26/04/2026
#হজ ও ওমরাহ সফর: কষ্টের সওয়াব নাকি অভিযোগের গুনাহ?
পবিত্র হজ বা ওমরাহ নিছক কোনো ভ্রমণ নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক কঠিন ইবাদত ও পরীক্ষা। এই সফর নিয়ে আমাদের বর্তমান সমাজের একটি বড় ট্র্যাজেডি হলো—আমরা দুনিয়াবি আনন্দ ভ্রমণে লক্ষ টাকা খরচ করতে দ্বিধা করি না, সেখানে হাজারো কষ্টে আমাদের মুখে হাসি থাকে; কিন্তু দ্বীনি সফরে সামান্য একটু এদিক-সেদিক হলেই আমাদের অভিযোগের পাহাড় জমে ওঠে।
আল্লাহ তাআলার ঘোষণা ও আমাদের আচরণ:
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ইরশাদ করেছেন:
“হজের নির্ধারিত মাসসমূহ রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি এই মাসগুলোতে হজ করার সংকল্প করে, তার জন্য হজের মধ্যে স্ত্রী-সহবাস, কোনো প্রকার অবাধ্যতা (পাপকাজ) এবং ‘ঝগড়া-বিবাদ’ করা বৈধ নয়।” (সূরা আল-বাকারাহ: ১৯৭)
অথচ আমরা কী করি? সামান্য একটু খাবার দেরিতে হলে, মোয়াল্লেমের পক্ষ থেকে সামান্য ত্রুটি হলে বা এজেন্সির সাথে কথার একটু অমিল হলে আমরা তাদের চৌদ্দগুষ্ঠি নিয়ে সমালোচনা শুরু করি। আমরা ভুলে যাই, এই ঝগড়া আর পরনিন্দা আমাদের হজের সমস্ত সওয়াব নিমিষেই পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে।
শয়তানের সূক্ষ্ম ধোঁকা:
এটি মূলত ইবলিশের এক বিশাল চাল। শয়তান জানে যে, আপনি কষ্টের টাকা ব্যয় করে আল্লাহর ঘরে এসেছেন। সে সরাসরি আপনাকে ইবাদত থেকে সরাতে পারে না, তাই সে আপনার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দেয়। আপনি যখন সামান্য কষ্টের কারণে এজেন্সির সমালোচনা বা মানুষের গিবত করেন, তখন শয়তান সফল হয়—কারণ আপনার আমলটি তখন আর নিষ্কলুষ থাকে না।
বাজেট বনাম কাঙ্ক্ষিত সেবা:
আজকাল অনেকেই চান সবচেয়ে কম দামে ওমরাহ করতে, কিন্তু সুবিধা চান রাজকীয়। বাস্তবতা হলো, বর্তমান বাজার মূল্যে মানসম্মত হোটেল, যাতায়াত এবং আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে ২ লক্ষ টাকার নিচে ওমরাহ করা প্রায় অসম্ভব। অনেক এজেন্সি হাজিদের সামর্থ্যের কথা চিন্তা করে বিভিন্ন প্যাকেজ করে। কিন্তু আমরা কম প্যাকেজে গিয়ে কেন বেশি সুবিধা আশা করি? কেন সামান্য ২-৫ হাজার টাকা বাড়লে আমাদের মাথা ঠিক থাকে না? মনে রাখবেন, কম টাকায় বেশি সুবিধা দিতে গিয়ে কোনো এজেন্সি যদি মিথ্যা বলে সেটা তাদের অপরাধ, কিন্তু জেনে-শুনে সস্তায় গিয়ে রাজকীয় সেবা আশা করা আমাদের নিজেদের বোকামি।
পূর্বসূরিদের ত্যাগ বনাম আমাদের বিলাসিতা:
একবার ভাবুন ইব্রাহিম (আ.)-এর কথা, ভাবুন আমাদের নবী করিম (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামদের কথা। তারা মাইলের পর মাইল তপ্ত মরুভূমি পাড়ি দিয়ে, না খেয়ে, চরম কষ্টে হজ পালন করতেন। সেই তুলনায় আজকের এসি গাড়ি, উন্নত হোটেল আর আধুনিক সুযোগ-সুবিধা তো বিলাসিতা মাত্র! আমাদের পূর্বপুরুষদের সেই ত্যাগ আর ধৈর্যের ছিটেফোঁটাও কি আমাদের মাঝে নেই?
এজেন্সি কি সত্যিই খারাপ?
সব এজেন্সি খারাপ নয়। কিছু অসাধু লোক অবশ্যই আছে, কিন্তু অধিকাংশ এজেন্সিই চায় মেহমানদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে। কিন্তু মনে রাখবেন, সৌদি আরবে পরিস্থিতির পরিবর্তন, যান্ত্রিক গোলযোগ বা ভিড়ের কারণে অনেক সময় এজেন্সির অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিছু ত্রুটি হয়ে যায়। এই সময় একজন মুমিনের কাজ হলো—ধৈর্য ধরা এবং আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করা, মানুষের সমালোচনা করে আমল নষ্ট করা নয়।
উপসংহার:
হে আল্লাহর মেহমানগণ! হজের সফরকে বিনয় ও সবর দিয়ে সাজান। সামান্য টাকা বা কষ্টের কাছে নিজের সওয়াবকে বিক্রি করে দেবেন না। মনে রাখবেন, যতটুকু কষ্ট করবেন, ততটুকু নেকি পাবেন। অন্যের দোষ না খুঁজে নিজের আমলের দিকে নজর দিন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহিহভাবে, ঝগড়া-বিবাদমুক্ত মকবুল হজ ও ওমরাহ নসিব করুন। আমিন।