিশ্বাস করতে পারছি না, কতদিন তুই কানাডাতে ? ছেলেটার সাথে আমার সবশেষ দেখা ২০০৩ সনে জাপানের টোকিও ইনষ্টিটিউট অব টেকনোলজীতে যেখান থেকে ছেলেটা পিএইচডি করেছে । সে ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিষ্ট্রির ছাত্র । আমার সাথে বেশ ভালো পরিচয় ছিলো তখন থেকেই । খুব দরিদ্র ঘরের ছেলে, সারা জীবন টিউশনি করে পড়া-লেখা করেছে । আমার বন্ধু আমাকে বললো, গাড়ীতে উঠ । আমাকে নিয়ে চললো কাছের এক ম্যাক্সিকান ফাষ্ট ফুডের দোকানে । জানতে পারলাম, বন্ধুটি জাপানে ছিলো ১০ বছর । কানাডাতে মাইগ্রেসন করেছে বছর দুয়েক আগে । এখন বিখ্যাত এক কানাডিয়ান কোম্পানীতে উচ্চ-পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছে । ঢাকার উত্তরাতে ফ্লাট কিনেছে, কানাডাতে বাড়ী-গাড়ী আছে । আমার বন্ধুটিকে আমি বলেছিলাম, তোর কি সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টং ঘরের কলা-পাউরুটির কথা মনে আছে ? টিউশনির পর রাত ১১ টার দিকে যখন ঐ সব খেয়ে থাকতে হতো আর নীল-ক্ষেত থেকে মাসে দুইবার জুতার সুকতলী পরিবর্তন করা লাগতো ? আমার বন্ধুটি প্রচন্ড জোরে হাসতে হাসতে বললো, বাদ দে তো ঐসব দিনের কথা, এখন ভালো লাগে না ঐ কষ্টের দিনের কথা মনে করে, স্পাইসী ফ্রাইড ম্যাক্সিকান চিকেনটা খেয়ে দেখ, খুব ভালো । আমি ফ্রাইড চিকেন খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করলাম, তোর গাড়ীটার দাম কত ? সে জানালো ৮৭ হাজার টাকা (কানাডাতে বাংলাদেশীরা ডলার কে টাকা বলে থাকে) । আমি বললাম, ৮৭ হাজার ডলার মানে বাংলাদেশী টাকায় তো প্রায় ৫৫ লাখ টাকা । আমার বন্ধু মৃদু হেসে বললো, এখন এটা আমার কাছে কোন ব্যাপার না । আমার মনে হয়েছিলো, আমার বন্ধুটির কাছে এখন এক ডলার সমান এক টাকা । অর্থাৎ ৮৭ হাজার ডলার আজ তার কাছে ৮৭ হাজার টাকা মাত্র । আমার বন্ধুটির জীবনের পরিবর্তন ডাবল বা রি-ডাবল হয়নি, হয়েছে বহুগুন কারন এক ডলার সমান তো ১ টাকা না । তাহলে কি প্রায় ৭০ গুন পরিবর্তন হলো আমার সেই দরিদ্র বন্ধুটির ? যে কিনা শহীদুল্লাহ হল আর ফজলুল হক হলের (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) টং ঘরগুলো থেকে ৪ টাকা দিয়ে কলা-পাউরুটি কিনে খেতো আজ থেকে ২০ বছর আগে । By Dr. Ruhul Khan , UBC, CANADA; Collected from Mehedi Hasan Shahin bhi's' wall