21/05/2026
#ভাওয়ালের_বনে_এক_বিকেলের_আত্মদর্শন
আমরা আসলে ক্লান্ত হওয়ার অভিনয় করি না, আমরা সত্যিই ভেতরে ভেতরে ফুরিয়ে যাই। শরীর ক্লান্ত হলে বিছানা খুঁজি, কিন্তু আত্মা পরিশ্রান্ত হলে আমরা কোলাহলে মেতে সেই ক্ষত ঢাকতে চাই। আমার সবসময়ই অরণ্য পছন্দ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'আরণ্যক' আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'অরণ্যের দিনরাত্রি' উপন্যাস দুটি পড়ার পর বনের প্রতি আমার আকুলতাটা যেন বাউণ্ডুলের মতো বহুগুণ বেড়ে গেছে। ঢাকার খুব কাছাকাছি প্রকৃতির সতেজতা পেতে গাজীপুর সবসময়ই আমার অন্যতম প্রিয় জায়গা। তাই একদিন বন্ধু Nadim Patwary কে সাথে নিয়ে চেনা সেই অরণ্যের টানেই রওনা হলাম।
গাজীপুর পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর হয়ে গেল। হঠাৎ মনে পড়ে গেলো সেখানে কর্মস্থলে থাকা আমার স্কুল বন্ধু Bitul Adhikari এর কথা। ফোন দিতেই আন্তরিক কণ্ঠে ঠিকানা বুঝিয়ে দিল। এরপর রিকশা নিয়ে সোজা চলে গেলাম ওর বাসায়। দেখা হতেই যেন এক টুকরো কৈশোর ফিরে পেলাম। অনেকদিন পর দেখা, তাই পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন আর একে অপরের খোঁজখবর নেওয়ার ফাঁকে আমরা মেতে উঠলাম ক্যারামবোর্ড খেলার টেবিলে। গুটি আর স্ট্রাইকারের শব্দের সাথে চলল আমাদের আড্ডা। এরপর বিটুলের আন্তরিক আতিথেয়তায় চমৎকার এক মধ্যাহ্নভোজ সেরে আমরা রওনা হলাম ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের উদ্দেশ্যে। গাজীপুর থেকে ভাওয়াল যাওয়ার পথটা ছিল দারুণ উপভোগ্য। বাসের জানালার পাশে বসে দেখছিলাম রাস্তার পাশে ফুটে থাকা লাল-হলুদ ফুল আর ঘন ঝাউবনের অপরূপ সৌন্দর্য, যা শহুরে ধূসরতার ক্লান্তি মুহূর্তেই ভুলিয়ে দিচ্ছিল।
বনে পা রাখতেই মনে হলো, প্রকৃতি তার হাজার বছরের পুরোনো নীরবতা নিয়ে আমাদের স্বাগত জানাল। পায়ের নিচে শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ আর কানের কাছে বয়ে যাওয়া স্নিগ্ধ বাতাস এক নিমেষেই আমাদের অন্তর শীতল করে দিল। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো শাল-গজারির ডালপালা থেকে ভেসে আসছিল পাখির কলকাকলি। বনের ভেতরের ওয়াচ টাওয়ারে যখন উঠলাম, ওপর থেকে পুরো বনের এই সবুজ ক্যানভাস দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল।
সবচেয়ে জাদুকরী মুহূর্তটি এলো বিকেলে। বনের এক কোণে শান্ত লেকের পাড়ে যখন দাঁড়ালাম, তখন চারপাশটা একেবারে নিঝুম। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘন গাছের পাতার ফাঁক গলে সূর্যের শেষ সোনালী কিরণ এসে পড়ল মাটির পথটায়। এই আলো-ছায়ার মায়াবী দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে এক পরম সত্য উপলব্ধি করলাম। প্রকৃতির গাছেরা বড় হওয়ার জন্য কোনো শব্দ করে না, আকাশও সুন্দর হওয়ার জন্য প্রশংসা খোঁজে না; অথচ আমরা মানুষরা প্রতিটা কাজেই অবিরত স্বীকৃতি খুঁজে বেড়াই বলেই দিনশেষে এতো অশান্ত। আমরা সারাজীবন টাকা আর সফলতার পেছনে দৌড়েও ভেতরে এক চরম শূন্যতা অনুভব করি, কারণ এই আত্মা কখনো দুনিয়ার কোনো বস্তু দিয়ে পূর্ণ হতে পারে না। আমরা আসলে অবচেতন মনে এক পরম সত্ত্বাকেই খুঁজে বেড়াই। পবিত্র কুরআনেও স্পষ্ট বলা আছে— "নিশ্চয়ই আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়ের প্রশান্তি।" (সূরা রাদ : ২৮)।
ভাওয়ালের শান্ত বুনো পথে এক বিকেলের এমন আত্মদর্শন শেষে সন্ধ্যার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আমরা আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ফেরার পথে মনে হলো, কিছু নীরবতা আসলে শব্দের চেয়েও বেশি কথা বলে। মানুষ পৃথিবী জিতে ফেলছে ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে। ব্যস্ত জীবন থেকে একটু ছুটি নিয়ে মাঝে মাঝে প্রকৃতির এমন নির্জনতায় হারিয়ে যাওয়া বড্ড প্রয়োজন। কারণ কিছু পথ মানুষকে গন্তব্যে নয়, নিজের কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে আসে।
লেখক : Abdul Kahhar (Siam)
#ভাওয়াল_জাতীয়_উদ্যান #ভাওয়াল
#গাজীপুর #ভ্রমণ_বৃত্তান্ত #অরণ্যের_দিনরাত্রি #আরণ্যক #প্রকৃতির_টানে #শালবন #বাংলার_প্রকৃতি #আত্মদর্শন #ভ্রমণপ্রেমী #ঘুরে_দেখি_বাংলাদেশ