17/07/2023
সুরা: আশ-শূরা
আয়াত নং :-20
টিকা নং:37,
مَنْ كَانَ یُرِیْدُ حَرْثَ الْاٰخِرَةِ نَزِدْ لَهٗ فِیْ حَرْثِهٖ١ۚ وَ مَنْ كَانَ یُرِیْدُ حَرْثَ الدُّنْیَا نُؤْتِهٖ مِنْهَا وَ مَا لَهٗ فِی الْاٰخِرَةِ مِنْ نَّصِیْبٍ
যে আখেরাতের কৃষিক্ষেত্র চায় আমি তার কৃষিক্ষেত্র বাড়িয়ে দেই। আর যে দুনিয়ার কৃষিক্ষেত্র চায় তাকে দুনিয়ার অংশ থেকেই দিয়ে থাকি। কিন্তু আখেরাতে তার কোন অংশ নেই।৩৭
তাফসীর :
তাফহীমুল কুরআন:
টিকা:৩৭) পূর্ববর্তী আয়াতে দু’টি সত্য তুলে ধরা হয়েছে, যা আমরা সবসময় সর্বত্র দেখতে পাই। একটি হচ্ছে আল্লাহর দয়া ও মেহেরবানী তাঁর সব বান্দার জন্য সমান। অপরটি হচ্ছে, তাঁর দান ও রিযিক পৌঁছানোর বন্দোবস্ত সবার জন্য সমান নয়, বরং তার মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। সেখানে এ আয়াতে বলা হচ্ছে, তাঁর দয়া ও মেহেরবানী এবং রিযিক পৌঁছানোর ব্যবস্থায় ছোটখাট পার্থক্য অসংখ্য। কিন্তু একটি অনেক বড় মৌলিক পার্থক্যও আছে। সেটি হচ্ছে, আখেরাতের আকাংখী ব্যক্তির জন্য এক ধরনের রিযিক এবং দুনিয়ার আকাংখী ব্যক্তির জন্য অন্য ধরনের রিযিক। এটি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সত্য যা এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটিতে বলা হয়েছে। এটিকে বিস্তারিতভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। কারণ তা প্রত্যেক মানুষকে তার ভূমিকা নির্ধারণে সাহায্য করে। যারা দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের জন্য চেষ্টা-সাধনা ও কাজ করে এ আয়াতে তাদেরকে এমন কৃষকের সাথে তুলনা করা হয়েছে যারা ভূমি প্রস্তুত করা থেকে ফসল প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত উপর্যুপরি ঘাম ঝরায় এবং প্রাণান্তকর চেষ্টা চালায়। সে মাঠে যে বীজ বপন করছে তার ফসল আহরণ করে যেন উপকৃত হতে পরে সেজন্য সে এত সব পরিশ্রম করে কিন্তু নিয়ত ও উদ্দেশ্যের পার্থক্য এবং বেশীর ভাগই কর্মপদ্ধতির পার্থক্য ও আখেরাতের ফসল বপনকারী কৃষক এবং পার্থিব ফসল বপনকারী কৃষকের মধ্যে বিরাট পার্থক্য সৃষ্টি করে তাই আল্লাহ উভয় পরিশ্রমের ফলাফলও ভিন্ন রেখেছেন। অথচ এই পৃথিবীই উভয়ের কর্মক্ষেত্র। আখেরাতের ফসল বপনকারী দুনিয়া লাভ করবে না আল্লাহ তা বলেননি। কম বা বেশী যাই হোক না কেন দুনিয়া তো সে পাবেই। কারণ এখানে আল্লাহর মেহেরবানী সবার জন্য সমান এবং তার মধ্যে তারও অংশ আছে। তাই ভালমন্দ সবাই এখানে রিযিক পাচ্ছে। কিন্তু আল্লাহ তাকে দুনিয়া লাভের সুসংবাদ দান করেননি, বরং তাকে সুসংবাদ দিয়েছেন এই বলে যে তার আখেরাতের কৃষিক্ষেত্র বৃদ্ধি করা হবে। কেননা সে সেটিই চায় এবং সেখানকার পরিণামের চিন্তায় সে বিভোর। এই কৃষিক্ষেত্র বর্ধিত করার অনেকগুলো উপায় ও পন্থা হতে পারে। যেমনঃ সে যতটা সদুদ্দেশ্য নিয়ে আখেরাতের জন্য নেক আমল করতে থাকবে তাকে তত বেশী নেক আমল করার সুযোগ দেয়া হবে এবং তার হৃদয়-মন নেক কাজের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। যখন সে পবিত্র উদ্দেশ্যের জন্য পবিত্র উপায় অবলম্বন করার সংকল্প করবে তখন তার জন্য পবিত্র উপায়-উপকরণের মধ্যে বরকত দান করা হবে। তার জন্য কল্যাণের সব দরজা বন্ধ হয়ে কেবল অকল্যাণের দরজাসমূহই খোলা থাকবে, আল্লাহ এ অবস্থা কখনো আসতে দেবেন না। তাছাড়া সব চেয়ে বড় কথা হলো তার এই পৃথিবীর সামান্য নেকীও আখেরাতে কমপক্ষে দশগুণ বৃদ্ধি করা হবে। আর বেশীর তো কোন সীমাই থাকবে না। আল্লাহ যার জন্য চাইবেন হাজার বা লক্ষগুণ বৃদ্ধি করে দেবেন। এখন থাকে দুনিয়ার কৃষি বপনকারীর কথা। অর্থাৎ যে আখেরাত চায় না এবং দুনিয়ার জন্যই সব কিছু করে। আল্লাহ তাকে তার এই চেষ্টা-সাধনার দু’টি ফলের কথা সুস্পষ্টভাবে শুনিয়ে দিয়েছেন। এক, সে যত চেষ্টাই করুক না কেন দুনিয়া যতটা অর্জন করতে চায় তা সে পুরাপুরি পাবে না, বরং তার একটা অংশ মাত্র অর্থাৎ আল্লাহ তার জন্য যতটা নির্দিষ্ট করে রেখেছেন ততটাই পাবে। দুই, সে যা কিছু পাবে এই দুনিয়াতেই পাবে। আখেরাতের কল্যাণে তার কোন অংশ থাকবে না।
ফী জিলালিল কুরআন:
*কেয়ামত ও জীবন জীবিকা সম্পর্কিত দর্শন : এরপর ১৭ থেকে ২০ নং আয়াত পর্যন্ত পুনরায় ওহী ও রেসালাত নিয়ে আলােচনা করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কিতাব নাযিল করেছেন যা সত্য ও ইনসাফের মানদন্ড। এর মাধ্যমে বিভিন্ন মত ও পথের অনুসারী সম্প্রদায়ের মধ্যকার মতবিরােধ পূর্ণ বিষয়াদির মীমাংসা করা হবে। আল্লাহ তায়ালা তার শরীয়তভিত্তিক বিধানকে সূক্ষ্ম ন্যায় বিচারের মানদন্ড রূপে মানবজাতির জন্যে প্রবর্তন করেছেন। এর ওপর ভিত্তি করে মতাদর্শের বিচার করা হবে, অধিকারের বিচার হবে এবং আচার আচরণ ও কাজ কর্মের বিচার হবে। মানদন্ডের প্রকৃতি ও স্বরূপ বর্ণনার পর এখন কেয়ামতের আলােচনা আসছে। সেই দুটো বিষয়ের মাঝে একটা মিল আছে বলেই দুটোর আলােচনা পর পর এসেছে। উভয়ের মধ্যকার মিলটা হলাে, কেয়ামত হচ্ছে ন্যায়বিচার ও চূড়ান্ত রায় ঘােষণার সময়। আর আল্লাহর কালাম হচ্ছে সত্য ও ন্যায়বিচারের মানদন্ড। তবে যেহেতু কেয়ামতের বিষয়টি একটি অজানা ও অদৃশ্য ব্যাপার। তাই এমনও হতে পারে যে, এটা সহসাই ঘটে যেতে পারে। তাই বলা হচ্ছে, 'তুমি কি জানাে, সম্ভবত কেয়ামত নিকটবর্তী। এই কেয়ামতের বিষয়টি নিয়ে মানুষ গাফিল ও উদাসীন। অথচ এটি খুবই নিকটবর্তী। এটি সংঘটিত হলেই সত্য ও ইনসাফের সাথে মানুষের চূড়ান্ত বিচার অনুষ্ঠিত হবে। এই বিচারের সময় কোনাে কিছুই অবহেলা করা হবে না, কোনাে কিছুই বাদ দেয়া হবে না। এই কেয়ামতের ব্যাপারে মােমেন ও কাফেরদের দৃষ্টিভংগি কি সে সম্পর্কে পরবর্তী আয়াতে আলােচনা করা হচ্ছে। বলা হয়েছে, 'যারা তাতে বিশ্বাস করে না তারা তাকে তড়িৎ কামনা করে...'(আয়াত ১৮) অথাৎ যারা কেয়ামতে বিশ্বাসী নয়, তারা এর ভয়াবহতা অনুভব করতে পারে না এবং এই কেয়ামতের পর তাদের জন্যে কি ভয়ংকর পরিণতি অপেক্ষা করছে, সেটা তারা অনুমান করতে পারে না। তাই তারা এর কোনাে তোয়াক্কা করছে না, বরং কামনা করছে যাতে তা অতিসত্বর সংঘটিত হয়। কারণ তারা অজ্ঞ এবং অনুভূতিহীন। কিন্তু যারা পরকালে বিশ্বাসী, তারা কেয়ামতেও বিশ্বাসী। তাই তারা একে ভয় করে। কারণ এটা সংঘটিত হলে কি ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে সেটা তাদের জানা আছে। কেয়ামত যে সংঘটিত হবে তা নির্ঘাত সত্য। মােমেনরাও এটাকে সত্য বলেই জানে। কারণ সত্যের মাঝে এবং তাদের মাঝে একটা বন্ধন আছে বলেই তারা সত্যকে সত্য হিসেবেই জানে। অপরদিকে যাদের মাঝে এই গুণ নেই তাদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে, 'জেনে রাখাে, যারা কেয়ামত সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয় তারা দূরবর্তী পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত রয়েছে।' অর্থাৎ সেই জাতীয় লােকেরা বিপথগামিতার গভীরে বিচরণ করছে এবং সত্য থেকে অনেক দূরে পড়ে আছে। তাই সেখান থেকে ফিরে আসা তাদের পক্ষে একটা কঠিন ব্যাপার। পরকালের আলােচনার পর এখন জীবিকার ব্যাপারে আলােচনা করা হচ্ছে। বলা হয়েছে, 'আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের প্রতি দয়ালু...'(আয়াত ১৯) পরকালের সাথে জীবিকার সম্পর্ক বাহ্যিক দৃষ্টিতে সুদূর পরাহত মনে হলেও নিচের আয়াতটির প্রতি দৃষ্টিপাত করলে উভয়ের মাঝে একটা গভীর সম্পর্ক লক্ষ্য করা যাবে। আয়াতে বলা হয়েছে, 'যে কেউ পরকালের ফসল কামনা করে আমি তার জন্যে সেই ফসল বাড়িয়ে দেই...'(আয়াত ২০) এতে কোনাে সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের প্রতি দয়ালু। তিনি যাকে ইচ্ছা জীবিকা দান করেন। তিনি সৎ ও অসৎ এবং মােমেন ও কাফের সকলের আহার যােগান। মানুষ নিজের আহার নিজে যােগান দিতে অপারগ। যেহেতু আল্লাহ তায়ালাই তাদেরকে জীবন দান করেছেন, তাই আহার বা জীবিকার প্রাথমিক ব্যবস্থাও তিনিই করে রেখেছেন। আল্লাহ তায়ালা যদি কাফের ও পাপী-তাপী বান্দাদের আহার বন্ধ করে দিতেন, তাহলে নিজেদের আহার যােগান দেয়া তাদের পক্ষে কখনও সম্ভব হতাে না। ফলে তারা ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কারণে এবং জীবন ধারণের প্রাথমিক উপায় উপকরণের অভাবে মারা যেতাে। তখন আল্লাহর একটা বড় উদ্দেশ্য বিফল হয়ে যেতাে। আর সেটা হচ্ছে, পৃথিবীর বুকে মানুষকে জীবিত রেখে তাদেরকে কর্মের সুযােগ দেয়া এবং পরকালে এই কর্মের হিসাব নিয়ে তাদেরকে পুরস্কৃত করা অথবা শাস্তি দেয়া। তাই তিনি জীবিকার ব্যাপারটি পাপ ও পুণ্য এবং ঈমান ও কুফরের গন্ডির বাইরে রেখেছেন। বরং এটাকে সাধারণ জীবনের সাথে সম্পৃক্ত উপায় উপকরণ এবং ব্যক্তির চেষ্টা তদবীরের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। সাথে এটাকে মানুষের জন্যে পরীক্ষার একটা বিষয় হিসেবেও চিহ্নিত করে রেখেছেন যার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে পরকালে তাদের প্রতিদান দেয়া হবে। তাছাড়া আল্লাহ তায়ালা ইহকাল ও পরকাল উভয়টিকে ফসলের ক্ষেত্র বানিয়েছেন। এখন মানুষ স্বাধীনভাবে এর যে কোনাে একটিকে বেছে নিতে পারে। যারা পরকালের ফসল কামনা করে তারা এর জন্যে কাজ করে যাবে। আল্লাহ তায়ালা তাদের এই ফসলকে বাড়িয়ে দেবেন, তাদের নিয়ত অনুসারে তাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তাদের কাজে বরকত দান করবেন। পরকালের এই ফসলের সাথে সাথে ইহকালে তার জন্যে নির্ধারিত করে রাখা জীবিকাও তাকে দেয়া হবে। এই জীবিকা থেকে তাকে একটুও বঞ্চিত করা হবে না। বরং ইহকালে তাকে জীবিকাস্বরূপ যা কিছু দেয়া হবে সেটাই তার জন্যে পরকালের ফসল হিসাবেও গন্য হতে পারে যদি সে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশেই সেই জীবিকার অন্বেষণে কাজ করে, ভোগ করে এবং তা থেকে দান করে। অপরদিকে যারা ইহকালের ফসলই কামনা করে তাদেরকেও আল্লাহতায়ালা ভাগ্য অনুসারে দান করবেন। তাদের প্রাপ্য ভাগ থেকে তাদেরকে মােটেও বঞ্চিত করা হবে না। কিন্তু পরকালের ফসল থেকে তারা কিছুই পাবে না। কারণ, পরকালের ফসলের জন্যে তারা কোনাে কাজই করেনি। তাই ফলাফলেরও কোনো আশা করা তাদের সাজে না। ইহকালের ফসলের প্রত্যাশী আর পরকালের ফসলের প্রত্যাশীদের প্রতি লক্ষ্য করলে ইহকালের ফসলের প্রত্যাশীদের বােকামী ও মূর্খতা ধরা পড়বে। কারণ দুনিয়াতে তাে আল্লাহ তায়ালা সবাইকে জীবিকা দান করবেন। যার ভাগ্যে যতােটুকু নির্ধারিত আছে ততাটুকু সে পাবেই। কিন্তু পরকালের ফসল কেবল তাদের ভাগ্যেই জুটবে যারা এর প্রত্যাশী হবে এবং এর জন্যে যে কাজ করবে। যারা ইহকালের ফসলের প্রত্যাশী, তাদের মাঝে ধনীও আছে, দরিদ্রও আছে। ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান মূলত জাগতিক উপায় উপকরণ ও ব্যক্তির যােগ্যতার সাথে সাথে ভাগ্যের তারতম্যের কারণেও হয়ে থাকে। পরকালের প্রত্যাশীদের মাঝেও এই তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। তবে এই পৃথিবীর বুকে জীবিকার ক্ষেত্রে উভয় দলের মাঝে কোনো ব্যবধান নেই। উভয় দলের মাঝে আমলের ব্যবধান দেখা যাবে পরকালে। তাই যে ব্যক্তি পরকালের ফসলকে ত্যাগ করে তার চেয়ে নির্বোধ আর কে হতে পারে। কারণ এই ত্যাগের ফলে তার পার্থিব জীবনে কোনােই পরিবর্তন আসবে না। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা সত্য ও ন্যায়ের সাথেই সম্পৃক্ত হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ যে সত্য ন্যায়ের ওপর ভিত্তি করে কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে। তাই সকল প্রাণীর জন্যে জীবিকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই সত্য ও ন্যায়ের প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই। এই প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই পরকালের ফসলের প্রত্যাশীদের ক্ষেত্রেও ইহকালের ফসলের প্রত্যাশীদের আল্লাহ তায়ালা মাঝে মাঝে অধিক হারে দান করেন, আর ইহকালের প্রত্যাশীদেরকে পরকালের উত্তম প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করেন।