23/09/2019
#ভেজা_কাক_হয়ে_থাক_আমার_মন
#দার্জিলিং
বছরের শুরুতে কাশ্মির ঘুরে আসার পরেও মনে হচ্ছিলো অনেকদিন কোথাও যাই না। ঈদের বন্ধে আমার সহকর্মী দার্জিলিং ঘুরে এসে মজার গল্পে কান ঝালাপালা করতেই সিন্ধান্ত পাকা করে ফেললাম। আশুরার বন্ধের সাথে আরো ২ দিন ছুটি মিলিয়ে প্লান করে ফেললাম দার্জিলিং এর।
ভিসা করিয়েছিলাম ফুলবাড়ি পোর্ট দিয়ে। ৯ তারিখের রাতের শ্যামলী এসি বাসে কল্যানপুর থেকে ফুলবাড়ি হয়ে শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিলাম। ( ১৫০০টাকা টিকেট) সকাল ৭ টায় পঞ্চগড়, সকাল ৮ টায় তেতুলিয়া। তেতুলিয়া থেকে বাসের সুপারভাইজার চেইঞ্জ হয়ে গেল। উঠলেন উজ্জ্বল ভাই যিনি কিনা বর্ডার স্পেশালিষ্ট, ভ্রমন কর বাবদ ৫০০ আর বাংলাদেশের অংশের জন্য ২০০ করে টাকা দিলাম উজ্জ্বল ভাইকে। বর্ডারে এসে ফ্রেশ হয়ে ব্রাশ করে ইমিগ্রেশন করে নিলাম। বাংলাদেশ বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশন অফিস একদম নতুন এবং পরিষ্কার, বসার পর্যাপ্ত যায়গাও আছে। মনে রাখবেন চাকুরীজিবী হলে NOC নিতে ভুলবেন না।
বাংলাদেশ অংশের কাজ শেষ হলে খেতে গেলাম পাশের সিমান্ত হোটেলে, ভাত ভর্তা ডাল আহা সে কি অমৃত। না খেলেই নয়। খাবার হোটেলে পরিচিত হলাম আরো দুই কাপল এর সাথে যারাও কিনা দার্জিলিং যাচ্ছে। ভাব জমিয়ে ফেললাম তাদের সাথে, বললাম ৬ জন একসাথে থাকলে ঘোরাঘুরি সুবিধা হবে, ওনারাও রাজি হয়ে গেলেন। ব্যাস ২ জন থেকে হয়ে গেলাম ৬ জন।
ভারত অংশের ইমিগ্রেশন তারাতারি হয়ে গেল কিন্তু দিতে হল ২০০ করে বাংলা টাকা পার পারসন, রেহাই নাই দিতেই হবে। এর পরে টাকা ভাংগিয়ে রুপি করে নিলাম ইমিগ্রেশন অফিসের উল্টোদিক থেকে। যেহেতু আমাদের ২ জনের শিলিগুড়ি পর্যন্ত টিকিট নেয়া বাকি ৪ জনের নেয়া নেই তাই আমরা ২ জন শ্যামলির ছোট্ট মাইক্রতে করে শিলিগুড়ি দার্জিলিং ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করলাম। বাকিরাও চলে এলেন ব্যাটারি চালিত অটোতে করে সময় লাগবে ২০-৩০ মিনিট। শিলিগুড়ি তে সে কি গো গরম দাদা আর বোলবেন না।
তিন কাপল মিলে একটা ১০ সিটের সুমো রিজার্ব নিয়ে নিলাম ১৪০০ রুপি দিয়ে। শুরু হল যাত্রা। কিছুদুর সমতল চা বাগান দেখতে দেখতে দূরে পাহাড় দেখতে পেলাম। শুরু হল ঝুম বৃষ্টিতে পাহাড় চড়াই। উঠছিত উঠছি শেষ হচ্ছে না। ড্রাইভার কে বল্লাম পেট চো চো করছে কিছু না খেলেই নয়। উনি পাহাড়ি রেস্টুরেন্ট দেখে থামালেন। সুন্দর মানুষ পাহাড়ি রা রান্নাও সুন্দর, খেয়ে দেয়ে আমার শুরু। বৃষ্টি আর পাহাড় চড়াই চলছেই। সন্ধ্যা ৭ টার দিকে দার্জিলিং এ পোছে হোটেল নিয়ে নিলাম বিগ বাজারের পাশে টিম্বার লজ ৮০০ রুপি করে। যেহেতু অফ সিজন তাই সুবিধা পেলাম দামাদামিতে। বাকি দুই কাপল তাদের ঠিক করা হোটেলে উঠে গেলেন। হোটেলে ফ্রেশ হয়ে লোকমান ভাই আর জুয়েল ভাই ( অন্য ২ কাপল) এর ফ্যামিলি সহ চলে গেলাম মুসলিম হোটেল এ খেলাম পরটা আর গরু ভুনা, খেয়ে দেয়ে পরেরদিন লোকাল সাইটসিয়িং এর জন্য গাড়ি নিলাম টয়োটা ইনোভা ৮ সিট। ২৪০০ রুপি দিয়ে।
যেহেতু বর্ষাকাল তাই আমরা ঠিক করেছিলাম আমরা টাইগার হিল যাবোনা। তাই পরের দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম ৭ টায়, ঊঠে হোটেলের জানালা খুলতেই চোখ ছানাবড়া - স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘা, আহা সে কি মধু। বিবিকে তাড়া দিয়ে রেডি হয়ে চলে গেলাম ক্যাভেন্টার এ নাস্তা করতে। দুই তলায় ঊঠে দার্জিলিং শহরের দৃশ্য দেখতে দেখতে নাস্তা সেরে ফেললাম বাকিরাও চলে এলেন। এই দিন আমরা ঘুরলাম পিস প্যাগোডা, ঘুম মনেস্ট্রি, বাতাসিয়া লুপ, রক গার্ডেন, দার্জিলিং জু, ক্যাবল কার। ভাগ্য ভালো থাকায় বাতাসিয়া লুপ এ দেখা পেলাম টয় ট্রেন এর। জু এর কথা না বললেই নয় এত্ত সুন্দর করে আর এত্ত পরিষ্কার করে গুছিয়েও চিড়িয়াখানা রাখা যায় সেটা না দেখলে বোঝা যাবে না। কেবল কার ছিল অসাধারন, হাত বাড়িয়েই মেঘ ধরে গিলে ফেলুন টুপ করে। অই দিন ফিরে পরের দিনের জন্য গাড়ি ঠিক করলাম। পরের দিন আমরা যাবো কালিম্পং। ১০ সিটের টাটা জিপ নিলাম ৩২০০ রুপি দিয়ে।
সকাল ৮ টায় রহনা দিলাম। ১০ টা নাগাদ পৌছে গেলাম লামাহাট্টা ভিলেজ এ। লম্বা লম্বা পাইন গাছের সমাহার, মাঝখানে বাগান। একটু ভিতরের দিকে গেলে একদম নিশ্চুপ নিরবতায় দুরের পাহার দেখবেন আর চাইলে গাছের সাথে দু একটা কথাও সেরে নিতে পারেন। লামাহাট্টা থেকে বের হয়ে নাস্তা সেরে নিলাম। এর পরে গেলাম তিস্তা ভিউ পয়েন্ট। সেখান থেকে তিস্তা নদির উপরে সেতু পেরিয়ে চলে গেলাম কালিম্পং শহর, প্রথমে আমরা গেলাম ক্যাকটাস বাগান। হাজারো বাহারি ক্যাকটাস, সেখান থেকে গেলাম গল্ফ মাঠ, আর্মিদের যায়গা তাই ভিতরে ঢুকতে দিবে না। তাও এত্ত ভালো লাগলো যে বলতে ইচ্ছে হল একটু যেতে দে ভাই আমাকে একটু হারিয়ে যেতে দে।
এর পরে আমরা গেলাম ডেলো পার্ক আর সাইন্স সিটি। সাথে বাচ্চা থাকলে অবশ্যই সাইন্স সিটি যাবেন। ডেলো পার্কে গিয়ে আমাদের মন্টাই খারাপ, এত্ত সুন্দর পার্ক কিন্তু মেঘের কারনে সেরকম কিছুই দেখলাম না। সন্ধ্যা ৭ টা নাগাদ ফিরে এলাম দার্জিলিং।
পরের দিন আমরাদের ছিল দার্জিলিং এ আয়েশ করার দিন। পাশেই রিং মল এ গিয়ে মুভি দেখলাম, ঐতিহ্যবাহী গ্লেনারিস এ খেলাম, শপিং করলাম। সারাটাদিন ই বৃষ্টি লেগি ছিলো।
আসার পথে হোটেলের সামনে থেকেই শেয়ারড ট্যাক্সি তে করে চলে এলাম শিলিগুড়ি, সেখান থেকে অটোতে করে বর্ডার। আসার পথে ইন্ডিয়ান বর্ডারে ঝামেলা পাকালো দাদাবাবুরা। যেহেতু শপিং করেছি তাই ওনাদের এক্সট্রা ৩০০ টাকা হাদিয়া দিতে হল। বর্ডার পার হয়ে শ্যামলী তে করে ঢাকা।
দার্জিলিং এবং কালিম্পং দুটো শহর ই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, সব গুলো টুরিস্ট স্পটেই কিছু দূর পর পর ডাস্টবিন রাখা আচ্ছে। আবর্জনা সেখানে ফেলুন। আর গাড়িতে ভ্রমনের সময় একটা পলিথিন নিয়ে নিন এবং সেটাকেই গাড়িতে থাকা কালিন ময়লাগুলো ফেলুন।