01/02/2026
*কেন অবসরপ্রাপ্ত স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের আর অর্থনীতিবিদদের চিন্তায় ফেলে দেন*
==========================
*অভিজিত ব্যানার্জী*, অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ
==========================
এই মাসে আমার বয়স ৬৫ হলো। আমেরিকার সোশ্যাল সিকিউরিটির কর্মকর্তারা খুবই সতর্ক—তাই তারা আগেভাগেই আমাকে চিঠি পাঠিয়েছে। সেখানে লেখা আছে, আমি চাইলে এখনই অবসর নিতে পারি এবং সরকারের দেওয়া পেনশন পেতে পারি। তবে তারা বলছে, যদি আর পাঁচ বছর অপেক্ষা করি, তাহলে পেনশনের টাকা একটু বেশি পাবো।
আমার এখনই অবসর নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। শরীর-স্বাস্থ্য ভালো থাকলে, সামনের কয়েক বছরও নয়। আমার আদর্শ এখনো অমর্ত্য সেন। আমার ধারণা, তিনি ৯৩ বছর বয়সে হার্ভার্ড থেকে অবসর নিচ্ছেন—তাও আবার প্রোব্যাবিলিটি থিওরির মতো জটিল বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে করতেই।
সমস্যা হলো, আমি নিজেকে খুব তাড়াতাড়ি বোর করে ফেলি। একটানা অনেকক্ষণ কাজ করলে একটু বিরতি চাই। অফিসে সেটা সহজ। করিডোরে ঘুরে বেড়াই। কোনো ছাত্র বা সহকর্মীর সঙ্গে দু-চারটা কথা বলি। ভাগ্য ভালো হলে টেবিল টেনিস খেলায় ঢুকে পড়ি, বা ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কাণ্ডকারখানা নিয়ে জমজমটা আড্ডায় নাক গলাই। কিছুক্ষণ পর আবার কাজে ফিরে আসি—মাথাটা ফ্রেশ লাগে।
কিন্তু বাড়িতে ব্যাপারটা আলাদা। মহামারির সময় এটা খুব বুঝেছি। যখন আমার একটু ডিস্ট্রাকশন দরকার হয়, তখন বাকিরা সবাই ব্যস্ত। তখন আমি এমন সব কাজ করতে শুরু করি যেগুলোর কোন দরকার নেই—যা পরিষ্কার, সেটাই আবার পরিষ্কার করি, কেউ একটু পরে তুলবে ভেবে রাখা কাপড় আগেভাগেই তুলে ফেলা—মোটকথা, নিজেই ঝামেলা তৈরি করি। একদিন তো এমন হলো, আমি কোভিডের জীবানু লেগে থাকতে পারে ভেবে সবজির ওপর লাইসল স্প্রে করছিলাম। তখনো জানতাম না যে, সারফেস থেকে কোভিড ছড়ায় না। উল্টো জীবানু মারার বিষাক্ত স্প্রেটাই হয়তো বেশি ক্ষতিকর ছিল।
জাপানিরা এই অবস্থার জন্য আলাদা একটা নাম দিয়েছে—রিটায়ার্ড হাজব্যান্ড সিনড্রোম। শোনা যায়, জাপানে অনেক নারী, স্বামীর অবসরগ্রহণ আসন্ন জেনে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। কেউ কেউ বিষণ্ণতায় ভোগেন, এমনকি উচ্চ রক্তচাপ, আলসার, চামড়ার সমস্যা পর্যন্ত দেখা দেয়।
এর পেছনে আছে জাপানের ‘স্যালারিম্যান’ সংস্কৃতি। এক সময় খুব কম নারীই বাড়ির বাইরে কাজ করতেন। পুরুষদের অফিস আর যাতায়াত—দুটোই ছিল দীর্ঘ। তাদের সামাজিক জীবনও সীমাবদ্ধ ছিল সহকর্মী আর পুরুষ বন্ধুদের মধ্যেই। ফলে স্বামী-স্ত্রীর একসঙ্গে সময় কাটানোর তেমন দরকারই পড়ত না। ঘরের মানুষটা কোন কোন ক্ষেত্রে অপিরিতের মতোই থেকে যেত। কিন্তু অবসর নেওয়ার পর ছোট জাপানি ফ্ল্যাটে সারাক্ষণ স্বামীর উপস্থিতি এড়িয়ে চলা কঠিন। স্ত্রী চায় ভালো ব্যবহার করতে, আন্তরিক থাকতে। কিন্তু ৩৫ বছরের ঘনিষ্ঠতার পরও, প্রায় অপরিচিত একজন মানুষের সঙ্গে আবার নতুন করে জীবন শুরু করা সহজ নয়। এতদিন লুকিয়ে থাকা দুজনের অভ্যাস আর খামখেয়াল এবার মুখোমুখি হয়। [বিষয়টা বাংলাদেশের বা ভারতের জন্যে স্বাভাবিক না হলেও জাপানের প্রেক্ষাপটে বেশ স্বাভাবিক]।
অবসর গ্রহণের ব্যাপারে আমার স্ত্রী অবশ্য কখনো কিছু বলবে না—সে খুবই ভদ্র। কিন্তু আমি নিশ্চিত, সে চাইবে না যে আমি এখনই অবসর নেই। বিশেষ করে যেহেতু সে বাড়ি থেকে কাজ করতে পছন্দ করে। তবে আমার নিজের ভয়টা আরও প্রকট।
আমি প্রথম আমার দাদুকে দেখি যখন আমার বয়স পাঁচ, আর তার বয়স ছিল ৬৫। তিনি তখন অবসরের দ্বারপ্রান্তে বলা চলে। দাদু একজন নামকরা শিক্ষক ছিলেন—আর একটু ভীতিকর মানুষও। অবসর নেওয়ার পর হঠাৎ তার করার মতো কিছু রইল না। তিনি বাগান করা শুরু করলেন। আমাদের ছাদ ভরে গেল লাল মাটির টবে। দু-এক সপ্তাহ পরপর নতুন গাছের চারা কিনতে যেতাম। সঙ্গে থাকত সরিষার তেল বের করার পর যে অবশিষ্টাংশ থাকে—বাংলায় যাকে খোল বলে—সেটা পচে গোটা ছাদে গন্ধ ছড়াত, তারপর টবের গাছে দেওয়া হতো। সন্ধ্যা নামলে দাদু ছাদে থাকতেন—কখনো মাটি কোপাচ্ছেন, কখনো পানি দিচ্ছেন – সে এক এলাহী ব্যাপার!
কিন্তু আমরা বুঝতে পারতাম, মনটা তার সায় দিত না। অনেক সময় দেখতাম, তিনি দূরে কোথাও তাকিয়ে আছেন। হাতে পানি দেওয়ার ক্যান, সেখান থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছে। সেদিকে তার ভ্রূক্ষেপও নেই। কোন কোন সময় দেখতাম, পাশে পড়ে আছে জলখাবারের প্লেট—হয়তো প্রেসড স্যান্ডউইচ বা কচুরি—ঠান্ডা হয়ে গেছে। হয়তো তিনি আগেও বাইপোলার ছিলেন, কিন্তু অবসরের পর সেটা আরও বেড়ে যায়। দাদুর কথা মনে পড়লে আমি অবসরকে ভয় পাই।
ইদানিং খবরে দেখছি, ফ্রান্সে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লড়াইটাই হচ্ছে কম বয়সে অবসর নেওয়ার অধিকার নিয়ে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ অবসরের বয়স ৬২ থেকে ৬৪ করতে চেয়েছেন—এই নিয়ে এত তীব্র প্রতিবাদ হয়েছে যে এর মধ্যে পাঁচ পাঁচটা সরকারের পতন হয়ে গেছে। ফরাসিরা স্পষ্টতই আমার মতো অবসরকে ভয় পায় না।
একটা কথা পরিষ্কার করে বলি—আমি ভাগ্যবান। আমার চাকরিটা খুবই পছন্দের, শারীরিক পরিশ্রম প্রায় নেই। সবার কপালে এমন জোটে না। অনেক মানুষ কাজ করতে করতে ক্লান্ত, শরীর ব্যথায় ভরা, বিরক্তিকর একঘেয়ে কাজ আর করতে পারছেন না। আবার এমন মানুষও আছেন, যারা কাজ ভালোবাসেন, যেমন ভালোবাসেন ফ্রান্সের বাধ্যতামূলক অবসর আইন, অনেকটা ভারতের মতো।
তাই বলে আমি সেই দলে নই, যারা বলে কাজ করতে না চাওয়াই ফ্রান্সের সব সমস্যার মূল। তবে সমস্যা যেটা আছে, সেটা বিশাল। সমস্যার গোড়ায় আছে পুরোনো এক প্রতিশ্রুতি। ১৯৮১ সালে, যখন আজকের অনেক অবসরপ্রাপ্ত মানুষ কাজ শুরু করেছিলেন, তখন গড় আয়ু ছিল ৭৪ বছর। এখন সেটা ৮৩। ৬২ বছর বয়সে অবসর নিয়ে মানুষ আগে গড়ে ১২ বছর বাঁচত, এখন বাঁচে ২১ বছর। সুখবর বটে, কিন্তু তাতে পেনশনের সুবিধাভোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। তার ওপর নারীরা এখন বেশি কাজ করছেন, এটাও সুখবরই বটে, এবং তারা পুরুষদের চেয়ে বেশি দিন বাঁচেন—ফলে পেনশনভোগীর সংখ্যা আরও বাড়ছে। তরুণদের, যারা কিনা আয় রোজগার করেন, তাদের আয়ের ওপর কেটে নেওয়া টাকা দিয়ে সরকার এই বিশাল পেনশন খরচ চালাতে পারছে না। এখানেই সংকট।
এই সমস্যা শুধু ফ্রান্সের নয়। প্রায় সব ধনী দেশেই জনসংখ্যা বুড়িয়ে যাচ্ছে, সন্তান কম জন্মাচ্ছে। তার মানে, ভবিষ্যতের উপার্জনকারীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ইউরোপের অনেক দেশে, জাপানেও, এই সমস্যা ফ্রান্সের চেয়েও বড়। ডেনমার্কের মতো কিছু দেশ অবসরের বয়স ৭০ পর্যন্ত বাড়াচ্ছে। আধিকাংশরাই ফ্রান্সের দিকে তাকিয়ে আছে—ভাবছে, কবে তাদের পালা আসে।
অনেকে ভাবছেন, কৃত্রিম বুদ্ধমত্তা এসে সব ঠিক করে দেবে। ইলন মাস্কও তাই বলেন। কিন্তু উৎপাদনশীলতা বাড়লেও সেই টাকা পেনশনে যাবে কি না, তা পরিষ্কার নয়। একথা সত্যি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন অনেক কাজ অনায়সেই করে ফেলবে তখন বহু মানুষ চাকরি হারাবে। তাতে বাকিদের গড় আয় বাড়বে, কিন্তু মূলত ধনীরা আরও ধনী হবে। আর তারা কর দিতে চায় না।
সব মিলিয়ে, ধনী দেশগুলো তিনটা মারাত্মক সমস্যার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে—জনসংখ্যা বুড়িয়ে যাচ্ছে, কর্মক্ষম মানুষ কমছে, আর অভিবাসন দরকার হলেও বিদেশিবিদ্বেষ সেটা আটকে দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে লাভ হলেও, ধনীদের ওপর কর না বসিয়ে পেনশন আর কল্যাণব্যবস্থা চালানো সম্ভব নয়। কিন্তু সেই রাজনৈতিক সাহসও নেই। (আন্দোলন বাড়লে সরকারের পতন হবে যে।)
ফ্রান্স, আমেরিকা—সবখানেই সরকারগুলো আজকের দিনটাকে শান্ত রেখে বিষয়টা ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফ্রান্সে বিলিয়নিয়ার ট্যাক্সের কথা উঠেছিল, যা পেনশনের ঘাটতি কমাতে পারত ঠিকই। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ধনীদের চাপে সেটা বাদ দেওয়া হলো। এবার, যত দেরি হবে, তত বেশি মানুষ অবসর নেবে, তত বড় ঘাটতি মেটানো দরকার হবে, আর তত কঠিন হবে রাজনৈতিকভাবে সেটাকে সামাল দেয়া।
====================================
[আজকে ১লা ফেব্রুয়ারি (২০২৬) ভারতের টাইম অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিত ব্যানার্জীর লেখাটা পড়ে ভীষণ ভালো লাগে। মজাদার লেখটাটির কয়েকটি জায়গা ছাড়া সর্বত্রই আক্ষরিক অনুবাদ অক্ষত রাখার চেষ্টা করেছি]