17/06/2026
গন্তব্যহীন যাত্রা (২) : অরণ্যের নীরবতা, মানুষের গল্প
চা বাগানের শেষ সারিটা পেরোতেই হঠাৎ যেন চারপাশের আলো বদলে গেল। কয়েক সেকেন্ড আগেও যেখানে ছিল পরিচ্ছন্ন মখমলে সবুজের এক সুশৃঙ্খল বিস্তার, সেখানে এখন চোখের সামনে দাঁড়িয়ে এক আদিম, রহস্যময় অরণ্য—সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান।
তবে অরণ্যের এই আদিমতায় পা রাখার আগেই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলো, জনপ্রতি ১১৫ টাকা করে এন্ট্রি টিকিট কাটলাম। প্রাকৃতিক পরিবেশের তুলনায় ভেতরে অবকাঠামোগত সুবিধা বা রক্ষণাবেক্ষণ কিছুটা সীমিত হওয়ায় প্রবেশমূল্যটা আমার কাছে সামান্য বেশি বলেই মনে হয়েছে। যাই হোক, টিকিট কেটে ভেতরে পা রাখতেই যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে হারিয়ে গেলাম। চা বাগানের মানুষের তৈরি সাজানো সবুজ একপাশে রেখে এই ঘন, বুনো পরিবেশে ঢোকার অনুভূতিটাই আলাদা। চারপাশের গাছপালা এত ঘন আর নিবিড় যে বনের অনেক জায়গায় সূর্যের আলো ঠিকঠাক পথ খুঁজে পায় না।
আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল বনের ওয়াচ টাওয়ার। বেশ কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে যখন ওপরে উঠলাম, চোখের পলক যেন থমকে গেল। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ গাছপালার সেই বিশাল চাদর চোখের নিমিষেই শহরের সব ক্লান্তি ধুয়ে দিয়ে এক অদ্ভুত শীতলতা এনে দিল। টাওয়ারে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা বুক ছুঁয়ে গেছে, তা হলো চারপাশে শত শত বুনো পাখির কিচিরমিচির শব্দ। ঠিক তখনই দেখা হলো ঢাকা থেকে আসা একঝাঁক প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারের সাথে। তারা কোনো ফ্রেমবন্দী ছবির জন্য নয়, বনের এই গহীনে এসেছেন শুধু বিচিত্র সব পাখির ডাক রেকর্ড করতে আর তাদের জীবনযাত্রার ফটোগ্রাফি করতে। জানলাম, রঘুনন্দন পাহাড়ের এই বনে নাকি প্রায় ১৪৯ প্রজাতির পাখি এবং উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, চশমা হনুমানের মতো ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর বাস।
টাওয়ার থেকে নেমে সাইফুলের সাথে বনের আরও গভীরে ট্রেইলের দিকে এগোতে লাগলাম। লোকমুখে শুনেছি বনের নির্জন পথগুলোয় মাঝেমধ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। চারপাশটা এতই নিঝুম যে মনের ভেতর হালকা একটা আশঙ্কার ছায়া ফেলছিল বৈকি। কিন্তু প্রকৃতির সেই আদিম টান আর বুনো ঘ্রাণের কাছে ভয়টা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সাহস নিয়ে আমরা বনের গহীন পথ ধরে কিছুটা পথ হেঁটে চললাম। জঙ্গল যেন আমাদের ফিসফিস করে বলছিল—শহরের সব কোলাহল আর ব্যস্ততা ভুলে এই নীরবতাটুকু গায়ে মেখে নাও।
বন ঘোরা শেষ করে যখন আমরা চুনারুঘাট উপজেলা সদরের দিকে রওনা হলাম, তখনো দুপাশের চা বাগানের দৃশ্য আমাদের চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছিল। সত্যি বলতে, এই চুনারুঘাট এলাকাটার সাথে আমাদের জেনারেশনের বড় একটা অংশের পরিচয় মূলত সাবেক এমপি ব্যারিস্টার সুমনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কাজগুলোর কল্যাণে। কৌতূহল সামলাতে না পেরে রাস্তার পাশে, দোকানে স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণের সঙ্গে কথা বললাম। তাদের সাথে কথা বলে বুঝলাম, ব্যারিস্টার সুমনের প্রতি মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ ও শ্রদ্ধা এখনো বেশ প্রবল। দলমত নির্বিশেষে প্রত্যেকেই তাঁর কাজের প্রশংসা করছিলেন। তাদের কথার মাঝেই উঠে এলো তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি সেই বিখ্যাত কাঠের ব্রিজ আর এমপি থাকাকালীন বানানো ভিউ পয়েন্টগুলোর গল্প। রাজনীতি বা বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে একজন মানুষ কীভাবে সাধারণের হৃদয়ে নিজের কাজের ছাপ রেখে যেতে পারেন, চুনারুঘাটের মানুষের কথায় সেই সম্মান স্পষ্ট দেখতে পেলাম।
চুনারুঘাট সদরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুরের খরতাপ চারদিকে। সেখানে একটা স্থানীয় হোটেলে দুপুরের খাওয়া শেষ করে জুম্মার নামাজ আদায় করলাম মসজিদে। নামাজের পর শরীর আর মন দুটোই বেশ হালকা লাগল। বিকেলে যখন ঢাকার উদ্দেশ্যে হাইওয়ের দিকে এগোচ্ছি, জানালার বাইরে তখনো চা বাগানের শেষ সবুজটুকু আমাদের বিদায় জানাচ্ছিল।
ঢাকামুখী বাস তখন অন্ধকার গিলতে গিলতে ছুটে চলেছে। পকেট প্রায় খালি, কিন্তু মন ভরে আছে সাতছড়ির বুনো ঘ্রাণ, চুনারুঘাটের মানুষের আন্তরিকতা আর এক টুকরো মুক্তির অনুভূতিতে। গন্তব্যহীন সেই যাত্রা আমাকে আবার মনে করিয়ে দিল—সবচেয়ে সুন্দর ভ্রমণগুলোর কোনো পূর্বপরিকল্পনা থাকে না। কখনো কখনো পথই আমাদের এমন গল্প উপহার দেয়, যা কোনো পরিকল্পনা করেও পাওয়া যায় না।
যারা সাতছড়ির এই আন্ডাররেটেড বুনো সৌন্দর্য নিজের চোখে দেখতে চান, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু ব্যবহারিক তথ্য নিচে তুলে দিলাম—
📌 সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান: কুইক ট্রাভেল গাইড
• কী দেখবেন: এটি মূলত রঘুনন্দন পাহাড়ে অবস্থিত ২৪৩ হেক্টর জায়গার একটি উদ্যান। এখানে সাতটি পাহাড়ি ছড়া বা ঝর্ণা আছে (যা থেকে 'সাতছড়ি' নাম)। বনের ভেতরে আধ-ঘণ্টা (টিপরাপাড়া আদিবাসী গ্রাম), ১ ঘণ্টা এবং ৩ ঘণ্টার (পাখি প্রেমীদের জন্য ও আগরের বন) তিনটি ট্রেইল আছে।
• প্রবেশ ফি: প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১১৫ টাকা, শিক্ষার্থী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৫৭ টাকা। ছোট গাড়ি পার্কিং ১১৫ টাকা।
• কীভাবে যাবেন:
বাসে: ঢাকা থেকে সিলেটগামী যেকোনো বাসে উঠে মাধবপুরের পর তেলিয়াপাড়া বিশ্বরোড (তেইল্লাপাড়া) মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে নামবেন। সেখান থেকে সিএনজি বা ম্যাক্সিতে সরাসরি সাতছড়ি গেট।
ট্রেনে: ঢাকা থেকে পারাবত, জয়ন্তিকা, কালনি বা উপবন এক্সপ্রেসে শায়েস্তাগঞ্জ বা নোয়াপাড়া স্টেশনে নামুন। শায়েস্তাগঞ্জ থেকে লোকাল সিএনজিতে চুনারুঘাট হয়ে (ভাড়া ২০+২০ টাকা) অথবা সরাসরি সিএনজি রিজার্ভ করে সাতছড়ি যাওয়া যায়।
• খাওয়া ও থাকা: উদ্যানের ভেতরে কেবল মুদি দোকান আছে, ভালো খাবারের জন্য চুনারুঘাট বা মাধবপুর ভরসা। রাতে থাকার জন্য বনে ক্যাম্পিং বা রেস্টহাউজের জন্য বন বিভাগের অনুমতি লাগবে। নতুবা হবিগঞ্জ শহরের সাধারণ হোটেল (৪০০-২৫০০ টাকা) কিংবা শ্রীমঙ্গলের কটেজে থাকতে পারেন। বিলাসবহুল অভিজ্ঞতার জন্য কাছেই আছে 'দ্যা প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট'।
⚠️ জরুরি পরামর্শ: বনে মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকে না, তাই ঢোকার আগে পরিবারকে জানান। গহীন বনে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে তথ্য কেন্দ্র থেকে ২০০-৫০০ টাকায় গাইড নিন। বর্ষায় জোঁকের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন এবং সন্ধ্যার আগেই উদ্যান ত্যাগ করুন।
লেখক : Abdul Kahhar (Siam)
📌 গল্পের প্রথম পর্ব (পর্ব ১) প্রথম কমেন্টে! 👇
#গন্তব্যহীন_যাত্রা #সাতছড়ি_জাতীয়_উদ্যান #চুনারুঘাট #হবিগঞ্জ #ভ্রমণবৃত্তান্ত #অরণ্যের_ডাক #বাংলাদেশ