22/01/2026
উমরাহ আদায়ের পদ্ধতি:
উমরাহ হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যা মুসলমানদের জন্য এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা বয়ে আনে। এটি ছোট হজ নামেও পরিচিত। এর নির্দিষ্ট কিছু নিয়মকানুন রয়েছে যা সঠিকভাবে পালন করা অত্যন্ত জরুরি। নিচে উমরাহ আদায়ের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো:
প্রথম ধাপ: ইহরাম বাঁধা
উমরাহর প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ইহরাম বাঁধা। ইহরাম অর্থ হলো উমরাহর নিয়তে নির্দিষ্ট কিছু হালাল জিনিসকে নিজের জন্য হারাম করে নেওয়া।
• ১. গোসল ও পরিচ্ছন্নতা: ইহরাম বাঁধার আগে ভালো করে গোসল করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হন, নখ কাটুন এবং শরীরের অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করুন।
• ২. পোশাক: পুরুষরা সেলাইবিহীন সাদা রঙের দুটি চাদর পরিধান করবেন – একটি লুঙ্গির মতো করে পরবেন এবং অন্যটি গায়ে জড়াবেন। নারীরা তাদের সাধারণ মার্জিত পোশাক পরিধান করবেন, তবে মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জি ঢাকা যাবে না (ইচ্ছামতো)।
• ৩. সুগন্ধি: ইহরামের পোশাক পরার আগে শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার করা মুস্তাহাব। তবে ইহরামের পোশাক পরার পর বা ইহরামের অবস্থায় কোনো সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে না।
• ৪. দুই রাকাত নামাজ: সম্ভব হলে ইহরামের নিয়তে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করুন।
• ৫. নিয়ত: নামাজের পর মনে মনে উমরাহর নিয়ত করুন এবং মুখে বলুন: "আল্লাহুম্মা ইন্নী উরীদুল উমরাতা ফায়াসসিরহা লী ওয়াতাকাব্বালহা মিন্নী।" (হে আল্লাহ! আমি উমরাহর ইচ্ছা করছি, আপনি তা আমার জন্য সহজ করে দিন এবং আমার পক্ষ থেকে কবুল করুন।)
• ৬. তালবিয়াহ: নিয়তের পর উচ্চস্বরে একবার তালবিয়াহ পড়ুন:
• "লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।"
• (আমি উপস্থিত, হে আল্লাহ! আমি উপস্থিত, আমি উপস্থিত। তোমার কোনো অংশীদার নেই, আমি উপস্থিত। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও সকল নিয়ামত তোমারই এবং সকল সাম্রাজ্যও তোমার। তোমার কোনো অংশীদার নেই।)
• তালবিয়াহ শুরু করার পর থেকে কাবা শরীফ দেখার আগ পর্যন্ত এটি বারবার পড়তে থাকুন।
দ্বিতীয় ধাপ: তাওয়াফ
ইহরাম বাঁধার পর মক্কায় পৌঁছে সরাসরি মাসজিদুল হারামে যাবেন এবং তাওয়াফ শুরু করবেন। তাওয়াফ অর্থ হলো কাবা শরীফকে সাতবার প্রদক্ষিণ করা।
• ১. ইযতিবা ও রমল (পুরুষদের জন্য): তাওয়াফের আগে পুরুষরা তাদের ইহরামের উপরের চাদরটি ডান বগলের নিচ দিয়ে এনে বাম কাঁধের উপর রাখবেন (ইযতিবা)। প্রথম তিন চক্করে পুরুষরা ছোট ছোট কদমে দ্রুত হাঁটবেন (রমল)। বাকি চার চক্কর স্বাভাবিক গতিতে হাঁটবেন।
• ২. তাওয়াফ শুরু: হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) বরাবর এসে ডান হাত দিয়ে ইশারা করে বা সম্ভব হলে চুম্বন করে "বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার" বলে তাওয়াফ শুরু করবেন।
• ৩. প্রদক্ষিণ: কাবা শরীফকে বামপাশে রেখে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে প্রদক্ষিণ করবেন।
• ৪. রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝের দোয়া: প্রতিটি চক্করে রুকনে ইয়ামানি (কাবা ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ) এবং হাজরে আসওয়াদের মাঝখানে এই দোয়াটি পড়া মুস্তাহাব: "রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আযাবান্নার।"
• ৫. সাত চক্কর: হাজরে আসওয়াদ থেকে শুরু করে হাজরে আসওয়াদে এসে প্রতিটি চক্কর পূর্ণ হবে। এভাবে সাতটি চক্কর সম্পন্ন করবেন।
• ৬. তাওয়াফের নামাজ: তাওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে সম্ভব হলে দুই রাকাত নামাজ আদায় করুন। ভিড় থাকলে হারামের যে কোনো স্থানে আদায় করতে পারেন।
• ৭. যমযমের পানি: নামাজ শেষে যমযমের পানি পান করুন।
তৃতীয় ধাপ: সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ
তাওয়াফ শেষ করার পর সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাঈ করতে হবে। সাঈ অর্থ হলো এই দুই পাহাড়ের মাঝে সাতবার আসা-যাওয়া করা।
• ১. সাঈ শুরু: সাফা পাহাড়ে উঠে কাবা শরীফের দিকে মুখ করে "ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শাআইরিল্লাহ" (নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত) আয়াতটি পাঠ করে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। তারপর "বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার" বলে সাঈ শুরু করুন।
• ২. দ্রুত হাঁটা: সাফা থেকে মারওয়ার দিকে যাওয়ার সময় সবুজ চিহ্নিত স্থান অতিক্রম করার সময় পুরুষরা দ্রুত পায়ে দৌড়াবেন (হরওয়ালা)। নারীরা স্বাভাবিক গতিতে হাঁটবেন।
• ৩. সাতবার আসা-যাওয়া: সাফা থেকে মারওয়া পর্যন্ত একবার যাওয়া একটি চক্কর। আবার মারওয়া থেকে সাফা পর্যন্ত আসা আরেকটি চক্কর। এভাবে সাতটি চক্কর পূর্ণ করবেন। সপ্তম চক্কর মারওয়া পাহাড়ে গিয়ে শেষ হবে।
• ৪. দোয়া ও জিকির: সাঈ করার সময় আল্লাহর জিকির, তসবিহ এবং দোয়া করতে থাকুন।
চতুর্থ ধাপ: চুল কাটা বা ছোট করা (হলক বা কসর)
সাঈ শেষ করার পর উমরাহর শেষ ধাপ হলো চুল কাটা বা ছোট করা।
• ১. হলক (মুণ্ডন): পুরুষরা মাথার সমস্ত চুল কামিয়ে ফেলবেন। এটি উত্তম।
• ২. কসর (ছোট করা): পুরুষরা তাদের মাথার সমস্ত চুল সমানভাবে ছোট করতে পারেন। প্রতিটি চুলের এক আঙুল পরিমাণ ছোট করা যথেষ্ট। নারীরা তাদের চুলের আগা থেকে এক আঙুল পরিমাণ কাটবেন।
এই ধাপ সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই আপনার উমরাহ পরিপূর্ণ হয়ে যাবে এবং আপনি ইহরামের সকল নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন।
উমরাহ পালনের সময় ধৈর্য, বিনয় এবং আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলের উমরাহ কবুল করুন। আমিন।
https://www.facebook.com/groups/hajjumrahhelpful
Send a message to learn more