05/10/2017
বাংলাদেশে বনাঞ্চলের পরিমান এমনিতেই কম। তার মাঝে উত্তরাঞ্চলে তো বন খুঁজে পাওয়াই কঠিন। যমুনা ইকো পার্ককে বলা যায় উত্তরবঙ্গের সব থেকে বড় কৃত্রিম বন। বিশেষজ্ঞরা উত্তরবঙ্গের আবহাওয়া নিয়ে এই আশংকা করে থাকেন যে অদূর ভবিষ্যতে হয়তবা এইখানে মরুভুমিকরন প্রক্রিয়া শুরু হবে। সেটা সময়ই বলে দিবে। কিন্তু আপনি যদি একবারের জন্য হলেও ঘুরে আসতে পারেন যমুনা ইকো পার্ক থেকে, তাহলে সেই আশংকা আপনার মনে দানা বেঁধে উঠতে পারবে না। চলুন, যান্ত্রিক এই নগর থেকে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি নিয়ে সবুজের আলিঙ্গনে বাঁধা পড়ি।
আমার যা ঘোরাঘুরি হয় তার বেশিরভাগই হয় অফিসিয়াল কাজে। এইরকম এক অফিসিয়াল ট্যুরে গত বছরের এপ্রিল মাসে গিয়েছিলাম রাজশাহীতে। ৭ দিনের ট্যুরে রাজশাহী থেকে পাবনা এবং সিরাজগঞ্জ হয়ে ঢাকা ফিরেছিলাম। সিরাজগঞ্জ ছিলাম দুইদিন দিনরাত। এর মাঝে একদিন বিকেলে সময় পেয়ে এরিয়া ম্যানেজারের বাইকে চড়ে বসলাম যমুনা পার্কে যাব বলে। সেদিন বিকেলে প্রচণ্ড বাতাস ছিল। যমুনার পাড়ে সবসময়ই বাতাস থাকে। তাঁর উপর আগের রাতেই একপশলা বৃষ্টি হয়েছিল। তাই এপ্রিল মাস হওয়া সত্ত্বেও প্রচন্ড ঠান্ডায় কাঁপছিলাম। এমন হিমশীতল আবহাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতেই পৌঁছে গেলাম ইকো পার্কের প্রবেশপথে।
সন্ধ্যায় ইকো পার্ক বন্ধ করে দেয়। আমরা যখন গিয়েছি তখন দর্শনার্থীরা বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিছুটা অনুরোধ আর ১০০ টাকার একটা নোটের কল্যাণে গেটকিপারকে ম্যানেজ করে আধা ঘণ্টার জন্য পার্কের ভিতরে প্রবেশ করলাম। বাইক থাকায় পুরো পার্ক ঘুরে দেখার জন্য আধা ঘন্টাই যথেষ্ট ছিল। গেট দিয়ে ঢুঁকেই দুটি রাস্তা। একটা রাস্তা বামে চলে গেছে; আরেকটা সোজা চলে গেছে যমুনা নদী পর্যন্ত। আমরা সোজা রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম।
নদীতীরে এসে দেখি মোটা তারের জাল। এই জাল দিয়ে পুরো পার্কটাকে ঘিরে রাখা হয়েছে যেন পার্কের অধিবাসীদের (বানর, হরিণ ইত্যাদি) কোন সমস্যা না হয়। তাঁরের জালের ভেতর দিয়ে যমুনা নদী এবং ত্র উপর এশিয়ায় দ্বিতীয় বৃহত্তম সেতু বঙ্গবন্ধু সেতু দেখা যায়।
ডানদিকে যাবার রাস্তা বন্ধ। অতএব বাম দিকের রাস্তা ধরে বাইক ছুটে চলল।
মনে মনে তপুর সেই গানটার প্যারোডি করে ফেললাম।
একপাশে অরণ্য, আর একপাশে নদী।
আমার ১২০ সিসির বাইক, যাবে কি?
(তপুপ্রেমীরা দয়া করে মাইন্ড খাইবেন না প্লীজ)।
চলার পথেই চোখে পড়ে দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য কিছু ছোট কুঁড়েঘর কিংবা যাত্রী ছাউনি।
বাইকের রাস্তায় ইটের খোয়া বিছানো ছিল। বা পাশের জঙ্গল আমাদের কাছে টানছিল। কতক্ষণ আর সে আকর্ষণ উপেক্ষা করা যায়। তাই জঙ্গলে ঢোকার পথ চোখে পড়তেই বাইক চালিয়ে জঙ্গলের ভিতর ঢুকে পড়লাম।
চারদিক ছিল অসম্ভব নির্জন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল। তাই ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।
চলার পথে হঠাত করেই চোখে পড়ছিল বানর যারা কিচকিচ শব্দ তুলে এ দাল থেকে ও ডালে লাফাচ্ছিল আর আমাদের দেখে ভেঙচি কাটছিল।
পার্কের ভিতর আরও আছে হরিণ, সজারু, ময়ূর এবং খরগোশ।
মজার ব্যাপার হচ্ছে পার্কের চারপাশের রাস্তাটা হচ্ছে উপবৃত্তাকার। তাই হঠাত করেই আমরা দেখলাম যে আমরা পার্কের প্রবেশ্মুখে চলে এসেছি। যাত্রা শুরু করেছিলাম সোজা রাস্তা ধরে। ঘুরতে ঘুরতে ফিরে এসেছি বামপাশের রাস্তা ধরে। শখ মিতে নি পুরোপুরি। তাই আর একবার চক্কর দিয়ে ইকো পার্ক ভ্রমণ শেষ করলাম।
যমুনা ইকো পার্কের কিছু তথ্য জেনে নিন। ১২৪ একর আয়তনের এই পার্কের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ২০০৮ সালের মার্চ মাসের ৯ তারিখ। উদ্বোধন করেন সেতু বিভাগের তৎকালীন সচিব খান মোহাম্মদ ইব্রাহীম। উদ্বোধনের সময় পার্কে ৮ টি হরিণ ছাড়া হয়। পরবর্তী কিছুদিনের মাঝেই পার্কে ১০ টি খরগোশ, ২১ টি হরিণ, ৫ টি সজারু, ২ টি বানর এবং ২ টি ময়ূর ছাড়া হয়। এরপর পযায়ক্রমে আরো বিভিন্ন সময় এসব প্রাণী ছাড়া হয় পার্কে। কিন্তু দুঃখের বিষয় শেয়াল আর কুকুরের আক্রমণে অনেকগুলই মারা যায় তাই বেশ কিছু প্রাণীকে খাচাবন্দী করে রাখা হয়। প্রতিদিন গড়ে ১০০ পর্যটক এই পার্ক দেখতে আসেন। পিকনিক পার্টিও মাঝে মাঝেই আসে। যার ফলে বন্যপ্রাণীদের অবাধ বিচরণ প্রতিনিয়তই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এক দিনের প্যাকেজ ট্যুরের জন্য যমুনা ইকো পার্ক চমৎকার জায়গা। হাতে সময় থাকলে বেরিয়ে পড়ুন। খুব ভোরে রওনা দিলে পার্ক ঘুরে রাতেই ঢাকা ফেরা যাবে। শেষ করার আগে চলুন দেখে নেই উপগ্রহ থেকে যমুনা ইকো পার্ককে কি চমৎকার লাগে দেখতে।
photos from google
collected from ইস্টিশন