09/05/2026
আলুটিলায় মসজিদ নির্মাণ নিয়ে বিতর্ক: প্রয়োজন সহাবস্থান, নয় বিভাজন
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও বহু-সম্প্রদায়ের রাষ্ট্র। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতিগত বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই আমরা একসাথে বসবাস করি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি পাহাড়ি-বাঙালি, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানসহ সব সম্প্রদায়ের সমান নাগরিক অধিকার রয়েছে। তাই কোনো অঞ্চলে উপাসনালয় নির্মাণের বিষয়টি বিদ্বেষ বা সংঘাতের নয়; বরং এটি হওয়া উচিত নাগরিক অধিকার, পারস্পরিক সম্মান ও সহাবস্থানের আলোচনার অংশ।
খাগড়াছড়ির অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে। সেখানে স্থানীয় মানুষ ও দূরদূরান্ত থেকে আসা বহু মুসল্লিকে নামাজ আদায়ের জন্য কয়েক কিলোমিটার দূরে যেতে হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে একটি ছোট মসজিদ বা নামাজের স্থান নির্মাণের দাবি উঠে আসছে। একটি পর্যটনকেন্দ্রে মানুষের মৌলিক ধর্মীয় প্রয়োজনের বিষয়টি বিবেচনায় আনা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই সাধারণ দাবিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভাজনমূলক বক্তব্য, উসকানি এবং পারস্পরিক বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ এমনভাবে কথা বলছে যেন পাহাড় কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি, অথবা সেখানে অন্য নাগরিকদের ধর্মীয় অধিকার সীমিত করা যায়। এ ধরনের মানসিকতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সাংবিধানিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একইসঙ্গে এটাও মনে রাখা জরুরি—কয়েকজন উগ্র বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেওয়া ব্যক্তির কর্মকাণ্ড দিয়ে পুরো কোনো জাতিগোষ্ঠীকে বিচার করা অন্যায়। পাহাড়ের সাধারণ মানুষও শান্তি, সম্প্রীতি ও সম্মানের সঙ্গে বসবাস করতে চায়। তাই বিচ্ছিন্ন কিছু উসকানিমূলক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে পুরো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো সমাধান নয়; বরং তা বিভেদ আরও বাড়ায়।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে নিজ ধর্ম পালন, উপাসনালয় নির্মাণ ও স্বাধীনভাবে বসবাসের অধিকার দিয়েছে। সেই অধিকার পাহাড়ে যেমন প্রযোজ্য, সমতলেও তেমনি প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের প্রতিটি অঞ্চলই দেশের সব নাগরিকের, এবং সেই বাস্তবতাকে সম্মান করেই সবাইকে এগোতে হবে।
আলুটিলায় যদি একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়, তবে সেটি হওয়া উচিত শান্তি, নৈতিকতা ও সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে। সেখানে যোগ্য, শিক্ষিত ও দায়িত্বশীল ইমাম-মুয়াজ্জিন নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন, যারা ইসলামের সৌন্দর্য, সহনশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা প্রচার করবেন। পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করাও রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব হওয়া উচিত, যাতে কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা অস্থিরতা সৃষ্টি না হয়।
একইসঙ্গে মসজিদকে কেন্দ্র করে এমন একটি পরিবেশ গড়ে উঠতে হবে, যেখানে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, পর্যটক ও মুসল্লিদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। ধর্মীয় উপাসনালয় কখনো বিভেদের কারণ নয়; বরং সঠিকভাবে পরিচালিত হলে তা মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, শান্তি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলে।
আজ প্রয়োজন উত্তেজনা নয়, দায়িত্বশীলতা। বিদ্বেষ নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। পাহাড় কিংবা সমতল—বাংলাদেশের প্রতিটি ভূখণ্ড শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের প্রতীক হোক, এটাই হওয়া উচিত সবার প্রত্যাশা।
#আলুটিলা
#খাগড়াছড়ি
#ধর্মীয়_অধিকার
#সহাবস্থান
#সম্প্রীতি
#বাংলাদেশ