30/09/2014
জাপানে উচ্চশিক্ষা এবং স্থায়ী বসবাসের সুযোগ
উচ্চশিক্ষা যেন সোনার হরিণ। বাংলাদেশে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা সরকারি ২৩ টি এবং বেসরকারি ৪৮ টি । প্রতি বছর এর মতো এই বছর ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলো তে ভর্তির জন্য এক প্রকার যুদ্ব করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। একে তো আসন কম তার উপর ভর্তি বানিজ্য। সবকিছু মিলিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য অনেকেই ভিনদেশে পাড়ি জমাতে চান। পছন্দের তালিকায় ইংল্যান্ড, ক্যানাডা, আমেরিকা, মালয়শিয়া, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, সুইডেন, চীন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, জাপান সহ আরও অনেক দেশ রয়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এক্ষেত্রে জাপানকে বেছে নিতে পারেন। এশিয়ার এই দেশটিতে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে পড়াশোনার অনেক সুযোগ।
কেন জাপান কে নির্বাচন করবেনঃ
আপনি যদি এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তবে জাপানী ভাষা কোর্সে ১ থেকে ২ বৎসর পর্যন্ত পড়া যায়। এর পরে বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজে ব্যাচেলর্স ডিগ্রিতে এবং ব্যাচেলর্স ডিগ্রিতে উত্তীর্ণ হলে মাস্টার্সে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারেন এবং স্কলারশিপ সহ পড়াশোনার সুযোগ পাবেন।আবার জাপানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রচুর বৃত্তি দিয়ে থাকে। গ্রাজুয়েট পর্যায়ে পড়ালেখার জন্য সরকারী বেসরকারী সব বিশ্ববিদ্যালয়েই আর্থিক সহায়তা পাওয়ার ব্যাবস্থা করা যায়। এশিয়ান ইয়ুথ ফেলোশিপ, হিউম্যান রিসোর্সেস স্কলারশিপ ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ও স্কলারশিপ ফাউন্ডেশন বিদেশী ছাত্রদের বৃত্তি দিয়ে থাকে। জাপান সরকার ও সে দেশের বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশি মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রতি বছরই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর জন্য বৃত্তি দিয়ে থাকে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও ঢাকার জাপান দূতাবাসের মাধ্যমে বৃত্তির আবেদন করতে পারবে।জাপান সরকারের ওয়েবসাইট থেকে আপনি বৃত্তির তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। তাছাড়া এসোসিয়েটেড ডিগ্রি, ব্যাচেলর্স ডিগ্রি, মাস্টার্স ডিগ্রি ও ডক্টরেট প্রোগ্রামে পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য আপনি জাপানে যেতে পারেন। পড়াশোনার শেষে বৈধভাবে কাজ করার ও স্থায়ী ভাবে পরিবার সহ বসবাসের সুযোগ।একটি সমৃদ্ধ দেশের অত্যন্ত ভদ্র অধিবাসীদের সঙ্গে বসবাসের সুযোগ পাবেন। যা আপনাকে নিয়ে যাবে সাফল্যের উচ্চশিখরে।
লেংগুয়েজ কোর্স কমপ্লিট করে আপনি জাপানে যেসব বিষয়ে ব্যাচেলর্স ও মাস্টার্স ডিগ্রির জন্য ভর্তি হতে পারবেন : হিউম্যান স্ট্যাডিজ, ল্যাঙ্গুইস্টিক স্টাডিজ, হিস্টোরিকেল স্টাডিজ, হিউম্যান সায়েন্স, এডুকেশনাল সায়েন্স, ল এন্ড সোসাইটি, পাবলিক ল এন্ড পলিসি, ইকনোমিক্স, ম্যানেজমেন্ট, একাউন্ট্যান্সি, ফিজিক্স, এস্ট্রোনমি, জিওফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, আর্থ সায়েন্স, মেডিক্যাল সায়েন্স, ডিজেবিলিটি সায়েন্স, ডেন্টিস্ট্রি, ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি, বায়োফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্স, লাইফ সায়েন্স,অটোমোবাইল, মেকানিক্যাল সিস্টেমস এন্ড ডিজাইন, ন্যানোম্যাকানিক্স, এ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং, কোয়ান্টাম সায়েন্স এন্ড এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং, এপ্লাইড ফিজিক্স, এপ্লাইড কেমিস্ট্রি, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োসলিকিউলার ইঞ্জিনিয়ারিং, মেটেরিয়াল সায়েন্স, মেটেরিয়ালস প্রসেসিং, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্কিটেকচার এন্ড বিল্ডিং সায়েন্স, ম্যানেজমেন্ট অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, বায়োইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড রোবটিক্স, বায়োলজিক্যাল রিসোর্সেস সায়েন্স, বায়োসায়েন্স এন্ড বায়োটেকনোলজি, এরিয়া স্টাডিজ, ইন্টারকালচারাল রিলেশন্স, কম্পিউটার এন্ড ম্যাথমেটিকেল সায়েন্স, সিস্টেম ইনফরমেশন সায়েন্স ও এডুকেশনাল ইনফরমেটিক্সসহ ইত্যাদি ।
ভর্তির যোগ্যতা;
নূ্ন্যতম এইচএসসি, তবে ডিপ্লোমা, এ-লেভেল, ব্যাচেলর, মাস্টার্স, ইউনিভার্সিটি ফাউন্ডেশন কোর্সে কৃতকার্য শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য জাপানি কলেজ/ ইউনিভার্সিটি/এডুকেশন ইনিস্টিটিউটে আবেদন করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে আপনাকে বাংলাদেশে থেকে জাপানি ভাষা শিখে নিতে হবে। ৬ মাসের জাপানি ভাষা কোর্স কমপ্লিট করেও এ্যাপ্লাই করতে পারেন, আবার কোর্স চলাকালিনও (কমপক্ষে ৩ মাস ক্লাস করে) এ্যাপ্লাই করতে পারেন। শিক্ষার্থীকে অর্থনৈতিকভাবে অবশ্যই স্বচ্ছল হতে হবে।
কেমন খরচ পড়বে:
জাপানের কলেজ/ ইউনিভার্সিটি/এডুকেশন ইনিস্টিটিউট গুলোতে জাপানিজ ভাষা/আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কোর্সের জন্য প্রতিষ্ঠান ভেদে কোর্স ফি কম-বেশি হয়ে থাকে। এছাড়া যাতায়াত, শিক্ষা উপকরণসহ অন্যান্য খরচ তো রয়েছেই। এ পদ্বতিতে শুরুতে ৮ -৮.৫ লাখ টাকা লাগতে পারে। এটার মধ্যেই এলিজিবিলিটি সার্টিফিকেট সংগ্রহের প্রকৃয়া, লেংগুয়েজ ইনিস্টিটিউটে ভর্তি ফি, লেংগুয়েজ ইনিস্টিটিউটে ১ বছরের কোর্স ফি, প্লেন ভাড়া, সব হয়ে যাবে। কিছু কম হতে পারে কিন্তু বেশি হওয়ার কথা নয়। তাই প্রথম ১ বছর থাকা, খাওয়া, যতায়াত, আর বীমা খরচ (কিছু ক্ষেত্রে) ছাড়া আর তেমন কিছু মেজর খরচ নাই। থাকা খাওয়া, যাতায়াত বাবদ খরচ মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লগবে। (খরচ অনেকটাই নিজের উপর নির্ভর করে)। বিদেশী ছাত্রদের স্বাস্থ্য বীমা থাকা বাধ্যতামূলক (প্রায় ১৫ হাজার টাকা বাৎসরিক খরচ)।
পড়াশোনার মাধ্যম;
জাপানের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপানি ভাষায় শিক্ষাদান করা হয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ভাষাতেও শিক্ষাদান করে। জাপানি ভাষায় দক্ষতা ভিসা ও খন্ডকালীন কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক। বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ-জাপান এডুকেশন সেন্টার, সহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠানে জাপানি ভাষা শিক্ষার ওপর কোর্স করা যায়। আবেদনের আগে জাপানি ভাষা শিখে নেয়াটাই হবে সঠিক সিদ্ধান্ত।
ভর্তি প্রক্রিয়া;
জাপানে পড়াশোনা করাতে যাবার সবচেয়ে সহজ পদ্বতি হল জাপানের কোন লেংগুয়েজ ইনিস্টিটিউট থেকে এলিজিবিলিটি সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা। এলিজিবিলিটি সার্টিফিকেট পেলে সেই ইনিস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে ভিসার জন্য এ্যাপ্লাই করুন। ভিসা নিয়ে জাপান চলে যান। লেংগুয়েজ কোর্স করে নিন। তারপর আপনার কাংখিত সাবজেক্টে ভর্তি হয়ে যান। ফুল টাইম ওয়ার্ক পারমিটের জন্যও এ্যাপ্লাই করতে পারেন। এতে শুরুতে ভিসা পেতেও সুবিধা হয়।
এক্ষেত্রে ঢাকায় বাংলাদেশ-জাপান এডুকেশন সেন্টার (বি,জে,ই,সি) এর অফিস বাংলাদেশে আছে। যারা জাপান অফিস এবং বাংলাদেশ অফিসের মাধ্যমে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জাপানী ভাষা শিক্ষা কোর্সে ভর্তি এবং জাপানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ব্যপারে খুব কম খরচে সার্ভিস দিচ্ছে। তবে যার মাধ্যমেই কাজ করান না কেন কথা বলার সময় অবশ্যই জেনে নিবেন যে তাদেরকে কোন জাপানিজ লেংগুয়েজ ইনিস্টিটিউট অথরাইজেশন দিয়েছে কিনা। জাপানের কোন লেংগুয়েজ ইনিস্টিটিউটের অথরাইজেশন না থাকলে প্রতারিত হবার সম্ভাবনা আছে।। তাছাড়া শিক্ষার্থী নিজেও ইন্টারনেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নিতে পারেন।
ভিসার জন্য আবেদন;
ভিসার প্রকৃয়া খুব জটিল কিছু নয়। তবে কলেজ/ ইউনিভার্সিটি/এডুকেশন ইনিস্টিটিউট খেকে এলিজিবিলিটি সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হবে/ ভর্তি হতে হবে। ভিসার জন্য অথবা জাপানে পড়াশোনা করতে হলে টোফেল/IELTS না হলেও চলে, কিন্তু জাপানি ভাষা জানা থাকা বাধ্যতামূলক। ভিসার আবেদনের ক্ষেত্রে ভর্তির কাগজপত্র, নাগরিকত্ব সনদ, পাসপোর্টের কপি, সব শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণপত্র, সদ্য তোলা ছবি প্রভৃতি জমা দিতে হবে। জাপানি দূতাবাসের ওয়েব ঠিকানায় অনেক তথ্য পেতে পারেন। ভিসার আবেদন ও প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য দূতাবাসে সরাসরিও যোগাযোগ করতে পারেন। ভিসার জন্য আরো যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, তা হল অবশ্যই স্পন্সর লাগবে। সুবিধা হল যে কেউ স্পন্সর হতে পারে (মানে, ব্লাড রিলেশন না থাকলেও হবে)। ব্যাংকে স্পন্সরের কমপক্ষে ১৫ লাখ টাকা ক্যাশ দেখাতে হয়, ৬ মাসের ব্যাংক সার্টিফিকেট লাগে।
পার্টটাইম কাজের সুযোগঃ
জাপানে অবস্থানরত বিদেশি শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টা পর্যন্ত খণ্ডকালীন কাজ করার সুযোগ পায়। তবে এজন্য কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হয়। ফাস্ট ফুড ক্যাটারিং, স্টোর, কম্পিউটার, অনুবাদ প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনেক কাজের সুযোগ রয়েছে দেশটিতে।মাসে ১লাখ থেকে ১লাখ ৫০ হাজার টাকা আয় করা যায় (কেউ কেউ বেশিও করে)।
মোঃ মঞ্জুর হাসান
জাপানী ভাষা প্রশিক্ষক, অনুবাদক এবং দোভাষী
ইমেইল- [email protected]