06/07/2026
আমাদেরকে বুঝ দেওয়া হয়েছিল বিটকয়েন মানেই হলো মুক্ত দুনিয়ার স্বাধীন মুদ্রা,কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বড় সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান ‘ব্ল্যাকরক’ সম্প্রতি বিটকয়েনের বাজারে এমন এক জোরালো ঝাঁকুনি দিয়েছে, যা এক লহমায় পরিষ্কার করে দিয়েছে যে,--
- এই ক্রিপ্টোর আসল রিমোট কন্ট্রোলটা এখন আসলে কার হাতে।
আমরা দেখলাম, আমেরিকার স্পট বিটকয়েন এক্সচেঞ্জ ফান্ড থেকে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ টাকা তুলে নেওয়ার একটা হিড়িক পড়ে গেল।
আর তার ধাক্কায়, ২০২৪ সালের পর ইতিহাসে এই প্রথমবার বিটকয়েনের দাম সাময়িকভাবে এক ধাক্কায় ৬০,০০০ ডলারের নিচে নেমে গেল।
এখানে একটা বিষয় একটু ভালো করে বুঝিয়ে নেওয়া যাক।
এই যে ‘স্পট বিটকয়েন ইটিএফ’ জিনিসটা কী?
এটা হলো এমন একটা ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সরাসরি ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জে গিয়ে বিটকয়েন কিনতে হয় না। তারা শেয়ার বাজারের মতোই ব্রোকারের মাধ্যমে বিটকয়েনের ফান্ডে ইনভেস্ট করতে পারে।
আর এই ইটিএফ বাজারের সবচেয়ে বড় ডন হলো ব্ল্যাকরকের ‘আইশেয়ার্স বিটকয়েন ট্রাস্ট’। এই ট্রাস্টটি শুধু একদিনেই প্রায় ৪৪৫ মিলিয়ন ডলারের নিট বিক্রির একটা রেকর্ড করে ফেলেছে।
তবে এখানে একটু সূক্ষ্ম টুইস্ট আছে,
ব্ল্যাকরক কিন্তু নিজে থেকে শখ করে বাজারে বিটকয়েন ডাম্প বা বিক্রি করে দেয়নি। আসল খেলাটা হয়েছে অন্য জায়গায়। যখন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্যানিক করে আইশেয়ার্স বিটকয়েন ট্রাস্ট থেকে নিজেদের টাকা তুলে নেওয়া শুরু করল,
তখন নিয়ম অনুযায়ী ওই ইটিএফ বা ফান্ডটি বাধ্য হলো তাদের শেয়ারের মূল্য পরিশোধ করতে। আর সেই ক্যাশ টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তারা নিজেদের ভল্টে থাকা বিটকয়েনের মজুত বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হলো।
এর মানে কি জানেন?
ওয়াল স্ট্রিটের একটা মাত্র ফান্ডের বিনিয়োগকারীরা ঘরে বসে কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে পুরো পৃথিবীর ক্রিপ্টো বাজার কাঁপতে পারে!
এই পুরো সিনারিওটা আসলে একটা নির্মম পরিহাস। একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যাওয়া যাক,২০০৮ সালের সেই ভয়াবহ বৈশ্বিক মন্দার কথা পড়েছেন নিশ্চয়?
যখন বড় বড় ব্যাংকিং জায়ান্টগুলোর লোভের কারণে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা গিয়েছিল, ঠিক তখনই তাদের বিকল্প হিসেবে, করপোরেট দুনিয়ার খাঁচামুক্ত একটা স্বাধীন মুদ্রা হিসেবে জন্ম নিয়েছিল এই বিটকয়েন।
অথচ আজ ২৬ সালের দুনিয়ায় এসে দেখা যাচ্ছে, সেই ব্ল্যাকরকের নেতৃত্বে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান এখন পুরো ক্রিপ্টো বাজারের মুড, তারল্য আর দাম নির্ধারণ করছে।
বিশ্বের বৃহত্তম এই ফাইনান্সিয়াল হাঙরটি এখন এমন একটা সম্পদের ঘাড় ধরে বসে আছে, যা আসলে তৈরিই হয়েছিল ওদের মতো প্রতিষ্ঠানের কবল থেকে মুক্ত থাকার জন্য।কি নির্মম পরিহাস!
অবশ্য ব্ল্যাকরক যে ইচ্ছা করে বাজার কারসাজি বা ম্যানিপুলেশন করছে, তার কোনো ডিরেক্ট আইনি প্রমাণ কিন্তু নেই।
কিন্তু আমরা জানি, এরা চাইলে দুনিয়ার বড় বড় করপোরেট বোর্ডের চেয়ার ওলটপালট করে দিতে পারে, বিশ্বের জ্বালানি খাতের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ইনভেস্টমেন্টের মোড় এক তুড়িতে ঘুরিয়ে দিতে পারে।
তাহলে বিটকয়েন -যা জন্মলগ্ন থেকেই একটা প্রতিষ্ঠান-বিরোধী বা অ্যান্টি-করপোরেট আবেগের সাথে যুক্ত সম্পদ -সেটা কেন এদের এই ক্ষমতার নিয়মের বাইরে থাকবে বলো?
দিনশেষে, বিটকয়েনের এই রূপান্তর আমাদের এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। যে স্বাধীন কারেন্সি জন্ম নিয়েছিল ওয়াল স্ট্রিটের করপোরেট একাধিপত্যকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য, আজ সময়ের ব্যবধানে সেই ওয়াল স্ট্রিটের হাঙরদের তহবিলই তার ভাগ্য নির্ধারণ করছে।
ক্রিপ্টোকে তারা নিষিদ্ধ করেনি, বরং নিজেদের কোটি কোটি ডলারের পুঁজিতে এমনভাবে হাতে নিয়েছে, মুক্ত দুনিয়ার সেই বিদ্রোহী মুদ্রা আজ ট্র্যাডিশনাল ফাইনান্সিয়াল সিস্টেমেরই একটা অংশে পরিণত হয়েছে।
পুঁজিবাদের এই চেনা খেলায় সিস্টেমের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই; কারণ আপনি যে অস্ত্র দিয়ে সিস্টেমকে ভাঙতে চাইবেন, দিনশেষে সেই অস্ত্রটাই হয়তো মোটা অঙ্কের চেকে কিনে নেবে কোনো ব্ল্যাকরক!