02/07/2026
একটা বিষয় খেয়াল করেছেন?
অনেকেই মনে করেন, হালাল মানেই শুধু মাংস।
আসলে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং দ্রুত বর্ধনশীল ভোক্তা বাজারগুলোর একটি।
এটি শুধু খাবার নয়।
এটি পর্যটন।
এটি কসমেটিকস।
এটি ওষুধ।
এটি ফ্যাশন।
এটি ব্যাংকিং।
এটি হোটেল।
এটি এয়ারলাইন।
এটি ই-কমার্স।
অর্থাৎ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।
আজ পৃথিবীতে প্রায় ২০০ কোটিরও বেশি মুসলিম রয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চাহিদাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বহু ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতি। যে দেশ এই বাজারকে গুরুত্ব দিচ্ছে, সেই দেশ বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং পর্যটনে এগিয়ে যাচ্ছে।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি হলো ইন্দোনেশিয়া।
অনেকেই শুধু বালির নাম জানেন। কিন্তু বাস্তবে ইন্দোনেশিয়া গত এক দশকে হালাল ইকোনমি গড়ে তোলার জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছে।
হালাল পর্যটনে বিশ্বের সেরাদের মধ্যে
২০২৬ সালের Global Muslim Travel Index অনুযায়ী, মালয়েশিয়া প্রথম হলেও ইন্দোনেশিয়া যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে।
এটা কাকতালীয় নয়।
সরকার, বেসরকারি খাত এবং পর্যটন শিল্প একসঙ্গে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে একজন মুসলিম পর্যটক খুব সহজেই নিজের ধর্মীয় অনুশীলন বজায় রেখে ভ্রমণ করতে পারেন।
আপনি যদি জাকার্তা, যোগ্যাকার্তা, লোম্বক, আচেহ বা পশ্চিম সুমাত্রায় যান, দেখবেন:
✔ হালাল রেস্টুরেন্ট সহজেই পাওয়া যায়।
✔ প্রায় প্রতিটি বড় শপিং মলেই নামাজের জায়গা (মুশোলা) রয়েছে।
✔ বিমানবন্দর, অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি অনেক পর্যটন এলাকাতেও নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে।
✔ অনেক হোটেলে কিবলার দিক নির্দেশনা, নামাজের জায়নামাজ এবং হালাল খাবারের ব্যবস্থা থাকে।
✔ রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে বিশেষ পর্যটন প্যাকেজও চালু করা হয়।
হালাল কসমেটিকসে ইন্দোনেশিয়ার বিশ্বসাফল্য
অনেকেই জানেন না, ইন্দোনেশিয়ার কয়েকটি কসমেটিক ব্র্যান্ড শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও জনপ্রিয়।
এর মধ্যে রয়েছে:
* Wardah
* Make Over
* Emina
* Kahf
বিশেষ করে Wardah বিশ্বের অন্যতম পরিচিত হালাল কসমেটিকস ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত। শুধু ইন্দোনেশিয়াতেই নয়, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই, সিঙ্গাপুর এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বাজারেও তাদের পণ্য বিক্রি হয়।
আজ অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা “Halal Certified Cosmetics” খুঁজেই পণ্য কেনেন।
হালাল খাবারে বিশাল শিল্প
ইন্দোনেশিয়ার জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে রয়েছে:
* Rendang
* Sate
* Nasi Goreng
* Soto Ayam
* Bakso
* Gado-Gado
এসব খাবারের বিশাল অংশই হালাল মান বজায় রেখে পরিবেশন করা হয় এবং দেশজুড়ে হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় হালাল সার্টিফিকেশন বাজারগুলোর একটি
ইন্দোনেশিয়ায় এখন খাদ্য, পানীয়, কসমেটিকস, ওষুধ এবং বিভিন্ন ভোক্তা পণ্যের জন্য হালাল সার্টিফিকেশন দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে।
শুধু দেশীয় বাজারের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক রপ্তানির জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইসলামিক ফ্যাশনেও এগিয়ে
হিজাব, মুসলিম পোশাক এবং মডেস্ট ফ্যাশনে ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের অন্যতম বড় বাজার।
প্রতি বছর জাকার্তায় আন্তর্জাতিক মানের মুসলিম ফ্যাশন প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিভিন্ন দেশের ক্রেতা অংশ নেন।
ইসলামিক ব্যাংকিং
ইন্দোনেশিয়ায় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে।
দেশটির বড় বড় ব্যাংকের শরিয়াহ বিভাগ রয়েছে এবং ইসলামিক ফাইন্যান্সকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে দেখা হয়।
তাহলে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশই মুসলিম।
আমাদের রয়েছে:
• বিশ্বমানের তৈরি পোশাক শিল্প।
• আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ শিল্প।
• চামড়া ও জুতা শিল্প।
• কৃষিপণ্য।
• সামুদ্রিক খাদ্য।
• প্রাকৃতিক পর্যটন।
• বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত।
• সুন্দরবনের মতো বিশ্ব ঐতিহ্য।
অর্থাৎ সম্ভাবনার অভাব নেই।
যার অভাব, তা হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং এবং বৈশ্বিক হালাল বাজারকে লক্ষ্য করে কৌশলগত বিনিয়োগ।
আজ ইন্দোনেশিয়া শুধু মুসলিম দেশ বলেই এগিয়ে যায়নি।
তারা হালালকে একটি অর্থনৈতিক কৌশলে পরিণত করেছে।
তারা বুঝেছে, একজন মুসলিম পর্যটক শুধু একটি হোটেল বুক করেন না। তিনি বিমানে ওঠেন, হোটেলে থাকেন, রেস্টুরেন্টে খান, প্রসাধনী কেনেন, স্থানীয় পণ্য কেনেন, পরিবহন ব্যবহার করেন। অর্থাৎ একজন পর্যটকের ব্যয় পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
এটাই হালাল ইন্ডাস্ট্রির আসল শক্তি।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এখনই এই বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করার পরিকল্পনা করবে, নাকি আমরা শুধু দেখেই যাব অন্য দেশগুলো কীভাবে এই খাত থেকে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করছে?